বিশ্ব

‘১৩ নভেম্বর পৃথিবীর ধ্বংস’: ৬৬ বছর আগের ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে নতুন করে আলোচনা কেন?

  • 6:45 pm - November 06, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৫ বার
৬৬ বছর আগে একদল বিজ্ঞানী গাণিতিক হিসাব করে এই তারিখটিকেই পৃথিবীর শেষ দিন হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। ছবিঃ নিউ ইয়র্ক টাইমস

২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর শুক্রবার। দিনটি যত ঘনিয়ে আসছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কয়েকটি আরব গণমাধ্যমে ততই নতুন করে আলোচনায় আসছে ‘পৃথিবীর ধ্বংস’ বা মহাপ্রলয়ের একটি পুরোনো ভবিষ্যদ্বাণী। দাবি করা হচ্ছে, ৬৬ বছর আগে একদল বিজ্ঞানী গাণিতিক হিসাব করে এই তারিখটিকেই পৃথিবীর শেষ দিন হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। তবে বিষয়টির পেছনে রয়েছে জনসংখ্যা বৃদ্ধিবিষয়ক একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা, যার ব্যাখ্যা প্রচলিত দাবির চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

১৯৬০ সালের ৪ নভেম্বর মার্কিন বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স–এ তিন গবেষকের একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। এর শিরোনাম ছিল ‘ডুমসডে: ফ্রাইডে, নভেম্বর ১৩’। অর্থাৎ, ‘মহাপ্রলয়: শুক্রবার, ১৩ নভেম্বর’। শিরোনামটি চমকপ্রদ হলেও গবেষণাটির মূল বিষয় ছিল পৃথিবীর জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি এবং ভবিষ্যতে সেই প্রবৃদ্ধি কোথায় গিয়ে পৌঁছাতে পারে, তার গাণিতিক বিশ্লেষণ।

গবেষকেরা হিসাব করে দেখিয়েছিলেন, মানবজাতির জনসংখ্যা যদি অতীতের মতো একই গতিতে ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তাহলে তাদের প্রস্তাবিত গাণিতিক মডেল অনুযায়ী ২০২৬ সালের নভেম্বর মাসে জনসংখ্যা তাত্ত্বিকভাবে ‘অসীমে’ পৌঁছাবে। সেই হিসাব থেকেই উঠে আসে ১৩ নভেম্বর তারিখটি।

তবে গবেষকেরা কি সত্যিই বলেছিলেন, ওই দিন মানবজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাবে? পৃথিবীতে কি কোনো মহাজাগতিক বিপর্যয় ঘটবে? নাকি এটি ছিল জনসংখ্যা বৃদ্ধির একটি গাণিতিক মডেল থেকে পাওয়া কাল্পনিক ফলাফল?

গবেষণার শুরু যেভাবে

এই আলোচিত গবেষণার মূল গবেষক ছিলেন অস্ট্রীয়–মার্কিন পদার্থবিদ হেইঞ্জ ফন ফোরস্টার। ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়ের ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের গবেষক প্যাট্রিশিয়া মোরা ও লরেন্স অ্যামিয়টের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি গবেষণাটি তৈরি করেন।

গবেষকেরা খ্রিস্টীয় যুগের শুরু থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত বিশ্বের জনসংখ্যার ২৪টি ঐতিহাসিক হিসাব বিশ্লেষণ করেন। এসব তথ্যের মাধ্যমে তাঁরা বোঝার চেষ্টা করেন, দীর্ঘ সময় ধরে পৃথিবীর জনসংখ্যা কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে এবং সেই পরিবর্তনের পেছনে কী ধরনের প্রবৃদ্ধির ধারা কাজ করেছে।

তাঁরা জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে একটি নির্দিষ্ট বা স্থির হারের প্রবৃদ্ধি হিসেবে বিবেচনা করেননি। বরং গবেষণায় ব্যবহার করেন ‘হাইপারবলিক গ্রোথ’ বা ক্রমবর্ধমান গতিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ধারণা। এই মডেলে শুধু জনসংখ্যাই বাড়ে না, সময়ের সঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতিও আরও দ্রুত হয়।

