গুরুতর আহত অতিরিক্ত সচিব
মেলবোর্ন, ৩০ মে- পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন বাংলাদেশ সরকারের অতিরিক্ত সচিব ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য শামীমুজ্জামান ফিরোজ। শুক্রবার (২৯…
মেলবোর্ন, ২৯ মে- ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির টানা ১২ বছরের শাসনের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বড় ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদ আন্দোলনের জন্ম হয়েছে একটি ‘ককরোচ’কে কেন্দ্র করে। তরুণদের নিয়ে করা একটি মন্তব্যের জবাবে তৈরি হওয়া এই অনলাইন আন্দোলন এখন দেশজুড়ে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ৩০ বছর বয়সী অভিজিৎ দিপকে ইতোমধ্যে প্রাণনাশের হুমকি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাধা এবং ক্ষমতাসীন দলের সমালোচনার মুখে পড়েছেন।
‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’ নামে পরিচিত এই সংগঠন নিজেদের পরিচয় দেয় “অলস, বেকার এবং সবসময় সঠিক থাকা মানুষদের প্রতিনিধি” হিসেবে। সংগঠনটির জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ার পেছনে রয়েছে ভারতের বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠীর হতাশা ও ক্ষোভ। দেশটির মোট ১৪২ কোটির বেশি জনসংখ্যার মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি মানুষের বয়স ৩০ বছরের নিচে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সম্প্রতি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যের নির্বাচনে মোদির দল জয় পেলেও তরুণদের মধ্যে বাড়তে থাকা হতাশা তাঁর ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, গ্যাস সংকট এবং ইরান যুদ্ধের প্রভাবেও জনঅসন্তোষ বাড়ছে।
ভারতের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা ও রাজনৈতিক কর্মী যোগেন্দ্র যাদব বলেন, দেশের অর্থনীতি ও পরিস্থিতি যদি সত্যিই ভালো থাকত, তাহলে দুই কোটির বেশি তরুণ এমন একটি ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলনের পেছনে একত্র হতো না। তাঁর মতে, এটি ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত, যা দেখাচ্ছে বাহ্যিক শক্ত অবস্থানের আড়ালে গভীর অসন্তোষ জমে রয়েছে।
২০১৪ সালে দুর্নীতিবিরোধী গণআন্দোলনের পটভূমিতে ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতের রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদি প্রায় একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। ফলে বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, তিনি সহজে কোনো বিরোধী কণ্ঠের কাছে রাজনৈতিক জায়গা ছেড়ে দেবেন না। তবে নতুন এই অনলাইন আন্দোলন তরুণদের দীর্ঘস্থায়ী বেকারত্ব এবং বারবার পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ক্ষুব্ধ ছাত্রসমাজের হতাশাকে সামনে নিয়ে এসেছে। এসব ঘটনায় লাখো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ মুখ প্রশান্ত ভূষণ বলেন, এই আন্দোলনের এখনই গুরুত্বপূর্ণ সময়। তবে তাদের খুব সতর্কভাবে এগোতে হবে। তিনি মনে করেন, শুধু অনলাইনে প্রচারণা চালিয়ে গেলে আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী হবে না। আন্দোলনকে টিকিয়ে রাখতে হলে সংগঠিত হতে হবে এবং যেসব ইস্যুতে তারা অনলাইনে সরব হয়েছে, সেগুলো নিয়ে রাস্তায়ও আন্দোলনে নামতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তব রাজনীতিতে সাংগঠনিক শক্তি ছাড়া এই আন্দোলন দ্রুত হারিয়েও যেতে পারে। কারণ মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি ইতোমধ্যে বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক শক্তি অনেকটাই দুর্বল করে ফেলেছে। সমালোচকদের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থাগুলোকে ব্যবহার করে বিরোধী নেতাদের চাপে রাখা হচ্ছে। যদিও সরকার দাবি করে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সংস্থাগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া হয়েছে।
ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু অভিযোগ করেছেন, ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রকে অপমান করছে। তিনি বলেন, একটি পোকামাকড়ের নামে রাজনৈতিক প্রচারণা চালানো দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, সংগঠনটি পাকিস্তান এবং তথাকথিত ‘ভারতবিরোধী গোষ্ঠী’ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছে।

ভারতে আলোড়ন তুলেছে জেন-জিদের ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। ছবিঃ সংগৃহীত
গত দুই বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন অভিজিৎ দিপকে। সেখান থেকেই তিনি সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে জানান, গত কয়েক সপ্তাহ তাঁর প্রায় নির্ঘুম কেটেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট তৈরি এবং বিভিন্ন সাক্ষাৎকার দিতে দিতে।
শিকাগো থেকে টেলিফোনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ভারত সরকার তাঁকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তবে সাংবিধানিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক সীমার মধ্যেই তাঁরা কাজ চালিয়ে যাবেন বলে জানান তিনি।
দিপকে বলেন, তাঁর এক্স অ্যাকাউন্টে সরকারি বাধা সরাতে তাঁকে আইনি লড়াই করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে অজ্ঞাত হ্যাকারদের হাত থেকে ‘সিজেপি’ ইনস্টাগ্রাম পেজ পুনরুদ্ধার এবং ভারতে ও যুক্তরাষ্ট্রে থাকা পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও তিনি ব্যস্ত সময় পার করছেন। হোয়াটসঅ্যাপে শারীরিক হামলার হুমকিও পেয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
