বাংলাদেশ

বুলডোজার আতঙ্ক আর পুলিশি চাপ,হাকিমপুর সীমান্তে বাংলাদেশমুখী মানুষের ভিড়

  • 12:26 pm - May 29, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২১১ বার
হাকিমপুর সীমান্তে বাংলাদেশমুখী মানুষের ভিড়। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ২৯ মে- ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পালাবদলের পর মাত্র এক মাসের ব্যবধানে আমূল বদলে গেছে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী হাকিমপুরের পরিস্থিতি। একসময় যেখানে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ফেরা অনুপ্রবেশকারীদের সামাল দিতে কার্যত একাই কাজ করছিল সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ, এখন সেখানে রাজ্য পুলিশ ও প্রশাসনও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়েছে। বদলে গেছে অনুপ্রবেশকারীদের ফেরত পাঠানোর পদ্ধতি, বদলেছে প্রশাসনিক তৎপরতা, এমনকি সীমান্তের রাজনৈতিক পরিবেশও।

উত্তর ২৪ পরগনার স্বরূপনগরের হাকিমপুর সীমান্তে সম্প্রতি গিয়ে দেখা গেছে, গভীর রাতেও সেখানে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সীমান্তের দিকে যাওয়া রাস্তাজুড়ে মোতায়েন রয়েছে পুলিশ, সিভিক ভলান্টিয়ার ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর সদস্যরা। বিএসএফ চেকপোস্টের আশপাশে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও এসডিপিও পর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও টহল দিতে দেখা যায়।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরেও একই সীমান্তে অনুপ্রবেশকারীদের ভিড় থাকলেও তখন এ ধরনের পুলিশি তৎপরতা ছিল না। সে সময় সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিএসএফকেই প্রায় এককভাবে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর বিএসএফ ও রাজ্য পুলিশ যৌথভাবে কাজ করছে।

আগে বাংলাদেশে ফিরতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের বিএসএফ চেকপোস্টে এনে পরিচয় যাচাই করে সরাসরি সীমান্তঘেঁষা ক্যাম্পে পাঠানো হতো। পরে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির সম্মতি মিললে তাদের হস্তান্তর করা হতো। এখন সেই পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে।

বর্তমানে যাদের অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, তাদের প্রথমে বিভিন্ন অস্থায়ী ‘হোল্ডিং সেন্টারে’ পাঠানো হচ্ছে। রাজ্য সরকারের নির্দেশে জেলায় জেলায় এসব অস্থায়ী আটক শিবির তৈরি করা হয়েছে। সেখানে পুলিশি পাহারায় তাদের রাখা হচ্ছে এবং পরে বাংলাদেশ থেকে অনুমতি এলে আবার সীমান্তে এনে বিজিবির হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।

স্বরূপনগরে বর্তমানে অন্তত তিনটি হোল্ডিং সেন্টার চালু রয়েছে। একটি তেঁতুলিয়ার ‘পথের সাথী’ অতিথিশালায়, দ্বিতীয়টি চারঘাট হাইস্কুল সংলগ্ন ফ্লাড শেল্টারে এবং তৃতীয়টি মেদিয়ার একটি স্কুলে। এসব কেন্দ্রে পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবার জন্য আশা কর্মী ও চিকিৎসকরাও নিয়মিত যাতায়াত করছেন।

প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, আটক ব্যক্তিদের খাবার ও থাকার ব্যবস্থা স্থানীয় প্রশাসন ও স্কুলের মিড-ডে মিল কর্মীরা দেখভাল করছেন। গরমের ছুটি থাকা সত্ত্বেও অনেক কর্মীকে রান্নার দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। বিভিন্ন কেন্দ্রে শুকনো খাবার, পানি ও চিকিৎসা সামগ্রীও সরবরাহ করা হচ্ছে।

হোল্ডিং সেন্টারে থাকা অনেকের মধ্যেই অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক কাজ করছে। তাদের আশঙ্কা, হয়তো গ্রেপ্তার করা হবে বা মামলা দেওয়া হতে পারে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হচ্ছে, যাচাই-বাছাই শেষে তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে।

ফিরে যাওয়া ব্যক্তিদের বক্তব্যেও এবার ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। গত বছরের শেষ দিকে যারা বাংলাদেশে ফিরছিলেন, তারা মূলত ‘এসআইআর’ সংক্রান্ত আশঙ্কার কথা বলছিলেন। কিন্তু বর্তমানে অনেকেই বলছেন, তারা আর ভারতে থাকতে পারছেন না। বাড়িওয়ালারা ভাড়া দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন, পুলিশি অভিযানের ভয় দেখানো হচ্ছে এবং বুলডোজার অভিযানের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

