বাংলাদেশ

জাতি কোন পথে? বুদ্ধিজীবীরা নীরব কেন?

মতামত-সরদার সেলিম রেজা

  • 12:31 pm - June 01, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৬৫ বার
বর্তমান প্রজন্মের একটা অংশের রাজনৈতিক অভিলাষ এখন “রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল”। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ১ জুন- ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে। ক্ষমতা বদলেছে, মুখ বদলেছে, স্লোগান বদলেছে। কিন্তু বদলায়নি আমাদের মজ্জাগত অসুখ—দেশপ্রেমহীন রাজনৈতিক অভিলাষ, শিক্ষকের প্রতি অবজ্ঞা, আর বুদ্ধিজীবীর বেছে-নেওয়া নীরবতা।

ক্ষমতা দখলের অভিলাষ, দেশপ্রেমের ঘাটতি:

বর্তমান প্রজন্মের একটা অংশের রাজনৈতিক অভিলাষ এখন “রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল”। আদর্শ নেই, ইতিহাস নেই, ত্যাগ নেই—আছে শুধু চেয়ার আর চিৎকার। দেশপ্রেমহীন চিন্তা-চেতনা এখন ফেসবুক রিলস, ইউটিউব শর্টস, টকশোর গলাবাজিতে। “দেশ” শব্দটা মুখে আছে, কিন্তু হৃদয়ে নেই।

গত দুই বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুম ফাঁকা। পড়ালেখা গোল্লায় গেছে। তরুণরা ১৯৭১ জানে না, ১৯৫২ বোঝে না। তারা জানে শুধু “বয়কট”। ভারত বয়কট, ভারতীয় পণ্য বর্জন—এটা এখন জেঞ্জি প্রজন্মের কাছে সবচেয়ে যৌক্তিক, আবার সবচেয়ে সস্তা জনপ্রিয় দাবি। আবেগ আছে, কিন্তু ভূ-রাজনীতির জ্ঞান নেই।

শিক্ষক লাঞ্ছনা: জাতির আত্মহত্যা:

পড়ালেখা যখন গোল্লায় গেছে, শিক্ষকের সম্মান তখন শূন্যের কোঠায়। সারাদেশে প্রায় দুই হাজারের বেশি শিক্ষক লাঞ্ছিত হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, মাদ্রাসা—কোথাও শিক্ষক নিরাপদ নন। ছাত্রের হাতে শিক্ষক মার খাচ্ছেন, কান ধরে ওঠবস করানো হচ্ছে, অপমানজনক ভিডিও ভাইরাল হচ্ছে।

৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর এই প্রবণতা ভয়াবহ আকার নিয়েছে। রাষ্ট্র নীরব, প্রশাসন নীরব। শিক্ষক এখন ক্লাসে যান ভয়ে, পাঠদান করেন আতঙ্কে। যে সমাজ শিক্ষককে লাঞ্ছিত করে, সে সমাজ নিজের ভবিষ্যৎ নিজে হত্যা করে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া শিক্ষককে “জাতির পিতা” মানে বলেই তারা এগিয়েছে। আমরা শিক্ষককে অপমান করে কোথায় যাবো?

বুদ্ধিজীবীর নীরবতা: আলো নিভিয়ে দেওয়া:

সবচেয়ে হতাশার জায়গা—বুদ্ধিজীবীর নীরবতা। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর দেশের নামকরা বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদরা চুপচাপ সব সহেছেন। কোনো মুখ খোলেনি।

“আলোকিত মানুষ চাই” স্লোগানের প্রবক্তা, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ গত ১.৫ বছরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা কোনো দিন বলেননি। যে মানুষটা সারাজীবন বই পড়া, মানবিকতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলেছেন—তিনি ২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশ নিয়ে একটি বাক্যও ব্যবহার করেননি। কেন?

আরও বিস্ময়ের বিষয়: বিএনপি সরকার গঠন করার পরই তিনি তারেক রহমানের সাথে দেখা করলেন। কি বিষয়ে দেখা করলেন, সে দেশের মানুষকে জানানো হয়নি। জনসমক্ষে কোনো বিবৃতি নেই, কোনো ব্যাখ্যা নেই। যে মানুষটা “আলোকিত মানুষ” গড়ার কথা বলেন, তিনি যখন নীরবে ক্ষমতাবানদের দরজায় যান—তখন সাধারণ মানুষের কাছে প্রশ্ন জাগে: আলো কার জন্য?

