মেলবোর্ন, ২৪ মে- আছিয়া, রামিসা, তিন বছরের কোলের শিশু-কেউ রক্ষা পাচ্ছে না। গ্রামে, শহরে, স্কুলে, মাদরাসায়, ঘরে-বাইরে প্রতিদিন একই চিত্র। খবরের কাগজ খুললেই ধর্ষণের খবর। মৃত্যুদণ্ডের আইন আছে, তবু ধর্ষণ কমছে না। বরং ধর্ষণ করে বিভৎসভাবে হত্যা করে ফেলে রাখা হচ্ছে। রামিসার মৃত্যুর পর দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্ষকদের প্রতি খোপ, ঘেন্না, রাগ চরমভাবে বেড়েছে। মানুষ আর বিশ্বাস করতে চায় না।
কয়েকদিন পর নতুন ঘটনা আসে, মানুষ ভুলে যায়। ভিকটিম পরিবার সঠিক বিচার পায় না। অপরাধীরা কোনভাবে টাকা পয়সা দিয়ে বের হয়ে আসে কয়েক বছরের মধ্যে। এখন প্রশ্ন একটাই—ধর্ষন প্রমানিত ও সঠিক অপরাধী *চিহ্নিত* হওয়ার পর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দ্রুত কার্যকর না করলে এই মহামারী থামবে কীভাবে?
২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ভয়াবহ চিত্র
তথ্যগুলো এসেছে পুলিশ সদর দপ্তর, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, আইন ও সালিশ কেন্দ্র-আসক এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির প্রতিবেদন থেকে।
২০২৪ সাল
– মোট নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা: ২,৫২৫টি
– ধর্ষণ মামলা দায়ের: ৫,৫৭০টি
– ধর্ষণের শিকার: ৩৬৪ জন। এর মধ্যে কন্যাশিশু ২২০ জন, প্রাপ্তবয়স্ক নারী ১৪ জন
– দলবদ্ধ ধর্ষণ: ১৪৮ জন
– ধর্ষণের পর হত্যা: ২১ জন
২০২৫ সাল
– মোট ধর্ষণ মামলা দায়ের: ৭,০৬৮টি। ২০২৪ সালের তুলনায় বৃদ্ধি ২৭% এর বেশি
– জানুয়ারি-জুন ২০২৫ এ ধর্ষণের শিকার: ৪৮১ জন নারী। এই সময়ে খুন হয়েছেন ৩২০ জন
– জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি দুই মাসেই ধর্ষণের শিকার ৯৬ জন। যার মধ্যে ৪ জন শিশু
– জুন মাসে এককভাবে ধর্ষণ ৬৭টি
২০২৬ সাল [জানুয়ারি মাসের চিত্র]
– শুধু জানুয়ারি মাসেই ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে *৩৫টি*। এর মধ্যে ২৫টি একক ধর্ষণ, ১০টি গণধর্ষণ
– ১২ বছর বা তার কম বয়সী *১৩ শিশু* ধর্ষণের শিকার
– ধর্ষণের পর অন্তত *২ জনকে হত্যা* করা হয়েছে
সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা সেই নৃশংসতার বাস্তব উদাহরণ:
– মিরপুরে: ৭ বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা
– সিলেটে ৪ বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা
– ঠাকুরগাঁওয়ে ৪ বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা
– মুন্সীগঞ্জে: ১০ বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা
কেন কমছে না ধর্ষণ?