গবেষকদের ধারণা ছিল, মানুষের মধ্যে যোগাযোগ, পারস্পরিক সহযোগিতা, সামাজিক সম্পর্ক এবং বিভিন্ন ধরনের জোট গঠনের সক্ষমতা নতুন নতুন উদ্ভাবনের সুযোগ তৈরি করে। এসব উদ্ভাবন পরিবেশগত কিছু সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে সহায়তা করে। ফলে মানুষের বেঁচে থাকা ও প্রজননের সক্ষমতা বাড়ে এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি আরও ত্বরান্বিত হতে পারে।

ঐতিহাসিক জনসংখ্যার তথ্যের ওপর এই গাণিতিক মডেল প্রয়োগ করার পর গবেষকেরা একটি বিশেষ ফল পান। তাঁদের সমীকরণে জনসংখ্যা বৃদ্ধির রেখা একটি ‘সিঙ্গুলারিটি’ বা গাণিতিক অসংগতি বিন্দুর দিকে এগিয়ে যায়। মডেলটির হিসাবে সেই বিন্দুর সময় ছিল ২০২৬.৮৭।

এই সংখ্যাকে ক্যালেন্ডারের হিসাবে রূপান্তর করলে ২০২৬ সালের নভেম্বরের মাঝামাঝি সময় পাওয়া যায়। সেখান থেকেই ১৩ নভেম্বরের উল্লেখ আসে।

অর্থাৎ, গবেষকেরা বলেননি যে ওই দিন পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। বরং তাঁরা দেখিয়েছিলেন, অতীতের জনসংখ্যা বৃদ্ধির ধারা যদি কোনো পরিবর্তন ছাড়াই অনির্দিষ্টকাল চলতে থাকে, তাহলে তাঁদের ব্যবহৃত গাণিতিক সমীকরণ একপর্যায়ে এমন একটি বিন্দুতে পৌঁছাবে, যেখানে জনসংখ্যার মান অসীম হয়ে যায়।

‘ডুমসডে’ কি সত্যিই পৃথিবীর শেষ হওয়ার পূর্বাভাস?

গবেষণার শিরোনামে ‘ডুমসডে’ শব্দটি ব্যবহারের কারণে বিষয়টি সহজেই পৃথিবীর ধ্বংসের ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু গবেষকদের উদ্দেশ্য ছিল জনসংখ্যা বৃদ্ধির একটি গাণিতিক সীমাবিন্দু তুলে ধরা, পৃথিবীর অস্তিত্বের সমাপ্তি ঘোষণা করা নয়।

গবেষণায় কোথাও বলা হয়নি, ২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর পৃথিবীর সঙ্গে কোনো গ্রহাণুর সংঘর্ষ হবে, সূর্যে বিস্ফোরণ ঘটবে কিংবা ভয়াবহ ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে মানবজাতি বিলুপ্ত হবে। কোনো নির্দিষ্ট দিনে মানুষের মৃত্যু বা পৃথিবীর ধ্বংস ঘটবে, এমন পূর্বাভাসও দেওয়া হয়নি।

এখানে ‘অসীম’ বলতে বাস্তবে পৃথিবীতে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা অসীম হয়ে যাওয়াকে বোঝানো হয়নি। এটি একটি গাণিতিক ফলাফল। অর্থাৎ, নির্দিষ্ট কিছু শর্ত অপরিবর্তিত থাকবে ধরে নিয়ে একটি সমীকরণকে ভবিষ্যতের দিকে প্রসারিত করলে যে তাত্ত্বিক ফল পাওয়া যায়, সেটিই গবেষকেরা তুলে ধরেছিলেন।

বাস্তব পৃথিবীতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি নির্ভর করে জন্মহার, মৃত্যুহার, খাদ্য ও পানির প্রাপ্যতা, পরিবেশ, অর্থনৈতিক অবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, প্রযুক্তি এবং সামাজিক পরিবর্তনের মতো অসংখ্য বিষয়ের ওপর। এসব বিষয় সময়ের সঙ্গে বদলায়। ফলে অতীতের কোনো একটি প্রবৃদ্ধির ধারা ভবিষ্যতেও একইভাবে চলবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

মূল গবেষণাতেও পরিবেশ, সম্পদ ও জনসংখ্যার ওপর প্রভাব বিস্তারকারী বিভিন্ন পরিস্থিতির গুরুত্ব উপেক্ষা করার সুযোগ নেই বলে স্পষ্ট করা হয়েছিল। এসব উপাদান জন্মহার ও মৃত্যুহার পরিবর্তন করতে পারে। এর ফলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতিপথও বদলে যেতে পারে।

১৯৬৪ সালের মিশরীয় সংবাদপত্রের নিবন্ধ কেন আলোচনায়?

