মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। ছবিঃ সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড় ধরনের পরাজয়ের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনে রদবদলের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তাঁদের পদ ছাড়তে পারেন, এমন খবর প্রকাশিত হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে জল্পনা তৈরি হয়েছে। তবে দুই মন্ত্রীর পদত্যাগের সম্ভাবনা নাকচ করেছে হোয়াইট হাউস ও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। তাঁদের পক্ষ থেকে এসব খবরকে ‘ভুয়া সংবাদ’ বলে অভিহিত করা হয়েছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধের ভূমিকা নিয়ে দলের ভেতরেই সমালোচনা তৈরি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দুজনই স্বীকার করেছেন, যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক চাপ ভোটারদের ওপর প্রভাব ফেলেছে। নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট, কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপ আরও বেড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে অসন্তোষ রয়েছে। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর পদত্যাগের গুঞ্জন তিনি নিজেই সরাসরি নাকচ করেছেন।
নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রুবিও বলেন, ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত তাঁর হয়ে কাজ করাই ছিল নিজের পরিকল্পনা। তিনি বলেন, ‘আমি যে কাজ করছি, তা ভালোবাসি। আর যখন তারা বলে যে তিনি চাকরি ছাড়তে যাচ্ছেন, তখন আমি সব সময় হেসে বলি, কোনটা?’
রুবিওর এই মন্তব্যের মাধ্যমে নিজের পদত্যাগের খবরকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনি। হোয়াইট হাউস ও পররাষ্ট্র দপ্তরও মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর রুবিও দায়িত্ব ছাড়তে পারেন, এমন প্রতিবেদনকে ভিত্তিহীন বলে জানিয়েছে।
তবে পিট হেগসেথের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তুলনামূলক বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ী রিপাবলিকান প্রতিনিধি থমাস ম্যাসি আগামী সপ্তাহের শুরুতেই প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব উত্থাপনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। সংবাদমাধ্যম পলিটিকোকে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তাঁর পরিকল্পনা থেকে সরে আসার কোনো ইচ্ছা নেই।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ম্যাসি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে হেগসেথকে সরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, জানুয়ারিতে নতুন ডেমোক্র্যাট–নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস দায়িত্ব নেওয়ার আগেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। কারণ, এর আগে সিনেটে নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিয়োগের জন্য বিকল্প প্রার্থীদের অনুমোদন করিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকবে।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ , ছবি : সংগৃহীত
হেগসেথের বিরুদ্ধে অভিশংসন উদ্যোগের কথা সামনে আসার পর নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। সেখানে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ও অভিশংসনের উদ্যোগকে ‘ভুয়া’ বলে আখ্যা দেন। তাঁর দাবি, একজন অসন্তুষ্ট ও পরাজিত কংগ্রেস সদস্য ডেমোক্র্যাট মিত্রদের নিয়ে এই উদ্যোগ নিয়েছেন।
ভিডিও বার্তায় হেগসেথ বলেন, ‘দেখুন, তারা আমাকে আক্রমণ করে। তারা আমাদের আক্রমণ করে, কারণ আমরা কাজ করতে সক্ষম। এটা কাজ করবে না। আমরা পিছু হটব না।’
নিজের নেতৃত্বে প্রতিরক্ষা বিভাগে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথাও তুলে ধরেন তিনি। হেগসেথের দাবি, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি বাস্তবায়নে প্রতিরক্ষা বিভাগ কাজ করছে। এর অংশ হিসেবে সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করা, প্রতিরক্ষা শিল্পের ভিত্তি পুনর্গঠন এবং বৈচিত্র্যবিষয়ক বিভিন্ন উদ্যোগ বাতিলের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ডেমোক্র্যাটদের সমালোচনা করে হেগসেথ বলেন, তাঁদের নীতিগুলো কার্যকর নয়। এ কারণে রাজনৈতিক নাটক ও ক্ষমতার প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার চেষ্টা করছেন তাঁরা। তাঁর ভাষায়, পুরো বিষয়টিই ব্যক্তিগতভাবে প্রতিপক্ষকে আক্রমণের রাজনীতি।
এদিকে এবিসি নিউজকে টেলিফোনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, হেগসেথকে নিয়ে তিনি বিভিন্ন পক্ষের কাছ থেকে ফোন পেয়েছেন। তবে তাঁকে দায়িত্বে রাখার বিষয়ে নিজের ‘পূর্ণ ইচ্ছা’ রয়েছে বলেও জানান ট্রাম্প।
বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় প্রতিরক্ষামন্ত্রীর প্রশংসা করে ট্রাম্প বলেন, ‘পিট হেগসেথ অসাধারণ কাজ করেছেন।’ এ সময় তাঁর নেতৃত্বে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেন প্রেসিডেন্ট। এর মধ্যে চলতি বছরের জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তারের অভিযান এবং ইরানে চলমান সামরিক অভিযান পরিচালনার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত
অন্যদিকে ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রতিরক্ষা বিভাগের শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বেও পরিবর্তনের কথা বিবেচনা করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের নাম আলোচনায় এসেছে। ইরান যুদ্ধের সামরিক পরিকল্পনা ও পরিচালনায় এই দুই কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
প্রতিবেদনে তাঁদের সরিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হলেও ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়নি।
এদিকে হেগসেথের বিরুদ্ধে অভিশংসন উদ্যোগ এবং তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন ইরান যুদ্ধের ব্যয়, সামরিক কৌশল ও যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বিতর্ক বাড়ছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পর ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় প্রতিরক্ষা বিভাগের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত ও শুনানির সুযোগও তাদের সামনে তৈরি হয়েছে।
এ ছাড়া হেগসেথ টেনেসির একটি শূন্য সিনেট আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহী হতে পারেন, এমন গুঞ্জনও রয়েছে। তবে এ বিষয়ে তাঁর পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।
সব মিলিয়ে, রুবিওর পদত্যাগের খবর দুই মন্ত্রণালয় থেকেই নাকচ করা হলেও হেগসেথকে ঘিরে রাজনৈতিক চাপ অব্যাহত রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রকাশ্যে তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রীর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তবে ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ, নির্বাচনী পরাজয়ের দায় এবং নতুন কংগ্রেসের সম্ভাব্য তদন্তের মুখে হেগসেথের দায়িত্বে থাকা নিয়ে বিতর্ক আরও বাড়তে পারে।
সূত্রঃ বিবিসি