জ্বালানি সংকটে ২৯ হাজার কিলোমিটার দূর থেকেও ডিজেল আনছে অস্ট্রেলিয়া। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৫ এপ্রিল- বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে অস্ট্রেলিয়াতেও। সংকট মোকাবিলায় দেশটি এখন আগের চেয়ে অনেক দূরের দেশ থেকে ডিজেল আমদানি করতে বাধ্য হচ্ছে। সাধারণত কাছাকাছি দেশ দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করলেও এবার সেই স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। ফলে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ওমান এবং পশ্চিম আফ্রিকার মতো দূরবর্তী অঞ্চল থেকেও জ্বালানি আনতে হচ্ছে দেশটিকে।
শিপিং তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের সাউথওল্ড থেকে একটি বড় ডিজেলবাহী ট্যাঙ্কার অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনের উদ্দেশে যাত্রা করেছে। প্রায় ২৯ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এই সমুদ্রপথ অতিক্রম করে জাহাজটি ৪৫ দিন সমুদ্রে অবস্থান করবে এবং আগামী ২ মে অস্ট্রেলিয়ার উপকূলে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। তুলনামূলক ধীরগতির কারণে এই যাত্রাকে অনেক সময় সাইকেলের গতির সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এশিয়ার রিফাইনারিগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। এর ফলে অস্ট্রেলিয়াকে প্রতিদিন প্রায় ৯ কোটি লিটার ডিজেলের চাহিদা পূরণে নতুন উৎসের দিকে যেতে হচ্ছে। এই জ্বালানি মূলত মালবাহী পরিবহন, খনি, কৃষি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যবহৃত হয়।
এবার প্রথমবারের মতো ওমান থেকেও ইরান যুদ্ধ শুরুর পর ডিজেল চালান আসছে। আগামী মাসে এই জাহাজটি পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এটি ওমানের দুকুম বন্দর থেকে লোড করা হয়েছে, যা হরমুজ প্রণালির বাইরের একটি নিরাপদ রুটে অবস্থিত।

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। ছবিঃ সংগৃহীত
পশ্চিম আফ্রিকার টোগো থেকেও একটি ট্যাঙ্কার রওনা দিয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে মে মাসে মোট পাঁচটি বড় চালান আসার কথা রয়েছে। এতে করে অস্ট্রেলিয়ার জ্বালানি নির্ভরতা ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে আরও বেশি ঝুঁকে পড়ছে।
দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকেও এ মাসে বড় আকারের চালান নির্ধারিত রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এশিয়ার রিফাইনারিগুলো কতদিন এই সরবরাহ ধরে রাখতে পারবে তা অনিশ্চিত, কারণ তারা এখনও মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
ম্যাকোয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক লুরিয়ান দে মেলো বলেন, এপ্রিল মাসে ১০০টিরও বেশি জাহাজ আসার কথা রয়েছে, যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। তার মতে, আপাতত সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও মে মাসে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তিনি আরও জানান, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ার রিফাইনারিগুলো মে মাসে সরবরাহ বজায় রাখতে হিমশিম খেতে পারে। একই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার জ্বালানি কৌশল হিসেবে এলএনজি থেকে জ্বালানিতে রূপান্তরের পরিকল্পনা কতটা সফল হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া সফরে গিয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কূটনৈতিক চেষ্টা চালাচ্ছেন। দেশটি সিঙ্গাপুরের সঙ্গে একটি চুক্তি করেছে, যেখানে এলএনজি রপ্তানির বিনিময়ে নিয়মিত পরিশোধিত জ্বালানি পাওয়ার নিশ্চয়তা রয়েছে। পাশাপাশি জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াও ধারাবাহিক জ্বালানি সরবরাহের আশ্বাস দিয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এশিয়া যদি পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের সরবরাহ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, তাহলে এই কৌশল দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর নাও হতে পারে। ফলে আগামী সময়ে অস্ট্রেলিয়ার যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে এশিয়া থেকে মাত্র একটি চালান আসছে সিঙ্গাপুর থেকে, বাকি জ্বালানি আসছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ওমান থেকে।
এক সময় নেদারল্যান্ডস থেকেও একটি চালান আসার পরিকল্পনা ছিল, তবে সেটি পরে বাতিল বা অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি আসতে ছয় থেকে সাত সপ্তাহ সময় লাগে, তবে এসব জাহাজ আকারে বড় হওয়ায় একবারে অনেক বেশি জ্বালানি পরিবহন করতে পারে।
এদিকে এশিয়ার দেশগুলোও বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহে বাধ্য হচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে বড় পরিমাণ তেল কিনছে, আর সিঙ্গাপুর রাশিয়া ও অন্যান্য দেশ থেকেও তেল আমদানি করছে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, অস্ট্রেলিয়ার আমদানির একটি অংশ হয়তো রাশিয়ার তেলের সঙ্গে পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকতে পারে। তাদের মতে, বাস্তব পরিস্থিতিতে সব সময় উৎস যাচাই করে জ্বালানি সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না।
যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ কিছুটা কমলেও, এতে রাশিয়ার আয় বেড়ে ইউক্রেন যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার শঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
সূত্রঃ নিউজ.এইউ