বুদ্ধিজীবীর কাজ আয়না ধরা। আয়না যখন মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন বিকৃতি দেখার কেউ থাকে না। শিক্ষক লাঞ্ছিত হন, বইমেলায় হামলা হয়, সংখ্যালঘু নির্যাতন হয়—বুদ্ধিজীবী চুপ। এই নীরবতা এখন অপরাধের শামিল।

জেঞ্জি প্রজন্ম ও “ভারত বয়কট”: আবেগ বনাম ভূ-বাস্তবতা :

এই নীরবতার সুযোগেই জেঞ্জি প্রজন্ম “ভারত বয়কট, ভারতীয় পণ্য বর্জন” স্লোগান তুলেছে। আবেগের জায়গা থেকে দাবিটা যৌক্তিক মনে হয়। প্রতিবেশী আধিপত্য ঠেকাতে হবে—এই চেতনা বোঝা যায়। কিন্তু আবেগ দিয়ে রাষ্ট্র চলে না, উপাত্ত ও বাস্তবতা দিয়ে চলে।

পরিবহন খাত ধ্বংসের ঝুঁকি:

ভারতীয় পণ্য বর্জন করলে প্রথমেই ধস নামবে পরিবহন সেক্টরে। বাংলাদেশের ৯০ ভাগ বাস-ট্রাক ভারতের টাটা ও অশোক লিল্যান্ডের। প্রায় ৩ লাখ বাস-ট্রাক রাস্তায়। একটা টাটা ট্রাক ৪০-৫০ লাখ, জাপানি ট্রাক ১ কোটি+। এই ৩ লাখ গাড়ি রিপ্লেস করতে ১২০ বিলিয়ন ডলার লাগবে—যা আমাদের জিডিপির ২৫%। অর্থনৈতিক সক্ষমতা নেই। বর্তমান গাড়িগুলোর ফায়সালা কী হবে? ৩ লাখ মালিক পথে বসবে। পরিবহন বন্ধ হলে খাদ্য, ওষুধ, শিল্পপণ্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আটকে যাবে।

 খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকি   :

ভারতীয় চাল, পেঁয়াজ, মসলা, কাঁচা মরিচ, ডিম আমদানি বন্ধ হলে বাজার অস্থিতিশীল। ২০২৩-এ ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করতেই ঢাকায় পেঁয়াজ ৩০ টাকা কেজি হয়েছিল। আমরা বছরে ১০-১২ লাখ টন চাল, ২৫ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করি। বিকল্প উৎস মিয়ানমার, মিশর, তুরস্ক—দাম ৩০-৪০% বেশি, সরবরাহ অনিশ্চিত। গরিব মানুষ প্রথমেই মরবে।

পানির রাজনীতি:

ভারতের সঙ্গে ২৫ বছরের গঙ্গা পানি চুক্তি এ বছর শেষ। বাংলাদেশে ৫৪টি অভিন্ন নদী ভারত থেকে আসে। তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা এখনো পাইনি। এমনিতেই ভারতের ব্যারেজের কারণে উত্তরাঞ্চল মরুভূমি হয়ে যাচ্ছে। চুক্তি নবায়ন না হলে আগামী ১০ বছরে ৩ কোটি মানুষ পানির অভাবে কৃষি ছাড়বে। পানি ছাড়া “বয়কট” টিকবে না।

 বিদ্যুৎ ও বাণিজ্য:

ভারত আমাদের ২য় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। বছরে ১৬ বিলিয়ন ডলার। কাঁচামাল, তুলা, যন্ত্রাংশের ৭০% ভারত থেকে। নেপাল-ভুটান থেকে ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসে ভারতের গ্রিড দিয়ে। বয়কট মানে লোডশেডিং, কারখানা বন্ধ।

রাজনীতির মঞ্চে “ভারত খেদাও” বলা সহজ। কিন্তু ভূ-রাজনীতিতে ভারত বয়কট করা তখনই সম্ভব, যখন বিকল্প তৈরি হবে। চীন, যুক্তরাষ্ট্র কেউ ভারতের বিকল্প না। আমাদের ভূগোল, জনসংখ্যা, বাজার সব ভারত-কেন্দ্রিক। শত্রুতা করে বাঁচা যায় না, প্রতিযোগিতা করে বাঁচতে হয়।

 বিকল্প না করে বয়কট: আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত:

বিকল্প ব্যবস্থা না করে শুধু মুখে “বয়কট” বলা কতটুকু বাস্তবিক—এটা ভাবার দাবি রাখে। ভারতের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হলে আগে নিজেকে গড়তে হবে:

শিল্প: নিজস্ব গাড়ি শিল্প, যন্ত্রাংশ শিল্প গড়া। টাটার বিকল্প জাপান-চীন থেকে আনার আগে নিজেদের ফ্যাক্টরি দরকার।

কৃষি: পেঁয়াজ, মসলা, ডালে স্বয়ংসম্পূর্ণতা। বিএডিসি, কৃষি গবেষণাকে শক্তিশালী করা।

পানি: তিস্তা, ফেনীর বিকল্প পানি ব্যবস্থাপনা। নদী খন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ।

বিদ্যুৎ:  নেপাল-ভুটান-চীনের সাথে সরাসরি গ্রিড। সৌর-বায়ু বিদ্যুৎ বাড়ানো।

বিকল্প ছাড়া বয়কট মানে নিজের পায়ে কুড়াল মারা। জেঞ্জি প্রজন্মের আবেগকে দোষ দিই না। দোষ দিই সেই বুদ্ধিজীবী ও নেতাদের, যারা আবেগকে উসকে দেয় কিন্তু বিকল্পের রোডম্যাপ দেয় না।

