বিশ্ব

রয়টার্সের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনী ব্যবস্থায় যেভাবে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করছে ট্রাম্প প্রশাসন

  • 3:59 pm - April 28, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৮ বার
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ব্যবস্থায় ট্রাম্পের কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ছবিঃ রয়টার্স

মেলবোর্ন, ২৮ এপ্রিল- যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ব্যবস্থায় ট্রাম্পের কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ভোটার তালিকা সংগ্রহ, নির্বাচন সংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য যাচাই এবং ভোটিং প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার চাওয়ার মতো ঘটনাগুলো স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এসব তৎপরতা ঐতিহ্যগতভাবে অঙ্গরাজ্যনির্ভর নির্বাচনী কাঠামোর সীমা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে এবং আসন্ন নির্বাচনগুলোকে ঘিরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উত্তেজনা আরও জোরালো করছে।

রয়টার্সের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিষয়টি শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা নয়, বরং ধাপে ধাপে বিস্তৃত একটি নীতিগত ও প্রশাসনিক চাপের অংশ হিসেবে সামনে আসছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব মূলত অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় সরকারের ওপর ন্যস্ত। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনসহ সব জাতীয় নির্বাচনও এই কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে দেখা যাচ্ছে, কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন সংস্থা একাধিক অঙ্গরাজ্যে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় তথ্য সংগ্রহ ও তদন্ত কার্যক্রম বাড়িয়েছে, যা আগে তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল।

রয়টার্সের অনুসন্ধান অনুযায়ী, অন্তত আটটি অঙ্গরাজ্যে ফেডারেল পর্যায়ের সংস্থা বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ভোটার তালিকা, ভোট ইতিহাস এবং নির্বাচন সংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য চেয়েছেন বা সংগ্রহ করেছেন। এসব অঞ্চলের মধ্যে কিছু রাজনৈতিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এলাকা, আবার কিছু এলাকা রয়েছে যেখানে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের শক্ত অবস্থান রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈচিত্র্য ইঙ্গিত দেয় যে বিষয়টি একটি বিস্তৃত প্রশাসনিক কৌশলের অংশ হতে পারে।

ওহাইও অঙ্গরাজ্যের ফ্র্যাঙ্কলিন কাউন্টিতে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। জানুয়ারিতে কাউন্টির নির্বাচন অফিসে ফোন করে একজন ব্যক্তি নিজেকে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের এজেন্ট পরিচয় দেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে ভোটার রেকর্ডে প্রবেশাধিকার চান। এরপর কয়েক সপ্তাহ ধরে তিনি একাধিকবার যোগাযোগ করে ভোটার নিবন্ধন ফর্ম, ভোটের ইতিহাস, এমনকি ব্যক্তিগত তথ্য যেমন ড্রাইভিং লাইসেন্স নম্বর পর্যন্ত চেয়েছেন।

ইমেইল ও নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ওই এজেন্ট স্থানীয় ভোটার নিবন্ধন সংগঠন সম্পর্কেও তথ্য চান এবং বিষয়টিকে “তদন্ত” ও “অত্যন্ত জরুরি” হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে তদন্তের প্রকৃত কারণ বা আইনি ভিত্তি সম্পর্কে তিনি কোনো ব্যাখ্যা দেননি। ফ্র্যাঙ্কলিন কাউন্টির নির্বাচন পরিচালক অ্যান্টোন হোয়াইট জানান, তিনি আগে কখনো হোমল্যান্ড সিকিউরিটি থেকে এ ধরনের যোগাযোগ পাননি, তবে অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে তথ্য সরবরাহ করেন। পরবর্তীতে তিনি নিজেও এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাননি।

হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ এই নির্দিষ্ট ঘটনার বিষয়ে মন্তব্য করেনি। তবে এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, তারা যেখানে সম্ভব সেখানে নির্বাচনী জালিয়াতির অভিযোগ তদন্ত করছে। ওহাইওর দক্ষিণাঞ্চলীয় ফেডারেল প্রসিকিউটরের কার্যালয়ও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ফ্র্যাঙ্কলিন কাউন্টি নয়, ওহাইওর অন্তত আরও কয়েকটি কাউন্টিতে একই ধরনের ভোটার তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা হয়েছে। এর মধ্যে ডেমোক্র্যাট সমর্থিত এলাকা যেমন রয়েছে, তেমনি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজনৈতিক অঞ্চলও রয়েছে। তবে এসব তদন্তের পূর্ণ পরিসর বা আইনি ভিত্তি আগে প্রকাশ করা হয়নি।

অন্যদিকে নেভাদায় ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন রাজ্য নির্বাচন দফতর থেকে ভোটার তথ্য চেয়েছে, যা ২০২০ সালের নির্বাচন সংক্রান্ত একটি তদন্তের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কলোরাডোতে একটি পৃথক ঘটনায় ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত এক সাইবার নিরাপত্তা কর্মকর্তা একটি কাউন্টি ক্লার্কের কাছে ভোটিং মেশিনে প্রবেশাধিকার চেয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এই ঘটনাগুলো স্থানীয় নির্বাচন কর্মকর্তাদের জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। যেসব প্রতিষ্ঠান আগে ফেডারেল সরকারের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক রাখত, তারা এখন সম্ভাব্য আইনি ও প্রশাসনিক চাপে পড়ার আশঙ্কায় নিজেদের প্রস্তুতি পুনর্মূল্যায়ন করছে।