মহারাষ্ট্র পুলিশ তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছে বলেও জানান দিপকে।
তিনি প্রকাশ্যে কিছু তথ্যও প্রকাশ করেছেন, যেখানে দেখা যায়, ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র ইনস্টাগ্রাম অনুসারীদের প্রায় ৯৫ শতাংশই ভারতের নাগরিক। বাকি বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রে থাকা ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষ।
দিপকের দাবি, তাঁদের অনুসারীদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি ‘জেন-জি’ প্রজন্মের, অর্থাৎ ১৯৯৭ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া তরুণ। বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক করা দিপকে পেশায় জনসংযোগ কৌশলবিদ। তিনি একসময় ভারতের বিরোধী রাজনৈতিক দল ‘আম আদমি পার্টি’র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিভাগেও কাজ করেছেন।
তিনি বলেন, শুরুতে তিনি পুরো বিষয়টিকে নিছক ব্যঙ্গ বা কৌতুক হিসেবেই শুরু করেছিলেন। কিন্তু ভারতের তরুণরা এখন এটিকে বাস্তব রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে চাইছে। তারা এটিকে শুধু আরেকটি ‘মিম’ হিসেবে দেখতে রাজি নয়।
এক্স অ্যাকাউন্টে সরকারি বাধার বিরুদ্ধে তিনি দিল্লির একটি আদালতে মামলাও করেছেন।
ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
নয়াদিল্লিভিত্তিক ‘ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশন’-এর পরিচালক ও আইনজীবী অপার গুপ্তা বলেন, ভারতে যেভাবে ওয়েবসাইট ও অ্যাকাউন্ট ব্লক করা বাড়ছে, তা দেখাচ্ছে যে সরকার এখন ভিন্নমত ও ব্যঙ্গকে গণতান্ত্রিক প্রকাশ হিসেবে নয়, প্রশাসনিক হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে।
এই পুরো বিতর্কের সূত্রপাত হয় গত ১৬ মে অভিজিৎ দিপকের একটি ভাইরাল পোস্ট থেকে। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, “যদি সব ককরোচ একসঙ্গে হয়ে যায়, তাহলে কী হবে?”
তিনি জানান, ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্যের জবাব হিসেবেই তিনি পোস্টটি করেছিলেন। বিচারপতি কিছু বেকার তরুণকে ককরোচর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরে অবশ্য সূর্য কান্ত ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, তিনি তরুণদের অপমান করতে চাননি; বরং ভুয়া ডিগ্রিধারীদের ‘পরজীবী’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
এরপর ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ একটি ঘোষণাপত্র প্রকাশ করে এবং মোবাইল ফোনের ওপর বসে থাকা ককরোচর ছবি নিজেদের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করে।
ভারতের জনপ্রিয় কনটেন্ট নির্মাতা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রভাবকদের সহায়তায় কয়েক দিনের মধ্যেই সংগঠনটির অনুসারী সংখ্যা বিস্ফোরণগতিতে বাড়তে থাকে। বর্তমানে ইনস্টাগ্রামে সংগঠনটির অনুসারী সংখ্যা দুই কোটির বেশি, যা এক দশকের বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা মোদির বিজেপির অনুসারীর সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতে ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল ৩ দশমিক ১ শতাংশ। তবে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে এ হার ছিল ৯ দশমিক ৯ শতাংশ। শহরাঞ্চলে এই হার আরও বেশি, ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ; গ্রামাঞ্চলে যা ৮ দশমিক ৩ শতাংশ।
লখনউয়ের একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে নিম্নপদে কাজ করা ২৩ বছর বয়সী শুরিন দীক্ষিত বলেন, তাঁর এমবিএ ডিগ্রি রয়েছে, কিন্তু তিনি যোগ্যতার তুলনায় কম বেতনে কাজ করছেন। তিনি বলেন, এই সংগঠন যদি কোনো আন্দোলনের ডাক দেয়, তাহলে তিনি যোগ দেবেন।
ভারতীয় গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতোমধ্যে এই আন্দোলনের তুলনা প্রতিবেশী বাংলাদেশ ও নেপালের তরুণনেতৃত্বাধীন সরকারবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে করা হচ্ছে। তবে দিপকে এ ধরনের তুলনা টানতে সতর্কতা দেখিয়েছেন।
তিনি বলেন, তাঁদের প্রায় ৭০ শতাংশ অনুসারীর বয়স ২৮ বছরের নিচে এবং তারা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। তারা যেমন সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ, তেমনি বিরোধী দলগুলোর প্রতিও হতাশ। কারণ বিরোধী দলগুলো সরকারকে কার্যকরভাবে জবাবদিহির মুখোমুখি করতে পারেনি।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর আর্থিক ও সাংগঠনিক শক্তির বিরুদ্ধে টিকে থাকা সহজ হবে না। ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ডেভেলপিং সোসাইটিজ’-এর গবেষক সঞ্জয় কুমার বলেন, মাঠপর্যায়ে উপস্থিতি তৈরি করা, অর্থ সংগ্রহ এবং স্বেচ্ছাসেবক গড়ে তোলা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ।
একই সঙ্গে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করলে ঝুঁকিও রয়েছে। কারণ অতীতে মোদি সরকারের সময়ে বড় বিক্ষোভে কঠোর দমন-পীড়নের অভিযোগ উঠেছে এবং তাতে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।
তবু অনেকে আশাবাদী। সরকারবিরোধী ভিডিও কনটেন্টের জন্য পরিচিত নির্মাতা মাদ্রি কাকোতি বলেন, তিনি আশা করেন, খুব দ্রুত সংগঠনটি কোনো সুস্পষ্ট সাংগঠনিক পরিকল্পনা সামনে আনবে। কারণ জেন-জি প্রজন্ম যেমন দ্রুত কোনো বিষয়ে আকৃষ্ট হয়, তেমনি দ্রুত আগ্রহও হারিয়ে ফেলে।
সূত্রঃ ডন
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au