 সমাধান: শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, প্রজন্ম—তিন তীরে কাজ:

দেশ বাঁচাতে হলে তিন ফ্রন্টে লড়তে হবে:

শিক্ষককদের বাঁচান ও দুই হাজার লাঞ্ছনার শিকার যাঁরা তদন্ত করে দোষী সাব্যস্তদেের  দ্রুত বিচার কাজ শেষ করর। “শিক্ষক সুরক্ষা আইন করা। শিক্ষককে রাজনীতির উর্ধ্বে রাখা। শিক্ষক বাঁচলে জাতি বাঁচবে।

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদসহ সব বুদ্ধিজীবী বলবো সত্য ন্যায়ের জন্য  আপনারা নীরব থাকবেন না। নীরবতা এখন বিলাসিতা না, বিশ্বাসঘাতকতা।

প্রজন্মকে ভালো শিক্ষা দিতে হবে।  জেঞ্জিকে শুধু “বয়কট” শেখাবেন না, “কেন বয়কট, কীভাবে বয়কট” শেখান। আবেগের সাথে তথ্য দিন। তাদের পড়ালেখায় ফেরান। দেশপ্রেম মানে ঘৃণা না, দেশপ্রেম মানে দায়িত্ব ও জ্ঞান।

৫৫ বছর পেরিয়েছে স্বাধীনতার। গত দুই  বছর পড়ালেখা গোল্লায় গেছে, শিক্ষক লাঞ্ছিত হচ্ছে, বুদ্ধিজীবী নীরব। আমরা এখনো সাঁতার শিখিনি।

নজরুল বলেছিলেন—“অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানে না সন্তরণ”। আমরা কি সত্যিই সাঁতার শিখবো না? নাকি শিক্ষক ছাড়া, বুদ্ধিজীবী ছাড়া, দেশপ্রেম ছাড়া—শুধু স্লোগান নিয়ে ডুবতেই থাকবো?

সময় এখনো আছে। শিক্ষককে সম্মান দিন, বুদ্ধিজীবীকে সত্য বলতে দিন, প্রজন্মকে জ্ঞান দিন। আর ভারত বয়কটের আগে নিজেকে গড়ুন। নইলে এই পৃথুলা বসুন্ধরার বুক থেকে বাংলাদেশ হারিয়ে যাবে—আমাদের নির্বুদ্ধিতায়।

সরদার সেলিম রেজা। ছবিঃ সংগৃহীত

লেখক- সরদার সেলিম রেজা, কবি ও পরিবেশকর্মী, সভাপতি: বাংলাদেশ ইতিহাস ঐতিহ্য কেন্দ্র

এই শাখার আরও খবর

হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচল সহজ করতে প্রস্তুত ইরান

মেলবোর্ন, ২ জুন- মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেও বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচল স্বাভাবিক ও নিরাপদ রাখতে প্রস্তুত থাকার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। দেশটির…

মিয়ানমারে বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত গ্রামে বড় বিস্ফোরণ, নিহত কমপক্ষে ৪৬

মেলবোর্ন, ২ জুন- মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলীয় শান প্রদেশে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ৪৬ জন নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। শক্তিশালী এ বিস্ফোরণে শত শত ঘরবাড়ি ধ্বংস…

হাম ও হাম উপসর্গে শিশু মৃত্যু বেড়ে ৫৮৮

মেলবোর্ন, ২ জুন- দেশজুড়ে উদ্বেগজনক হারে ছড়িয়ে পড়ছে হাম। প্রাণঘাতী এই সংক্রামক রোগ এবং এর উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও তিন শিশুর মৃত্যু…

ইসরায়েলে দফায় দফায় রকেট হামলা, বেজে উঠল সাইরেন

মেলবোর্ন, ২ জুন- মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। লেবানন সীমান্ত ঘিরে চলমান সংঘাতের মধ্যে উত্তর ইসরায়েলের বিভিন্ন এলাকায় দফায় দফায় রকেট হামলার ঘটনা ঘটেছে।…

ইতালির গভীর গুহা থেকে ১ ব্যক্তিকে উদ্ধারে ৫৩ উদ্ধারকারীর দুঃসাহসিক অভিযান

মেলবোর্ন, ২ জুন- ইতালির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে একটি গভীর গুহায় আটকে পড়া এক অভিযাত্রীকে দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ উদ্ধার অভিযানের মাধ্যমে জীবিত উদ্ধার করেছেন উদ্ধারকর্মীরা। প্রায় ১২০ মিটার…

মোদি-হ্লাইং বৈঠক, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা

মেলবোর্ন, ২ জুন- ভারত ও মায়ানমারের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিতে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং মায়ানমারের প্রেসিডেন্ট উ মিন অং হ্লাইং। সোমবার…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au