কোন পথে হাঁটছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র
মেলবোর্ন, ৬ জুন- ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যে আবারও সংঘাতের আশঙ্কা জোরালো হয়ে উঠেছে। গত এপ্রিলে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর উভয়…
মেলবোর্ন, ১৬ এপ্রিল- বাংলাদেশে আবারও উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে উঠছে হাম রোগের সংক্রমণ, যা ইতোমধ্যেই অনেকটা প্রাদুর্ভাবের রূপ নিয়েছে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে সন্দেহজনক হাম রোগে ১৬৬টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং একই সময়ে আক্রান্তের সংখ্যা ১৯ হাজার ছাড়িয়েছে। পরিস্থিতির এই দ্রুত অবনতি স্বাস্থ্যখাতের জন্য নতুন করে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হাসপাতালগুলোকে সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে আইসোলেশন ওয়ার্ড এবং নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র প্রস্তুত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কারণ, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং বিশেষ করে শিশুদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
তবে এই পরিস্থিতি শুধু বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ উন্নত বিশ্বের বহু দেশেও আবার হাম সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে। এক সময় যেসব দেশে হাম প্রায় নির্মূল ঘোষণা করা হয়েছিল, সেসব দেশেও নতুন করে প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে, যা বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগজনক ইঙ্গিত বহন করছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টিকাদানের হার কমে যাওয়াই এই পুনরুত্থানের প্রধান কারণ। বিশেষ করে কোভিড মহামারির সময় বিশ্বজুড়ে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটে। এর ফলে বহু শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা পায়নি এবং একটি বড় জনগোষ্ঠী ঝুঁকির মধ্যে থেকে গেছে।
চিকিৎসাবিষয়ক জার্নাল ‘দ্য ল্যানসেট’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে গত দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক হাম প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। যদিও ২০০০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বৈশ্বিকভাবে হাম রোগীর সংখ্যা ৭১ শতাংশ এবং মৃত্যুহার ৮৮ শতাংশ কমে এসেছিল, সাম্প্রতিক পরিস্থিতি সেই অগ্রগতিকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উন্নতির পেছনে মূল ভূমিকা ছিল দুই ডোজ টিকাদান কর্মসূচি। প্রথম ডোজের কভারেজ ৭১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮৪ শতাংশে এবং দ্বিতীয় ডোজ ১৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৬ শতাংশে পৌঁছেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক ব্যাঘাত এই ধারাবাহিকতাকে ভেঙে দিয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ২০২০ সালের পর নিয়মিত বিরতিতে যে বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি হওয়ার কথা ছিল, তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে অনেক শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে গেছে। পাশাপাশি টিকা সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতাও বর্তমান পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে ৫ই এপ্রিল থেকে দেশে নতুন করে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এতে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়া হচ্ছে, যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বৈশ্বিক চিত্র আরও উদ্বেগজনক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ৫৭টি দেশে বড় ধরনের হাম প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি। আফ্রিকা, ইউরোপ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মাত্র ছয় মাসে ভারতে ১২ হাজারের বেশি, অ্যাঙ্গোলায় প্রায় ১২ হাজার, ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ৯ হাজার এবং পাকিস্তানে সাত হাজারের বেশি হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রেও ১৭টি অঙ্গরাজ্যে শত শত সংক্রমণ এবং মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পুনরুত্থানের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। কোভিড মহামারির সময় টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হওয়া ছাড়াও কিছু দেশে টিকাবিরোধী প্রচারণা বেড়ে গেছে, যা মানুষের মধ্যে টিকা নেওয়ার অনীহা তৈরি করেছে। ফলে একটি বড় জনগোষ্ঠী সুরক্ষার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
এছাড়া, আন্তর্জাতিক ভ্রমণের মাধ্যমেও ভাইরাস এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে যারা টিকা নেয়নি, তাদের মাধ্যমে সংক্রমণ দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। যদিও এখনো পর্যন্ত ভাইরাসের নতুন কোনো শক্তিশালী ধরন তৈরি হয়েছে বা টিকার কার্যকারিতা কমে গেছে এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবুও বিষয়টি নিয়ে গবেষণা চলছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কোভিড-পরবর্তী টিকাদান ঘাটতি পূরণ করা। যেসব শিশু নির্ধারিত সময় টিকা পায়নি, তাদের দ্রুত টিকার আওতায় আনা না গেলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
সব মিলিয়ে, হাম রোগের এই পুনরুত্থান শুধু একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, বরং এটি বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি বড় সতর্ক সংকেত। টিকাদান কর্মসূচি শক্তিশালী করা, জনসচেতনতা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার না করলে ভবিষ্যতে আরও বড় আকারে এই রোগ ফিরে আসার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
সূত্রঃ বিবিসি
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au