১৩ নভেম্বর ২০২৬ তারিখটি নিয়ে নতুন করে আলোচনার আরেকটি কারণ ১৯৬৪ সালের একটি পুরোনো সংবাদপত্রের কাটিং। ২৯ নভেম্বর মিশরের সংবাদপত্র ওয়াতানি–তে মিশেল তাকলার নামে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে ২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর পৃথিবীর সমাপ্তির প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে।

১৯৬৪ সালের একটি পুরোনো সংবাদপত্রের কাটিং। ছবিঃ সংগৃহীত

মিশরের কয়েকটি গণমাধ্যম সম্প্রতি সেই পুরোনো সংবাদপত্রের কাটিংয়ের ছবি পুনঃপ্রকাশ করেছে। ছয় দশকের বেশি সময় আগের ওই নিবন্ধের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে পুরোনো জনসংখ্যা গবেষণার সঙ্গে নিবন্ধটিকে মিলিয়ে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।

তবে ১৯৬০ সালের বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং ১৯৬৪ সালের সংবাদপত্রের নিবন্ধকে একই বিষয় হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। ১৩ নভেম্বর ২০২৬ তারিখের গাণিতিক হিসাবটি ১৯৬০ সালে হেইঞ্জ ফন ফোরস্টার ও তাঁর সহকর্মীরা প্রকাশ করেছিলেন। এটি মিশেল তাকলারের তৈরি কোনো গবেষণা ছিল না।

এ ছাড়া তাকলারের নিবন্ধের প্রকৃত বক্তব্য নিয়েও বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যাচ্ছে। কোনো কোনো প্রতিবেদনে নিবন্ধটিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। আবার কিছু প্রতিবেদনে সৌর কার্যকলাপ, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে।

তাই মূল নিবন্ধের পূর্ণ পাঠ যাচাই না করে এসব বক্তব্যকে একটি অভিন্ন বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না। একইভাবে সৌর কার্যকলাপ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে প্রচারিত কোনো দাবিকেও ১৯৬০ সালের জনসংখ্যাবিষয়ক গবেষণার সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

সৌরঝড়ের সঙ্গে ১৩ নভেম্বরের কোনো সম্পর্ক আছে?

১৩ নভেম্বরকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়া কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে, ওই দিন বা তার আশপাশে সূর্যের অস্বাভাবিক কার্যকলাপের কারণে পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। এর ফলে যোগাযোগব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং পৃথিবীর পরিবেশে বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কার কথাও বলা হচ্ছে।

তবে সৌর কার্যকলাপ একটি পরিচিত প্রাকৃতিক ঘটনা। সূর্য নির্দিষ্ট চক্রের মধ্য দিয়ে যায়, যার ফলে বিভিন্ন সময়ে তার সক্রিয়তার মাত্রা বাড়ে বা কমে। এই সক্রিয়তার সময় সৌরঝড়, সোলার ফ্লেয়ার এবং করোনাল মাস ইজেকশন বা সূর্যের বহিঃস্তর থেকে বিপুল পরিমাণ প্লাজমা ও চৌম্বকীয় পদার্থ নির্গত হওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে।

শক্তিশালী সৌরঝড় পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করতে পারে। এর ফলে স্যাটেলাইট, যোগাযোগব্যবস্থা, নেভিগেশন প্রযুক্তি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার ঝুঁকি থাকে। তবে এসব ঝুঁকি থাকার অর্থ এই নয় যে সূর্য কোনো নির্দিষ্ট দিনে পৃথিবী ধ্বংস করে দেবে।

