বাংলাদেশ

৩৫ হাজার কোটি টাকায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প অনুমোদন, কতটা প্রভাব পড়বে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে

  • 6:51 pm - May 14, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৮১ বার
৩৫ হাজার কোটি টাকায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প অনুমোদন। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ১৪ মে- দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানিসংকট নিরসন, মৃতপ্রায় নদীগুলো পুনর্জীবিত করা এবং কৃষি ও পরিবেশ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে পদ্মা নদীর ওপর প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বৃহৎ ব্যারাজ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ‘পদ্মা ব্যারাজ’ নামে এই মেগা প্রকল্প আগামী সাত বছরে বাস্তবায়ন করা হবে এবং পুরো অর্থায়ন করা হবে সরকারি নিজস্ব তহবিল থেকে।

বুধবার রাজধানীর সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। সরকারের দাবি, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্তত ২৪টি জেলার পানিসংকট দূর হবে এবং প্রায় সাত কোটি মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে উপকৃত হবে।

একনেক সভা শেষে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি সাংবাদিকদের বলেন, এটি সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার প্রকল্প এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ। তিনি জানান, আগামী অর্থবছর থেকেই প্রকল্পের প্রথম ধাপের কাজ শুরু হবে। ২০৩৩ সালের মধ্যে ব্যারাজ নির্মাণ শেষ করার পাশাপাশি তিনটি পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সাতটি স্যাটেলাইট শহর গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ফারাক্কা বাঁধের কারণে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীতে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বহু নদী শুকিয়ে যাচ্ছে। এতে কৃষি, মৎস্য, নৌ চলাচল ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বেড়েছে। আবার বর্ষা মৌসুমে কোথাও কোথাও জলাবদ্ধতাও সৃষ্টি হচ্ছে। এসব সংকট মোকাবিলার লক্ষ্যেই পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।

ব্যারাজ মূলত নদীর পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্মিত একটি বিশেষ অবকাঠামো। এটি সাধারণ বাঁধের মতো পুরো পানিপ্রবাহ বন্ধ করে না। বরং একাধিক গেট বা দরজার মাধ্যমে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন খাল বা নদীতে পানি সরবরাহ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে কৃষিজমিতে সেচের জন্য পানি সরবরাহ কিংবা শুকিয়ে যাওয়া নদীগুলোতে পানি ফিরিয়ে আনতেও ব্যারাজ ব্যবহার করা হয়।

বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. আনিসুল হক বলেন, যথাযথ পরিকল্পনা, সমীক্ষা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যারাজ নির্মাণ করা গেলে তা দেশের জন্য বড় ধরনের সুফল বয়ে আনতে পারে। তবে সঠিকভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করা না গেলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি অর্থের অপচয়ও হতে পারে।

বাংলাদেশে এর আগেও বিভিন্ন নদীর ওপর ব্যারাজ নির্মাণ করা হয়েছে। ১৯৮৩ সালে মৌলভীবাজারে মনু নদীর ওপর দেশের প্রথম ব্যারাজ নির্মিত হয়। পরে তিস্তা নদীর ওপর তিস্তা ব্যারাজ এবং ঠাকুরগাঁওয়ের টাঙ্গন নদীর ওপর টাঙ্গন ব্যারাজ নির্মাণ করা হয়।

পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের আলোচনা নতুন নয়। গত শতকের ষাটের দশক থেকে শুরু করে ২০০০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে সম্ভাব্যতা যাচাই ও সমীক্ষা পরিচালিত হয়েছে। ২০০৫ সালে বিএনপি সরকারের সময় প্রকল্পটির বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা সমীক্ষা চালিয়ে সরকারকে প্রতিবেদন জমা দেন। এরপর ২০১৬ সাল পর্যন্ত পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকল্পটির নকশা প্রণয়নের কাজ চালায়।

বিশেষজ্ঞদের প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে উজানে পানি প্রত্যাহার বাড়ায় শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের নদীগুলোতে পানিপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে।

