কালবৈশাখীর তাণ্ডবে কর্ণফুলীতে নৌকাডুবি: খোঁজ মিলছে না নববধূ কনিকা দাসের
মেলবোর্ন, ২৮ মে- চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় কর্ণফুলী নদীতে আকস্মিক কালবৈশাখী ঝড়ের কবলে পড়ে নৌকাডুবির ঘটনায় কনিকা দাশ (১৯) নামে এক নববধূ নিখোঁজ হয়েছেন। তবে স্থানীয় চার…
মেলবোর্ন, ২৭ মে- বাংলাদেশে আর মাত্র একদিন পর পবিত্র ঈদুল আজহা। প্রতি বছরের মতো এবারও রাজধানী ঢাকা ছাড়তে শুরু করেছেন লাখো মানুষ। তবে এবারের ঈদযাত্রা যেন একদিকে স্বস্তি, অন্যদিকে চরম ভোগান্তি, দীর্ঘ যানজট, বৃষ্টিজনিত দুর্ভোগ এবং সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিলে পরিণত হয়েছে। দেশের প্রধান প্রধান মহাসড়ক, সেতু এলাকা, ফেরিঘাট ও বাসস্ট্যান্ডে এখন ঘরমুখী মানুষের উপচে পড়া ভিড়। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে মানুষ যখন গ্রামের পথে ছুটছে, তখন তাদের বড় অংশকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হচ্ছে যানজটে। কোথাও ১০ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে লেগেছে পুরো রাত, কোথাও দুর্ঘটনায় থেমে গেছে সড়ক, আবার কোথাও বৃষ্টিতে ভিজে ট্রাক বা পিকআপে করে গন্তব্যের দিকে রওনা দিতে দেখা গেছে যাত্রীদের।
বিশেষ করে ঢাকা-টাঙ্গাইল, ঢাকা-ময়মনসিংহ ও যমুনা সেতু মহাসড়কে এবারের ঈদযাত্রার সবচেয়ে ভয়াবহ চাপ তৈরি হয়েছে। গাজীপুর, টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জজুড়ে কয়েক দফা দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে পরিবহন সংকট এবং টানা বৃষ্টি। ফলে ঈদযাত্রা এখন অনেকের জন্য হয়ে উঠেছে ক্লান্তিকর ও আতঙ্কের।
গাজীপুরে রাতভর যানজট, বৃষ্টিতে নতুন দুর্ভোগ
মঙ্গলবার দুপুরের পর থেকেই গাজীপুরের ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ঘরমুখী মানুষের চাপ বাড়তে থাকে। সন্ধ্যার পর যানবাহনের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে গেলে ধীরে ধীরে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে থাকে। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের প্রায় ৩০ কিলোমিটার এলাকায় যানজট ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও কয়েক কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে যাত্রীদের ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে।
যাত্রীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকা থেকে চন্দ্রা পর্যন্ত যে পথ সাধারণ সময়ে এক ঘণ্টারও কম সময়ে অতিক্রম করা যায়, সেখানে মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার ভোর পর্যন্ত অনেকেই আটকে ছিলেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কালিয়াকৈরের চন্দ্রা এলাকায় কথা হয় যাত্রী আবুল হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, রাতে ঢাকার চৌরাস্তা থেকে রওনা হয়ে ভোরে গিয়ে চন্দ্রা পৌঁছেছেন। পুরো রাত বাসের ভেতর বসেই কাটাতে হয়েছে।
বুধবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে শুরু হওয়া ভারী বৃষ্টি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। চন্দ্রা, সফিপুর, পল্লী বিদ্যুৎ এলাকা এবং আশপাশের বিভিন্ন স্থানে শত শত যাত্রীকে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। পরিবহন সংকটের কারণে অনেকে বাধ্য হয়ে ট্রাক, পিকআপ বা অন্যান্য পণ্যবাহী যানবাহনে করেই বাড়ির পথে রওনা হন। বৃষ্টিতে ভিজে শিশু ও নারী যাত্রীদের চরম দুর্ভোগে পড়তে দেখা গেছে।
হাইওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, গাজীপুর অঞ্চলের বহু শিল্পকারখানায় মঙ্গলবার থেকে ঈদের ছুটি শুরু হওয়ায় একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক বাড়ির পথে বেরিয়ে পড়েন। এতে মহাসড়কে চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। নাওজোড় হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সওগাতুল আলম বলেন, বৃষ্টি, যানবাহনের সংকট এবং সড়কের সীমিত সক্ষমতার কারণেই যানজট সৃষ্টি হয়েছে। তবে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে।
যমুনা সেতু এলাকায় ৬০ কিলোমিটার যানজট
গাজীপুরের পর সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি হয়েছে টাঙ্গাইল ও যমুনা সেতু এলাকায়। বুধবার সকালে চন্দ্রা ত্রিমোড় থেকে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা হয়ে যমুনা সেতুর মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রায় ৬০ কিলোমিটার এলাকায় যানজটের সৃষ্টি হয়। সেতুর পূর্ব টোল প্লাজা, এলেঙ্গা, রাবনা বাইপাস, নগড়জলফৈই, করটিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে যানবাহন।
পুলিশ ও যমুনা সেতু কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গভীর রাতে সেতুর ওপর কয়েকটি গাড়ি বিকল হয়ে পড়ে। একই সময়ে কয়েকটি দুর্ঘটনাও ঘটে। দুর্ঘটনাকবলিত যান সরাতে সময় লাগায় টোল আদায় সাময়িক বন্ধ রাখতে হয়। এর ফলে মহাসড়কে যানবাহনের চাপ আরও বেড়ে যায়।

যমুনা সেতু এলাকায় ৬০ কিলোমিটার যানজট। ছবিঃ সংগৃহীত
যমুনা সেতু সাইট অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ রিয়াজ উদ্দিন জানান, অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে সেতুর দুই প্রান্তে ১৮টি বুথ দিয়ে টোল আদায় চলছে। মোটরসাইকেলের জন্যও আলাদা বুথ চালু করা হয়েছে।
টাঙ্গাইলের ট্রাফিক পরিদর্শক আনিসুর রহমান বলেন, বৃষ্টি ও দুর্ঘটনার কারণে যান চলাচল ধীরগতির হয়ে পড়ে। তবে যানজট নিরসনে মহাসড়ককে চারটি সেক্টরে ভাগ করে পুলিশ কাজ করছে।
অন্যদিকে, যমুনা সেতুর পশ্চিম প্রান্তে পৌঁছানোর পর উত্তরবঙ্গমুখী সড়কে তুলনামূলক স্বস্তির চিত্র দেখা গেছে। সিরাজগঞ্জ অংশে যানবাহন চলাচল অনেকটাই স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
দুর্ঘটনায় বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল
এবারের ঈদযাত্রায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো সড়ক দুর্ঘটনা। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রাণহানির খবর আসছে। মঙ্গলবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সাত জেলায় পৃথক দুর্ঘটনায় অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন। এর আগের দিন টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে রডবোঝাই ট্রাক উল্টে ১৫ জন নিহত হন।

ঢাকার রেল স্টেশনগুলোতে উপচে পড়া ভিড়। ছবিঃ সংগৃহীত
ঢাকায় ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনায় নিহত ৪
বুধবার সকালে রাজধানীর নতুন বাজার সংলগ্ন নর্দ্দা এলাকায় ইসলাম পরিবহনের একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রোড ডিভাইডার ভেঙে বিপরীত লেনের আকাশ পরিবহনের বাসে ধাক্কা দেয়। এতে অন্তত চারজন নিহত ও ১০ জন আহত হন।
পুলিশ জানিয়েছে, পটুয়াখালী থেকে আসা বাসটি বেপরোয়া গতিতে চলছিল। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসটি ডিভাইডারের ওপর উঠে যায় এবং বিপরীতমুখী বাসে আঘাত করে। নিহতদের মধ্যে বাগেরহাট ও পটুয়াখালীর যাত্রী রয়েছেন।
ঘটনার পর সড়কে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। আহতদের কুর্মিটোলা ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। দুর্ঘটনার পর চালক ও হেলপার পালিয়ে যান।
টাঙ্গাইলে ট্রাক উল্টে ১৫ জনের মৃত্যু
ঈদযাত্রার সবচেয়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনাগুলোর একটি ঘটে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে। সোমবার ভোরে রডবোঝাই একটি ট্রাক উল্টে অন্তত ১৫ জন নিহত হন। তারা ট্রাকের ওপর চড়ে উত্তরবঙ্গের দিকে যাচ্ছিলেন।