১৯৬০ সালে সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত জনসংখ্যাবিষয়ক গবেষণায় ১৩ নভেম্বর ২০২৬ তারিখের সঙ্গে সৌর কার্যকলাপ, ভূতাত্ত্বিক বিপর্যয় কিংবা জলবায়ুগত দুর্যোগের কোনো সম্পর্ক স্থাপন করা হয়নি।

১৩ নভেম্বর নিয়ে আতঙ্কের কারণ নেই: জ্যোতির্বিজ্ঞানী

তারিখটিকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়া জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বিপদের দাবিগুলো নিয়ে কথা বলেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী এমাদ মুজাহেদ। বিবিসিকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, চলতি বছর সৌর কার্যকলাপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। তবে এটি বিজ্ঞানীদের কাছে পরিচিত একটি প্রাকৃতিক চক্রের অংশ, আকস্মিক বা অপ্রত্যাশিত কোনো ঘটনা নয়।

মুজাহেদের ভাষ্য অনুযায়ী, সৌর কার্যকলাপ নিয়মিত চক্রের মধ্য দিয়ে যায় এবং সৌরঝড় মহাবিশ্বের শুরু থেকেই ঘটে আসছে। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির ফলে বিজ্ঞানীরা এখন এসব ঘটনা আগের তুলনায় আরও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ, নজরদারি এবং পূর্বাভাস দিতে পারছেন।

তিনি আরও বলেন, ১৩ নভেম্বর এমন কোনো পরিচিত বা প্রত্যাশিত জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা নেই, যা পৃথিবীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বা আতঙ্ক তৈরির কারণ হতে পারে।

গাণিতিক সমীকরণ কিংবা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক মডেলের মাধ্যমে পৃথিবীর সমাপ্তির নির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণের ধারণাও নাকচ করেন তিনি। তাঁর মতে, জ্যোতির্বিদ্যা বা মহাকাশবিজ্ঞানে এমন কোনো ইঙ্গিত নেই, যা পৃথিবীর শেষ ঘনিয়ে আসার কথা বলে।

মুজাহেদের বক্তব্য অনুযায়ী, ১৩ নভেম্বর নিয়ে যেসব দাবি ছড়ানো হচ্ছে, সেগুলো জ্যোতির্বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞদের কোনো সতর্কতা বা বৈজ্ঞানিক ঘোষণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি নয়। বরং বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নানা প্ল্যাটফর্মে এসব বক্তব্য প্রচার করছে, যার পক্ষে গ্রহণযোগ্য বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

কেন ১৯৬০ সালের হিসাব বাস্তবের সঙ্গে মেলেনি?

পুরোনো গবেষণাটির সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা ছিল, এতে অতীতের জনসংখ্যা বৃদ্ধির একটি নির্দিষ্ট প্রবণতাকে ভবিষ্যতেও অপরিবর্তিত থাকবে বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গত ছয় দশকে পৃথিবীর জনসংখ্যা, অর্থনীতি, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং সামাজিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে।

বিশ্বজুড়ে জন্মহার, মৃত্যুহার এবং মানুষের গড় আয়ুতে পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে ১৯৬০–এর দশকের পর থেকে বৈশ্বিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। ফলে ১৯৬০ সালে গবেষকেরা যে দ্রুততর জনসংখ্যা বৃদ্ধির গাণিতিক রেখা ব্যবহার করেছিলেন, বাস্তবে বিশ্বের জনসংখ্যা সেই ধারায় এগোয়নি।

গবেষণাটি প্রকাশের সময় বিশ্বের জনসংখ্যা ছিল আনুমানিক ৩০০ কোটি। বর্তমানে তা ৮০০ কোটির বেশি। কিন্তু এই বৃদ্ধি ১৯৬০ সালের মডেলে অনুমিত অসীম জনসংখ্যার কাছাকাছি যাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখায়নি।

জাতিসংঘের সাম্প্রতিক জনসংখ্যা পূর্বাভাসেও এর বিপরীত চিত্র পাওয়া যায়। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক বিভাগের ওয়ার্ল্ড পপুলেশন প্রসপেক্টস ২০২৪ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৮২০ কোটি। সংস্থাটির পূর্বাভাস বলছে, ২০৮০–এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে এই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১ হাজার ৩০ কোটিতে পৌঁছাতে পারে। এরপর জনসংখ্যা ধীরে ধীরে কমে ২১০০ সালের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ২০ কোটিতে নেমে আসতে পারে।

