বাংলাদেশ

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ইঙ্গিত, ফিরল সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে দোকান বন্ধের নির্দেশনা

  • 1:52 am - June 03, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৩২ বার
বিদ্যুত বিভাগ। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ৩ জুন- দেশে বিদ্যুতের সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির ইঙ্গিত এবং একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে শপিংমল, মার্কেট ও দোকানপাট বন্ধ রাখার সরকারি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একদিকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে বাড়তে থাকা ব্যয় সামাল দিতে সরকার মূল্য সমন্বয়ের চিন্তা করছে, অন্যদিকে বিদ্যুতের চাহিদা নিয়ন্ত্রণে সাশ্রয়ী পদক্ষেপও পুনরায় কার্যকর করা হয়েছে। ফলে সাধারণ ভোক্তা থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী মহল পর্যন্ত নানা মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

রাজধানীর ইস্কাটনের বাসিন্দা ও বেসরকারি চাকরিজীবী ইয়াসমিন ইসলাম বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপের মধ্যেই সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়লে মাসিক ব্যয় আরও বেড়ে যাবে। তার মতো অনেক পরিবারই সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির খবরে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে।

সরকার ইতোমধ্যে নির্দেশনা জারি করে জানিয়েছে, ১ জুন থেকে দেশের সব শপিংমল, মার্কেট, দোকানপাট এবং বিভিন্ন ধরনের বিলবোর্ডের আলোকসজ্জা সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ রাখতে হবে। একই সময়সীমা মেলা, বাণিজ্য মেলা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। ঈদুল আজহা উপলক্ষে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধার্থে গত ১০ মে পর্যন্ত এই সময়সীমা রাত ১০টা পর্যন্ত শিথিল করা হয়েছিল। সেই বিশেষ সুবিধার মেয়াদ শেষ হওয়ায় আগের সিদ্ধান্ত পুনর্বহাল করা হয়েছে।

এর আগে গত এপ্রিল মাসে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের উদ্দেশ্যে একই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল সরকার। তখন অফিসের সময় এক ঘণ্টা কমানো, বিয়ে ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আলোকসজ্জা সীমিত করা, সরকারি ব্যয় সংকোচন এবং জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রীষ্মকালে সন্ধ্যার পর বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। আবাসিক ও বাণিজ্যিক ব্যবহার একসঙ্গে বেড়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ তৈরি হয়। এ কারণে চাহিদা পূরণে ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে হয়, যা সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেনের মতে, দোকানপাট আগেভাগে বন্ধ রাখলে কিছুটা হলেও জ্বালানি সাশ্রয় সম্ভব। কারণ বিদ্যুতের চাহিদা কমলে তেলভিত্তিক কেন্দ্র কম চালাতে হবে এবং ফার্নেস অয়েল সাশ্রয় হবে।

পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান জানান, দেশে বর্তমানে প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। তবে বাস্তবে চাহিদা সাধারণত ১৭ হাজার মেগাওয়াটের আশপাশে থাকে এবং বর্তমানে ১৫ থেকে ১৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, সরকারের আরও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক কেন্দ্র পরিচালনার উচ্চ খরচের কারণে সব সক্ষমতা ব্যবহার করা হচ্ছে না।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, চাহিদা পুরোপুরি মেটাতে গেলে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো আরও বেশি চালাতে হবে, যা সরকারের ভর্তুকির বোঝা বাড়াবে। এছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণ, আবহাওয়া এবং অন্যান্য কারণে সাময়িক ঘাটতিও তৈরি হতে পারে।

তবে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম মনে করেন, দেশে প্রকৃত বিদ্যুৎ ঘাটতি সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি হতে পারে। তার মতে, কোনো নির্দিষ্ট সময়ে উৎপাদনের রেকর্ড দেখিয়ে সামগ্রিক পরিস্থিতি পুরোপুরি মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়।

গত ২০ মে রাত ৯টায় দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের রেকর্ড হয়। তবে ওই সময় মোট চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৮৯৭ মেগাওয়াট এবং সরবরাহ করা হয়েছিল ১৬ হাজার ৫০৫ মেগাওয়াট। ফলে ৩৯২ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়েছিল।

এদিকে বিদ্যুতের সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির আলোচনাও সামনে এসেছে। সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম কয়েক দফা বাড়ানোর পর বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) হাতে থাকলেও সরকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