এই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পেছনে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগীরা দীর্ঘদিন ধরে ২০২০ সালের নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগ করে আসছেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের আদালত ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা একাধিক তদন্ত ও পর্যালোচনার পর এসব অভিযোগের কোনো প্রমাণ পাননি বলে জানিয়েছেন।

তবুও সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভোটার তালিকা যাচাই, নাগরিকত্ব নিশ্চিতকরণ, ভোটিং মেশিন নিয়ে তদন্ত এবং নির্বাচন নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।

একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রশাসন একাধিক নির্বাহী আদেশ ও নীতিগত উদ্যোগের মাধ্যমে ভোটার নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় নাগরিকত্ব যাচাই বাধ্যতামূলক করা, ফেডারেল ডাটাবেস ব্যবহার করে ভোটার তালিকা যাচাই এবং মেইল-ইন ভোটিং ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভোটার তালিকা সঠিক ও আপডেট রাখা এবং অবৈধ ভোটারদের প্রতিরোধ করাই মূল উদ্দেশ্য। তাদের দাবি, শুধুমাত্র যোগ্য নাগরিকরাই যেন ভোট দিতে পারে তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।

তবে বিচার বিভাগ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

এদিকে নির্বাচনী নিরাপত্তা সংস্থা সাইবারসিকিউরিটি অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার সিকিউরিটি এজেন্সির ভূমিকা নিয়েও পরিবর্তন এসেছে। ২০২০ সালের পর সংস্থাটি নির্বাচনী অবকাঠামো সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও সাম্প্রতিক সময়ে তার কার্যক্রম সীমিত হয়ে গেছে বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ফলে অনেক জায়গায় এখন ব্যক্তিগত নিরাপত্তা পরামর্শদাতা নিয়োগ করা হচ্ছে।

একই সময়ে কিছু রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় গোষ্ঠী এবং ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে তারা নির্বাচনী জালিয়াতি সংক্রান্ত ভিত্তিহীন দাবি ছড়িয়ে প্রশাসনিক চাপ তৈরি করছে। এর ফলে স্থানীয় নির্বাচন কর্মকর্তাদের ওপর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ঝুঁকিও বেড়েছে বলে জানা গেছে।

টেক্সাস ও কলোরাডোসহ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে নির্বাচন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সামাজিক মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে তাদের বিরুদ্ধে হুমকি, এমনকি প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছে। ফলে অনেক কর্মকর্তা নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বাড়তি সুরক্ষা নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী কাঠামো এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা, অঙ্গরাজ্যের স্বায়ত্তশাসন এবং রাজনৈতিক আস্থার মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে যদি ভবিষ্যতে কোনো নির্বাচনের ফল অল্প ব্যবধানে নির্ধারিত হয়, তাহলে এই প্রশাসনিক টানাপোড়েন আরও বড় সংকটে রূপ নিতে পারে।

সূত্রঃ রয়টার্স

এই শাখার আরও খবর

জঙ্গি ইস্যুতে সরকারের ভিন্ন সুর: নেই বললেন মন্ত্রী, ‘আছে’ স্বীকার উপদেষ্টা

মেলবোর্ন, ২৮ এপ্রিল-  দেশে জঙ্গি তৎপরতা আছে কি না-এই প্রশ্নে সরকারের ভেতরেই ভিন্নমত দেখা দিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ যেখানে দেশে জঙ্গি তৎপরতার অস্তিত্ব অস্বীকার করেছেন,…

গুলশানে ভারতীয় নারীর রহস্যজনক মৃত্যু

মেলবোর্ন, ২৮ এপ্রিল-  রাজধানীর গুলশানে বসবাসকারী ভারতীয় নাগরিক শামীম সালিম কাসিম (৬৭)-এর রহস্যজনক মৃত্যু নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। তাঁর শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাতের চিহ্ন…

ক্যাম্পাসের বাইরে বাসা ভাড়া নিয়ে আতঙ্কে সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা

মেলবোর্ন, ২৮ এপ্রিল- যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের বাইরে একটি অ্যাপার্টমেন্টে দুই পিএইচডি শিক্ষার্থী হত্যার ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। নিরাপত্তা…

৫ মামলায় সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের জামিন বহাল

মেলবোর্ন, ২৮ এপ্রিল- জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যা মামলা এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার-সংক্রান্ত রায় জালিয়াতির অভিযোগসহ মোট পাঁচটি মামলায় সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল…

প্রিজনভ্যান দুর্ঘটনায় জুনাইদ আহমেদ পলকসহ কয়েকজন আহত

মেলবোর্ন, ২৮ এপ্রিল- আদালতে নেওয়ার পথে পুলিশের প্রিজনভ্যান দুর্ঘটনায় সাবেক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক আহত হয়েছেন। এতে ভ্যানে থাকা আরও…

৫দিন ধরে নিখোঁজ নরসিংদীর হিন্দু স্বর্ণ ব্যবসায়ী আদিত্য কানাই

মেলবোর্ন, ২৮ এপ্রিল- নরসিংদী জেলার মনোহরদী থানার হাতিদা বাজারের পরিচিত স্বর্ণ ব্যবসায়ী এবং “পুলক জুয়েলারি”র মালিক আদিত্য কানাই ৫দিন ধরে নিখোঁজ রয়েছেন। গত শুক্রবার (২৪…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au