জাতিসংঘের এই পূর্বাভাসে দেখা যাচ্ছে, চলতি শতাব্দীতেই বিশ্ব জনসংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ বেশ কয়েকটি দেশে জন্মহার আগের প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত কমে আসছে।

এ কারণে জনসংখ্যা নিয়ে বৈশ্বিক উদ্বেগের ধরনও বদলে যাচ্ছে। একসময় অতিরিক্ত জনসংখ্যা, খাদ্যসংকট ও সম্পদের ওপর চাপ ছিল আলোচনার প্রধান বিষয়। এখন অনেক দেশে জন্মহার কমে যাওয়া, মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ার মতো বিষয়ও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

সব মিলিয়ে ১৯৬০ সালের গবেষণাটি ছিল জনসংখ্যা বৃদ্ধির একটি গাণিতিক মডেল নিয়ে গবেষকদের সতর্কতামূলক আলোচনা। এর মাধ্যমে তাঁরা দেখাতে চেয়েছিলেন, অতীতের দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রবণতা অনির্দিষ্টকাল চলতে থাকলে কী ধরনের গাণিতিক ফল পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রবণতা অপরিবর্তিত থাকেনি।

তাই ২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার কোনো বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস নয়। তারিখটি মূলত ৬৬ বছর আগের একটি জনসংখ্যা গবেষণার গাণিতিক হিসাব থেকে এসেছে। সৌরঝড় বা অন্য কোনো মহাজাগতিক বিপর্যয়ের সঙ্গে এর সম্পর্কেরও কোনো প্রমাণ নেই। ফলে পুরোনো গবেষণার শিরোনামকে বাস্তব বিপর্যয়ের ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে ধরে আতঙ্কিত হওয়ার বৈজ্ঞানিক কারণ নেই।

সূত্রঃ বিবিসি

এই শাখার আরও খবর

ট্রাম্প প্রশাসনে রদবদলের গুঞ্জন, পদত্যাগের খবর নাকচ করলেন রুবিও ও হেগসেথ

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড় ধরনের পরাজয়ের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনে রদবদলের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ও…

আত্মসমর্পণ না করার কারণ হিসেবে আতঙ্কের কথা জানালেন দুই হত্যার আসামি সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা

অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে সাবেক প্রেমিক জেসি বেয়ার্ড ও তার সঙ্গী লুক ডেভিসকে হত্যার অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা বিউ লামারে-কন্ডন আদালতে জানিয়েছেন, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর…

চাঁদা না পেয়ে ফের হামলা, রায়েরবাজারে এজেআর কুরিয়ারের কাভার্ডভ্যানে আগুন

চাঁদা দাবিকে কেন্দ্র করে একের পর এক হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার মধ্যে রাজধানীর রায়েরবাজারে এজেআর কুরিয়ার সার্ভিসের একটি কাভার্ডভ্যানে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে গাড়িতে…

মেলবোর্নে বাড়িতে ছুরিকাঘাতে নারীসহ আহত ৩, জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে এক নারী; লকডাউনে পাশের স্কুল

অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে একটি বাড়িতে ছুরিকাঘাতে এক নারী ও দুই পুরুষ আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৮ বছর বয়সী এক নারীর অবস্থা আশঙ্কাজনক। এ ঘটনায় সতর্কতামূলক…

রোনালদোকে অবসর না নেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন পর্তুগাল কোচ, যা বললেন জর্জ জেসুস

আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর অবসরের ঘোষণায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন পর্তুগাল জাতীয় দলের প্রধান কোচ জর্জ জেসুস। পাঁচবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী এই তারকাকে জাতীয় দল থেকে অবসর…

কোস্ট গার্ডের পাঁচ জাহাজের নাম পরিবর্তন, বাদ ‘জয় বাংলা’ ও জাতীয় চার নেতার নাম

বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের পাঁচটি জাহাজের নাম পরিবর্তন করেছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, একটি জাহাজ থেকে ‘জয় বাংলা’ নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় চার নেতার…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au