সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি : সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৩ জুন- পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের প্রায় এক মাস পর প্রথমবারের মতো প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার ও বিজেপির বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেস সভানেত্রী ও সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কলকাতার ধর্মতলায় আয়োজিত দলের ধরনা কর্মসূচি থেকে তিনি বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়ার পাশাপাশি একাধিক বিস্ফোরক অভিযোগও উত্থাপন করেছেন।
মঙ্গলবার (২ জুন) কলকাতার ধর্মতলার ওয়াই চ্যানেলে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা, পুনর্বাসন ছাড়া হকার উচ্ছেদ, পরীক্ষায় জালিয়াতি এবং বিজেপি সরকারের কথিত প্রতিহিংসামূলক আচরণের প্রতিবাদে এই কর্মসূচির আয়োজন করে তৃণমূল কংগ্রেস।
সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, বাংলাদেশের আলোচিত ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ) গ্রেপ্তার করার পর ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তাকে বিষয়টি প্রকাশ না করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন।
মমতা বলেন, বাংলাদেশ থেকে একজন আলোচিত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করলে রাজ্য পুলিশের এসটিএফ তাকে গ্রেপ্তার করে। এরপর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফোন করে তাকে বিষয়টি গোপন রাখার অনুরোধ জানান। তিনি অভিযোগ করে বলেন, এই ঘটনার পেছনে কারা ছিল এবং কার কার নাম উঠে এসেছিল, সে বিষয়ে তিনি অবগত আছেন। তবে প্রতিবেশী দেশের স্বার্থ বিবেচনায় তিনি সেই নাম প্রকাশ করতে চান না।
তার ভাষায়, “আমি এতদিন কিছু বলিনি। কিন্তু অত্যাচারের মাত্রা এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে আমাকে মুখ খুলতে হচ্ছে। আমি যদি নাম বলি, তাহলে বাংলাদেশে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি হতে পারে। আমি বাংলাদেশকে ভালোবাসি, তাই সেই নাম প্রকাশ করছি না।”
বক্তব্যে মমতা আরও অভিযোগ করেন, দিল্লি থেকে রাজনৈতিকভাবে তৃণমূল কংগ্রেসকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে। তার দাবি, বিজেপি প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে তৃণমূলের জনপ্রতিনিধিদের ভয়ভীতি দেখিয়ে দল ভাঙার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, “আমাকে অনেকবার নানা প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমাদের দলের একটি আদর্শ আছে, নীতি আছে। আজকে আমার কষ্ট হয়, যাদের জন্য সারাজীবন কাজ করেছি, তাদের কেউ কেউ এখন বিশ্বাসঘাতকদের সঙ্গে চলে গেছে।”
নির্বাচনে হারের পর প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট ভাষায় জানান, তিনি বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেন না এবং বিজেপিকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।
তিনি অভিযোগ করেন, ভোটে কারচুপি করে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে এবং রাজ্যে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই সাধারণ মানুষের ওপর দমন-পীড়ন শুরু করেছে।
কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি বলেন, “আমাকে ভয় দেখিয়ে থামানো যাবে না। যেখানে আমাদের কর্মসূচি আটকে দেওয়া হবে, সেখানেই আমরা অবস্থান নেব। প্রয়োজনে লালবাজার ঘেরাও হবে, নবান্ন ঘেরাও হবে, থানা ঘেরাও হবে। আমরা বিজেপিকে এই রাজ্যের ক্ষমতা থেকে সরিয়েই ছাড়ব।”
এদিন কর্মসূচি শুরুর আগে মমতা কলকাতার রেড রোড এলাকায় গিয়ে ভারতের সংবিধান প্রণেতা ড. বি. আর. আম্বেদকর এবং মহাত্মা গান্ধীর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে সেখান থেকে ধর্মতলার ওয়াই চ্যানেলে এসে ধরনা কর্মসূচিতে যোগ দেন।
তবে কর্মসূচিতে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রত্যাশিত উপস্থিতি দেখা যায়নি। দলের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হলেও অধিকাংশ বিধায়ক, সাংসদ ও শীর্ষ নেতাকে সেখানে দেখা যায়নি। উপস্থিত ছিলেন কুনাল ঘোষ, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, মদন মিত্র, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, দোলা সেন, ডেরেক ও’ব্রায়েন, ফিরহাদ হাকিমসহ কয়েকজন নেতা।
সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস ৮০টি আসনে জয়লাভ করলেও দলটির অভ্যন্তরে ভাঙনের আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ইতোমধ্যে দুই বিধায়ককে বহিষ্কার করা হয়েছে। পাশাপাশি একাধিক জনপ্রতিনিধি ও কাউন্সিলরের পদত্যাগের ঘটনাও সামনে এসেছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, তৃণমূলের একাংশের মধ্যে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। বিদ্রোহী কয়েকজন বিধায়ক বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের প্রশ্নে পৃথক অবস্থান নিয়েছেন বলেও খবর প্রকাশিত হয়েছে।
এদিকে সাবেক তৃণমূল নেতা ও বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মন্ত্রী তাপস রায় দাবি করেছেন, তৃণমূল কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একাংশ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে আস্থা হারিয়েছে, অন্য অংশ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেও মেনে নিতে চাইছে না।
তিনি বলেন, “এটা অনিবার্য ছিল। দীর্ঘদিন ধরে অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের দলে এনে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়ার ফলে দলের সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল হয়েছে। এখন তারই ফলাফল দেখা যাচ্ছে।”
অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী মমতার কর্মসূচিকে কটাক্ষ করে বলেন, সমাবেশে প্রত্যাশিত জনসমাগম হয়নি। তার দাবি, গণমাধ্যমকর্মীদের সংখ্যা উপস্থিত সমর্থকদের চেয়েও বেশি ছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর পর তৃণমূল কংগ্রেস বর্তমানে কঠিন সাংগঠনিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রকাশ্যে ফিরে এসে বিজেপিবিরোধী আন্দোলনের ঘোষণা দলীয় কর্মীদের চাঙা করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং বিদ্রোহের ইঙ্গিত ভবিষ্যতে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে বলেও মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।