বাংলাদেশ

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি সিপিজের ১০ দফা সুপারিশ

  • 3:15 pm - June 03, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৩৩ বার
কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্ট (সিপিজে)।ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ৩ জুন- বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সুরক্ষা এবং সাংবাদিকদের নিরাপদ ও স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি ১০ দফা সুপারিশ পেশ করেছে আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সুরক্ষা সংস্থা কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্ট (সিপিজে)। সংস্থাটি বলেছে, নির্বাচনের আগে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার যে অঙ্গীকার করা হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

মঙ্গলবার সিপিজের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব সুপারিশ তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় ১০০ দিন পার হলেও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের সুরক্ষার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি এখনও সীমিত পর্যায়ে রয়েছে।

সিপিজের এশিয়া-প্যাসিফিক কর্মসূচির সমন্বয়ক কুনাল মজুমদার বলেন, বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি নতুন সরকারই অতীতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নকে অনেক সময় পূর্ববর্তী সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার আগে ভিন্ন ধরনের অবস্থানের প্রতিশ্রুতি দিলেও সেই প্রতিশ্রুতির পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনও দেখা যাচ্ছে না।

প্রতিবেদনে সিপিজে উল্লেখ করেছে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা, একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করে জামিন প্রক্রিয়া জটিল করে তোলা এবং সাংবাদিকদের বিভিন্ন রাজনৈতিক বা আদর্শিক তকমা দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করা গেলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আরও শক্তিশালী হবে। এ প্রসঙ্গে সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু, শ্যামল দত্ত ও ফারজানা রূপার বিরুদ্ধে হওয়া বিভিন্ন মামলার বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে।

সংস্থাটির মতে, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত পুরোনো ও বিতর্কিত কয়েকটি আইন সংস্কার বা বাতিল করা জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে ১৯২৩ সালের অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, ১৮৬০ সালের ফৌজদারি মানহানি আইন এবং ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন। সিপিজে বলেছে, এসব আইন বহু ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে এবং এগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

একই সঙ্গে নজরদারি ও পর্যবেক্ষণসংক্রান্ত আইনি বিধান পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। তাদের মতে, সাংবাদিকদের যোগাযোগ, তথ্য সংগ্রহ এবং অনুসন্ধানী কাজের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নজরদারি স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সিপিজে আরও বলেছে, বর্তমানে অভিযোগের ভিত্তিতে সাংবাদিকদের অ্যাক্রেডিটেশন বা স্বীকৃতি বাতিলের যে পদ্ধতি চালু রয়েছে, তা সংস্কার করা প্রয়োজন। এ ছাড়া সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা হয়রানির উদ্দেশ্যে দায়ের করা তথাকথিত স্ট্র্যাটেজিক ল’সুটস অ্যাগেইনস্ট পাবলিক পার্টিসিপেশন (এসএলএপিপি) মোকাবিলায় বিশেষ আইনি সুরক্ষা চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ে চিহ্নিত করার প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সিপিজের মতে, সাংবাদিকদের ‘সাবেক সরকারের এজেন্ট’, ‘ভারতবিরোধী’ কিংবা ‘ইসলামবিরোধী’ বলে আখ্যায়িত করা শুধু তাদের পেশাগত বিশ্বাসযোগ্যতাকেই ক্ষুণ্ন করে না, বরং তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। একই সঙ্গে তথ্যসূত্র ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি তৈরি হয়, যা স্বাধীন সংবাদ সংগ্রহের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত হামলা, হুমকি ও হয়রানির ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে সিপিজে। সংস্থাটি বলেছে, সাংবাদিকদের ওপর সংঘটিত অপরাধের নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়রানি ও দমন-পীড়নের সংস্কৃতি বন্ধ করা সম্ভব হবে।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সাইবার সুরক্ষা আইন পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে এ আইনের অধীনে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো স্বাধীন ও স্বচ্ছ পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে।

সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-এর অপব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। সিপিজের মতে, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এ আইন প্রয়োগের সুযোগ সীমিত করতে হবে এবং সাংবাদিকতার কাজে ব্যবহারের পথ বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি বিশেষ ক্ষমতা আইন ও অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের মতো আইনগুলোকে হয় বাতিল করতে হবে, নয়তো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী সংশোধন করতে হবে।

গণমাধ্যম খাতের নীতিগত সংস্কার প্রসঙ্গেও মত দিয়েছে সিপিজে। সংস্থাটি বলেছে, প্রস্তাবিত গণমাধ্যম কমিশন অধ্যাদেশের মাধ্যমে এমন একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠনের ঝুঁকি রয়েছে, যা ভবিষ্যতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে এ বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানানো হয়েছে।

অন্যদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন যে সুপারিশগুলো দিয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে সিপিজে। সংস্থাটির মতে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, জবাবদিহি, পেশাগত নিরাপত্তা এবং তথ্যপ্রবাহের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সিপিজে মনে করে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আইনি সংস্কার এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি স্বাধীন, শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব। সংস্থাটি সরকারের প্রতি সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

এই শাখার আরও খবর

শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে বাংলাদেশে ফের ক্ষমতার পালাবদলের আশঙ্কা কতটা?

বাংলাদেশে তৈরি পোশাকশ্রমিকদের চলমান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশে আবারও রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের চেষ্টা হতে পারে বলে আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে নর্থইস্ট নিউজের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।…

নেতানিয়াহুর জোটে ভাঙন, রোববার সরকার গঠনের দায়িত্ব পেতে পারেন আইজেনকোট

ইসরায়েলের পরবর্তী সরকার গঠনের জন্য রোববারের মধ্যে একজন প্রার্থীকে দায়িত্ব দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পরিবর্তে বিরোধী নেতা ও সাবেক…

চুয়াডাঙ্গা বালিকা বিদ্যালয়ের দেয়ালে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান লিখল ছাত্রীরা, পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ

চুয়াডাঙ্গা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনের দেয়ালে ‘জয় বাংলা’, ‘জয় হাসিনা’, ‘মুজিব সেনা’ ও ‘ফিরছি আবার ডিসেম্বর’সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক স্লোগান লেখাকে কেন্দ্র করে এলাকায় আলোচনা-সমালোচনা…

ইতালীয় প্রতিরক্ষা প্রতিনিধিদলের ঢাকা সফর, ইউরোফাইটার টাইফুন কেনার উদ্যোগে নতুন করে আলোচনা

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর জন্য ইউরোপীয় নির্মিত বহুমুখী যুদ্ধবিমান ইউরোফাইটার টাইফুন কেনার সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইতালির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিরক্ষা প্রতিনিধিদলের ঢাকা সফরকে কেন্দ্র…

‘১৩ নভেম্বর পৃথিবীর ধ্বংস’: ৬৬ বছর আগের ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে নতুন করে আলোচনা কেন?

২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর শুক্রবার। দিনটি যত ঘনিয়ে আসছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কয়েকটি আরব গণমাধ্যমে ততই নতুন করে আলোচনায় আসছে ‘পৃথিবীর ধ্বংস’ বা মহাপ্রলয়ের একটি…

ট্রাম্প প্রশাসনে রদবদলের গুঞ্জন, পদত্যাগের খবর নাকচ করলেন রুবিও ও হেগসেথ

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড় ধরনের পরাজয়ের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনে রদবদলের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ও…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au