পাইকারি ও খুচরা উভয় পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব। ছবিঃ প্রতীকী
মেলবোর্ন, ১৭ এপ্রিল- বাংলাদেশের বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা উভয় পর্যায়ে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব তৈরি করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। প্রস্তাব অনুযায়ী, বাসাবাড়িতে ব্যবহারভেদে বিদ্যুতের দাম ৭ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ২০ দশমিক ১১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। একই সঙ্গে পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর তিনটি বিকল্প প্রস্তাবও প্রস্তুত করা হয়েছে, যার মাধ্যমে পাঁচ হাজার কোটি থেকে ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি ভর্তুকি কমানো সম্ভব বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা। তবে নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের সুরক্ষায় লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হচ্ছে না।
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বাড়তে থাকা চাপ মোকাবিলায় পাইকারি ও খুচরা দরের সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে সম্প্রতি বিদ্যুৎ বিভাগ এই প্রস্তাব তৈরি করে। একই উদ্দেশ্যে গত ৯ এপ্রিল অর্থমন্ত্রীকে আহ্বায়ক করে একটি উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি বিদ্যুতের দাম পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা যাচাই করে সুপারিশ দেবে।
বাংলাদেশে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের আইনগত দায়িত্ব বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের ওপর বর্তায়। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো কমিশনের কাছে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয় এবং যাচাই-বাছাই শেষে গণশুনানির মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের খুচরা দাম গড়ে ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল, তখন প্রতি ইউনিটের গড় মূল্য দাঁড়ায় ৮ টাকা ৯৫ পয়সা। একই সময়ে পাইকারি দাম ৫ দশমিক ০৭ শতাংশ বাড়িয়ে প্রতি ইউনিট ৭ টাকা ৪ পয়সা নির্ধারণ করা হয়।
বিদ্যুৎ বিভাগের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম দুই বছর বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম না বাড়ানোর নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর এলএনজি, ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের সরবরাহে চাপ সৃষ্টি হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এসব জ্বালানির দাম বেড়ে যায়। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং ভর্তুকির পরিমাণও বেড়ে যায়। সরকার একদিকে ব্যয় সংকোচন, অন্যদিকে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা চালালেও উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি অব্যাহত রাখতে হয়েছে। একই সঙ্গে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সচল রাখতে কয়লার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা হয়েছে, যাতে বেসলোড উৎপাদন ব্যাহত না হয়। এসব কারণে উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়েছে।
বর্তমানে বিদ্যুতের গড় পাইকারি মূল্য উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় কম হওয়ায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা ভর্তুকির মাধ্যমে পূরণ করতে হচ্ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সম্ভাব্য ঘাটতি প্রায় ৫৬ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্য অব্যাহত থাকলে এই চাপ আরও বাড়তে পারে।
পাইকারি দামের ক্ষেত্রে তিনটি বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রথম প্রস্তাবে বর্তমান প্রতি ইউনিট ৭ টাকা ৪ পয়সা থেকে ৫০ পয়সা বাড়িয়ে ৭ টাকা ৫৪ পয়সা করার কথা বলা হয়েছে, এতে প্রায় ৫ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা ভর্তুকি কমানো সম্ভব হবে। দ্বিতীয় প্রস্তাবে প্রতি ইউনিট এক টাকা বাড়িয়ে ৮ টাকা ৪ পয়সা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে, এতে প্রায় ১০ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা ভর্তুকি কমতে পারে। তৃতীয় প্রস্তাবে প্রতি ইউনিটে এক টাকা ২০ পয়সা বাড়িয়ে ৮ টাকা ২৪ পয়সা করার কথা বলা হয়েছে, এতে ভর্তুকি কমতে পারে প্রায় ১২ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা।
খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রেও ধাপে ধাপে বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে ০ থেকে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য কোনো দাম বাড়ানো হচ্ছে না। অন্য আবাসিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ব্যবহারভেদে প্রতি ইউনিটে ৭০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বিদ্যুৎ বিভাগের প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। শ্রীলঙ্কায় আবাসিক খাতে ৭ দশমিক ২ শতাংশ, শিল্প খাতে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং সেবা খাতে ৯ দশমিক ৯ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি দেশটি পেট্রোল, ডিজেল ও কেরোসিনের দামও প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। সিঙ্গাপুরে জ্বালানির মূল্য সরাসরি ট্যারিফে সমন্বিত হওয়ায় সেখানে বিদ্যুতের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি কমানোর ওপর জোর দিয়েছে। ২০২৫ সালে সংস্থাটি একটি কারিগরি মিশন পাঠিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করে। তাদের সুপারিশে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ খাতে দক্ষতা বাড়ানো এবং ভর্তুকি কমাতে তিন বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করে ধাপে ধাপে বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি ও জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্চ ও এপ্রিল মাসে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানিতে অতিরিক্ত প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। জ্বালানি তেলে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। চলতি বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ৪২ হাজার কোটি টাকা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা যথেষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আগামী জুন পর্যন্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আরও প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত প্রয়োজন হতে পারে।