এক. বিচারহীনতার সংস্কৃতি
মৃত্যুদণ্ডের আইন আছে, কিন্তু বিচার হয় না। মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। তদন্তে বিলম্ব, সাক্ষীদের ভয়ভীতি, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল অভিযোগপত্র ধর্ষকদের জন্য নিরাপত্তা তৈরি করছে।
দুই. সামাজিক মূল্যবোধের পতন
পর্ণোগ্রাফি, মাদক, সহিংস কনটেন্ট কিশোর-তরুণের মনোজগৎ বিকৃত করছে। রাজনৈতিক ছত্রছায়া পেয়ে বখাটেরা নিজেদের অপ্রতিরোধ্য মনে করে।
তিন. ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অপব্যবহার
মাদরাসা, মসজিদকে আমরা পবিত্র মনে করি। অথচ সেখানেও শিশু-কিশোররা হুজুরদের লালসার শিকার হচ্ছে।
চার. ভিক্টিম ব্লেমিং
ধর্ষণের পর সমাজ জিজ্ঞাসা করে, মেয়েটি কী পোশাক পরেছিল? রাতে কেন বের হয়েছিল? এই প্রশ্নই অপরাধীকে আড়াল করে।
পাঁচ. অপরাধীর সহজ মুক্তি
কয়েকদিন পর নতুন ঘটনা আসে, মানুষ ভুলে যায়। ভিকটিম পরিবার সঠিক বিচার পায় না। অপরাধীরা টাকা পয়সা দিয়ে বের হয়ে আসে কয়েক বছরের মধ্যে।
শুধু কঠোর আইন থাকলে হবে না, তা কার্যকর করতে হবে
আইন কাগজে লেখা থাকলে হবে না। তা মাঠে কার্যকর করতে হবে।
প্রথমত, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল
ধর্ষণ মামলার জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। ১৮০ দিনের মধ্যে তদন্ত ও রায় বাধ্যতামূলক করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, জবাবদিহিতা
পুলিশ অভিযোগ নিতে অস্বীকার করলে, তদন্তে গাফিলতি করলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।
তৃতীয়ত, প্রমাণিত অপরাধীর ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি
ধর্ষন প্রমানিত ও সঠিক অপরাধী *চিহ্নিত হওয়ার পর লাইভে ক্রস ফায়ারের দাবি এখন মানুষের মুখে মুখে। এই দাবি উঠছে কারণ মানুষ বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়েছে।
আইনের বাইরে গিয়ে কাউকে শাস্তি দেওয়া যায় না। কিন্তু আইন যদি দ্রুত, স্বচ্ছ ও দৃষ্টান্তমূলক হয়, তাহলে আর কাউকে রাস্তায় নেমে বিচার চাইতে হবে না।
অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ শাস্তি দ্রুত কার্যকর করতে হবে। তখন আর কারো এধরণের কাজে লিপ্ত হওয়ার আগে কয়েকবার ভাবতে হবে।
প্রতিকার: আইন ছাড়াও যা করতে হবে
এক. নৈতিক ও জীবনমুখী শিক্ষা
প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত নৈতিকতা, সহানুভূতি, লিঙ্গ সম্মান, সম্মতির ধারণা পড়াতে হবে।
দুই. সংস্কৃতি ও খেলাধুলার চর্চা
মানুষ যখন বই পড়ে, গান শোনে, মাঠে খেলে, তখন তার ভেতরের পশুতা কমে। প্রতি ইউনিয়নে খেলার মাঠ, প্রতি উপজেলায় সাংস্কৃতিক কেন্দ্র দরকার।
তিন. পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব
শিশুকে একা রাখা যাবে না। বাবা-মাকে সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়তে হবে। অপরাধ দেখলে চুপ থাকা মানেই অপরাধের অংশীদার হওয়া।
চার. ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা
সব মাদরাসা সরকারি রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আনতে হবে। শিক্ষক নিয়োগে পুলিশ ভেরিফিকেশন, নিয়মিত মনিটরিং বাধ্যতামূলক করতে হবে।
রামিসার মৃত্যু, মিরপুরের ৭ বছরের শিশু, সিলেটের ৪ বছরের শিশু, ঠাকুরগাঁওয়ের ৪ বছরের শিশু, মুন্সীগঞ্জের ১০ বছরের শিশু—এই নামগুলো শুধু সংবাদ শিরোনাম নয়। এরা আমাদের সবার মেয়ে।
২০২৬ সালের জানুয়ারির ৩৫টি ঘটনা বলে দিচ্ছে, আমরা এখনো বিপদের গভীরে।
আইন দরকার, কিন্তু আইনের চেয়ে বড় দরকার মানুষের বিবেক জাগানো।
শাস্তি দরকার, কিন্তু শাস্তির চেয়ে বড় দরকার এমন সমাজ গড়া যেখানে কেউ ধর্ষণের কথা ভাবতেই লজ্জা পায়।
আজ যদি আমরা চুপ থাকি, কাল ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।
লেখক- সরদার সেলিম রেজা, কবি,
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলাদেশ ইতিহাস ঐতিহ্য কেন্দ্র