নিউটাউন, বাঁকড়া, দক্ষিণ বারাসতসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, স্থানীয়ভাবে চাপ তৈরি হওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে সীমান্তের দিকে আসছেন। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, রাতে বাড়িতে থাকতেও ভয় পাচ্ছিলেন।

ঘুনি বস্তি থেকে আসা মফিজুল মোল্লা জানান, আগের দফায় অনেকেই এলাকা ছেড়ে চলে গেলেও তারা কিছু পরিবার থেকে গিয়েছিলেন। কিন্তু পরে বস্তিতে আগুন লাগার ঘটনা এবং সরকার পরিবর্তনের পর ঘন ঘন পুলিশি তৎপরতায় তারাও এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।

স্থানীয়দের মতে, সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে রাজনৈতিক উপস্থিতিতে। ছয় মাস আগে সীমান্ত এলাকায় স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের সক্রিয়তা চোখে পড়লেও বর্তমানে তাদের উপস্থিতি কার্যত নেই। আগে অনুপ্রবেশকারীদের খাবার, আশ্রয় এবং সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করা হতো রাজনৈতিকভাবে। এখন সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে।

বর্তমানে সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন হোল্ডিং সেন্টার ও ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় পঞ্চায়েতের বিজেপি সদস্য ও সমর্থকদের বেশি সক্রিয় দেখা যাচ্ছে। তারা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে বিভিন্ন কাজ করছেন বলে জানা গেছে।

সীমান্তবর্তী হাকিমপুরে এই পরিবর্তন শুধু প্রশাসনিক নয়, বরং রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতারও বড় পরিবর্তনের প্রতিফলন বলে মনে করছেন স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা। মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে সীমান্তের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, অনুপ্রবেশকারীদের প্রতি প্রশাসনিক আচরণ এবং রাজনৈতিক ভূমিকার এই আমূল পরিবর্তন এখন স্পষ্টভাবেই দৃশ্যমান।

সূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা

এই শাখার আরও খবর

উৎসবের মঞ্চে ঐতিহ্য ও মানবিকতার মেলবন্ধন, ‘মহাশক্তি সম্মান’-এ স্বীকৃতি ২৫ দুর্গাপুজোর

দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক অবদান ও সামাজিক দায়বদ্ধতাকে স্বীকৃতি দিতে কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার ২৫টি দুর্গাপুজো কমিটিকে ‘মহাশক্তি সম্মান’ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে ‘উই আর দ্য কমন…

পারিবারিক বন্ধুর হামলায় পা হারালেন অস্ট্রেলিয়ার নারী এমপি, সর্বশেষ যা জানা যাচ্ছে

অস্ট্রেলিয়ায় স্বতন্ত্র নারী সংসদ সদস্য হেলেন হেইন্সকে গাড়িচাপা দিয়ে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় নতুন করে রহস্য তৈরি হয়েছে হামলাকারীর পরিচয় ঘিরে। ৬৫ বছর বয়সী এই এমপির ওপর…

ইরানে ফের হামলার ইঙ্গিত নেতানিয়াহুর, ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা

ইরানে আবারও হামলা চালানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তিনি ইরানের সরকারের পতন ঘটানোর বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ…

যুদ্ধ এড়াতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন প্রস্তাব দিল পাকিস্তান ও কাতার

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের ঝুঁকি এড়াতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতুন একটি প্রস্তাব দিয়েছে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান ও কাতার। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুই দেশের কাছে…

বিজয়া দশমী ও প্রতিমা বিসর্জন: বিদায়ের বেদনা, ঐতিহ্য, ধর্মীয় তাৎপর্য ও সম্প্রীতির মহামিলন

শরতের নির্মল আকাশ, সাদা কাশফুলের দোলা, শিউলি ফুলের স্নিগ্ধ সুবাস, ঢাকের মধুর বাদ্য আর চারদিকে উৎসবের আমেজ—এসবের মধ্য দিয়েই বাঙালির হৃদয়ে আবির্ভূত হয় শারদীয় দুর্গোৎসব।…

সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড: আমার মাইয়ার লাশ আইনা দাও, আমি ওরে দেহুম

‘আমি কেমনে বাঁচুম রে, আমার সুইটিরে আইনা দ্যাও রে। আমার মাইয়ার লাশ আইনা দাও, আমি ওরে দেহুম।’ সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া মেয়ে সুইটি আক্তারের…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au