নিহতদের বেশির ভাগই নওগাঁর মান্দা উপজেলার বাসিন্দা। তারা গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় ফেরি করে প্লাস্টিকের পণ্য বিক্রি করতেন। ঈদ উপলক্ষে বাড়ি ফেরার পথে তাদের মৃত্যু হয়।

ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে ট্রাক উল্টে নিহত ১৫। ছবিঃ সংগৃহীত
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাকটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মহাসড়কের পাশে পড়ে গেলে ঘটনাস্থলেই বহু মানুষ মারা যান। আহতদের টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
বিভিন্ন জেলায় প্রাণহানি
সিরাজগঞ্জে বাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষে তিনজন নিহত হন। বরিশালে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মোটরসাইকেলে বাসের ধাক্কায় একই পরিবারের তিনজনের মৃত্যু হয়। সাতক্ষীরায় পিকআপভ্যান ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে দুই চাচাতো ভাই নিহত হন।
খুলনার কয়রায় কোরবানির পশু বহনকারী নসিমন উল্টে এক ব্যবসায়ীর মৃত্যু হয়। ফরিদপুরে অজ্ঞাত গাড়ির ধাক্কায় এক নারী নিহত হন। জামালপুরে ড্রামট্রাক ও পিকআপের সংঘর্ষে এক পথচারী নারীর মৃত্যু হয়। চাঁদপুরে ট্রাকের ধাক্কায় প্রাণ যায় তৃতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর।
এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও বহু মানুষ। অনেকেই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
পরিবহন সংকট ও অতিরিক্ত ভাড়া
এবারের ঈদযাত্রায় আরেকটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে পরিবহন সংকট। বিশেষ করে শিল্পাঞ্চল গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়া থেকে উত্তরবঙ্গগামী যাত্রীরা পর্যাপ্ত বাস পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন। অনেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও বাসে উঠতে পারেননি।
এ সুযোগে কিছু পরিবহন অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। অনেক যাত্রী বাধ্য হয়ে ট্রাক, পিকআপ বা খোলা যানবাহনে চড়ে বাড়ির পথে রওনা হচ্ছেন। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।

ভাড়া বেড়েছে লঞ্চেও। ছবিঃ সংগৃহীত
পুলিশের সর্বোচ্চ চেষ্টা, তবুও ভোগান্তি
হাইওয়ে পুলিশ, ট্রাফিক বিভাগ, সেনাবাহিনী এবং স্বেচ্ছাসেবীরা মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কাজ করছে। বিভিন্ন স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। যমুনা সেতু এলাকায় যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে একাধিক রেকার প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের যাত্রা, বৃষ্টি, দুর্ঘটনা এবং সড়কের সীমিত সক্ষমতার কারণে চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।
তবুও থামছে না ঘরে ফেরার স্রোত
সব দুর্ভোগ, যানজট, বৃষ্টি আর দুর্ঘটনার খবরের মধ্যেও থেমে নেই ঘরে ফেরার মানুষের স্রোত। কেউ বাসে, কেউ ট্রাকে, কেউ মোটরসাইকেলে, আবার কেউ লঞ্চ বা ট্রেনে চেপে ছুটছেন গ্রামের বাড়ির দিকে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভোগান্তির পরও পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদ কাটানোর আকাঙ্ক্ষাই মানুষকে টেনে নিচ্ছে বাড়ির পথে।
মহাসড়কের পাশে ক্লান্ত শিশু কোলে নিয়ে অপেক্ষা করা মায়ের মুখে যেমন কষ্টের ছাপ, তেমনি বাড়ি পৌঁছানোর আশায় চোখে রয়েছে স্বস্তির প্রত্যাশাও। কেউ বলছেন, “কষ্ট হলেও ঈদ তো পরিবারের সঙ্গে করতেই হবে।”
এবারের ঈদযাত্রা তাই একদিকে ভোগান্তির প্রতিচ্ছবি, অন্যদিকে মানুষের নাড়ির টানে ঘরে ফেরার অদম্য আবেগের গল্প।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au