প্রকল্পের আওতায় মূল ব্যারাজটি নির্মাণ করা হবে রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায়। প্রায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ব্যারাজে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডার স্লুইস এবং দুটি ফিশ পাস। অতিরিক্ত পানি নিয়ন্ত্রণ ও নদীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্পিলওয়ে ব্যবহার করা হবে। আর আন্ডার স্লুইসের মাধ্যমে পলি ব্যবস্থাপনা ও পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই ব্যারাজের মাধ্যমে প্রায় ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। সংরক্ষিত পানি বণ্টনের জন্য নির্মাণ করা হবে তিনটি বিশেষ অফটেক অবকাঠামো। একই সঙ্গে প্রথম ধাপে গড়াই-মধুমতী নদীতে প্রায় ১৩৬ কিলোমিটার এবং হিসনা নদীতে প্রায় ২৪৬ কিলোমিটার পুনঃখনন ও ড্রেজিং করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদী পুনরুদ্ধারের কাজ করা হবে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে গড়াই-মধুমতী, হিসনা-মাথাভাঙ্গা, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদীতে আবারও স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার আশা করছে সরকার। শুষ্ক মৌসুমে এসব নদীতে প্রায় ৮০০ কিউসেক পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা।

এই পানি ব্যবহার করে যশোর, খুলনা, কুষ্টিয়া, মাগুরা, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, নড়াইল, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও পিরোজপুরসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের প্রায় ২৯ লাখ হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হবে বলে প্রকল্প নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারের দাবি, প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে দেশে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ২৪ লাখ টন ধান এবং দুই লাখ টনের বেশি মাছ উৎপাদন বাড়বে। একই সঙ্গে নদীকেন্দ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, সুন্দরবনের লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ, সেচ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নদীপথে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এ ছাড়া গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প, উত্তর রাজশাহী সেচ প্রকল্প, গোদাগাড়ী পাম্প হাউস এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতেও পদ্মা ব্যারাজ কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছে সরকার।

প্রকল্প কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, পুরো প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় আট হাজার কোটি টাকার আর্থ-সামাজিক সুবিধা পাওয়া সম্ভব হবে।

সূত্রঃ বিবিসি

এই শাখার আরও খবর

কিম জং উনের স্বাস্থ্য নিয়ে গুঞ্জন, কী জানা যাচ্ছে?

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের শারীরিক অবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জল্পনা ছড়িয়েছে। সম্প্রতি তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে কোমায় আছেন বলে কিছু…

ফ্রান্সজুড়ে চলছে দাঙ্গা-লুটপাট, প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে কারফিউ জারি

ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ থেকে ছড়িয়ে পড়া দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় রাজধানী প্যারিসের কয়েকটি এলাকা এবং দেশটির বিভিন্ন শহরে রাতের কারফিউ জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে…

নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে নিহত বেড়ে ১৪, আহত ৩২

নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়ায় বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৪ জনে দাঁড়িয়েছে। এ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৩২ জন। আহতদের স্থানীয় বিভিন্ন…

পূজা দেখে ফেরার পথে ট্রলারডুবি, মেয়ে নিহত মা নিখোঁজ

ওটিএন বাংলা ডেস্ক :  পিরোজপুরে দুর্গাপূজা দেখে বাড়ি ফেরার পথে অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই ট্রলারডুবিতে প্রাণ গেছে আট বছরের শিশু অর্পিতা বেপারীর। এ ঘটনায় তার মা রিনা…

রেমিট্যান্স নেবে সরকার, প্রবাসীদের মরদেহের দায় কেন নেবে না?

সৌদি আরবে দুই চ নাগরিক নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিথি আখতারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা, প্রবাসীদের আইনি সুরক্ষা এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে…

ছেলেকে নায়ক বানাতে বাড়ি-গাড়ি বন্ধক রেখেছিলেন হৃতিকের বাবা

হৃতিক রোশন এখন বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা। তার বর্তমান সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তবে তার পরিবারের এই অবস্থানে আসার পথটি সহজ…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au