তিনি বলেন, সরকার বর্তমানে যে দামে বেসরকারি খাত থেকে বিদ্যুৎ কিনছে এবং যে দামে গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে। এই ব্যবধান পূরণে সরকারকে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বাজেটে বরাদ্দের চেয়েও বেশি অর্থ ব্যয় হচ্ছে।

তবে সম্ভাব্য মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে সাধারণ গ্রাহকদের সুরক্ষার বিষয়টি সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান তিনি। প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য, দেশের ৬০ শতাংশের বেশি গ্রাহক লাইফলাইন বা ক্ষুদ্র গ্রাহক। তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে, সে বিষয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত রয়েছে।

অন্যদিকে ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম মনে করেন, বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান সংকটের পেছনে দীর্ঘদিনের নীতিগত ও কাঠামোগত সমস্যা দায়ী। তার মতে, দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ বৃদ্ধি সংক্রান্ত বিশেষ আইনের আওতায় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হলেও এতে ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন সেই ব্যয়ের চাপ সামাল দিতেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চিন্তা করা হচ্ছে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে এর প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ বিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। উৎপাদন ব্যয় বাড়ার কারণে শিল্পপণ্য, কৃষিপণ্য, পরিবহন এবং বিভিন্ন সেবার মূল্যও বৃদ্ধি পেতে পারে, যা সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে।

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের অংশ হিসেবে দোকানপাট আগেভাগে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েও আপত্তি তুলেছেন ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের বাস্তবতা শীতপ্রধান বা উন্নত দেশগুলোর মতো নয়। সন্ধ্যার পরই দেশের অধিকাংশ মানুষের কেনাকাটার সময় শুরু হয়। তাই সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে দোকান বন্ধ করলে ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়বেন।

তিনি আরও বলেন, জ্বালানি সংকটের সময় ব্যবসায়ীরা সরকারের সিদ্ধান্তকে সহযোগিতা করেছিলেন। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আগের মতো সীমাবদ্ধতা বহাল রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। দোকান মালিক সমিতি শিগগিরই সরকারের কাছে আবেদন জানাবে, যাতে অন্তত রাত ৯টা পর্যন্ত দোকানপাট খোলা রাখার অনুমতি দেওয়া হয়।

সার্বিক পরিস্থিতিতে সরকার একদিকে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের ব্যবস্থা জোরদার করছে, অন্যদিকে ভর্তুকির চাপ কমাতে বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের সম্ভাবনা বিবেচনা করছে। তবে মূল্যবৃদ্ধির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলে তা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে ইতোমধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।

সূত্রঃ বিবিসি

এই শাখার আরও খবর

পরাজয়ের ধাক্কা কাটিয়ে মাঠে মমতা, বিজেপি হটানোর নতুন কর্মসূচির ঘোষণা

মেলবোর্ন, ৩ জুন- পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের প্রায় এক মাস পর প্রথমবারের মতো প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার ও বিজেপির বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন…

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হলেন খলিলুর রহমান

মেলবোর্ন, ৩ জুন- জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্য রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ভোটে তিনি সাইপ্রাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ…

বাবা-মা ও স্ত্রীর কবরের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন তোফায়েল আহমেদ

মেলবোর্ন, ২ জুন- মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী এবং ভোলা-১ ও ভোলা-২ আসনের নয়বারের সাবেক সংসদ সদস্য তোফায়েল আহমেদকে তার নিজ ইচ্ছা…

অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষায় আগ্রহ বাড়ছে ভারতীয় শিক্ষার্থীদের, পরিবর্তন এসেছে আবেদন ও ভর্তি প্রক্রিয়ায়

মেলবোর্ন, ২ জুন- অস্ট্রেলিয়া দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয় শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য হিসেবে পরিচিত। আন্তর্জাতিক মানের ডিগ্রি, পড়াশোনা শেষে কাজের সুযোগ এবং উন্নত জীবনযাত্রার…

গর্ভপাতের জন্য থালাপতি বিজয়কে দায়ী করলেন অভিনেত্রী জুলি

মেলবোর্ন, ২ জুন- দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনেতা ও তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী থালাপতি বিজয়কে ঘিরে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অভিনেত্রী ও সাবেক নার্স জুলি দাবি করেছেন,…

‘আইএসের সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক নেই’, আদালতে রায়ান এল হৌলির দাবি

মেলবোর্ন, ২ জুন- অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে সন্ত্রাসবাদ-সম্পর্কিত গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত ৩৪ বছর বয়সী নারী রায়ান এল হৌলি জামিন আবেদনের শুনানিতে আদালতে হাজির হন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ,…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au