বিশ্ব

কৌশলগত স্বার্থে ঘনিষ্ঠতা, ভারত-মিয়ানমার বৈঠকে কী আলোচনা হলো

  • 4:11 pm - June 03, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৩৭ বার
ভারত-মিয়ানমার বৈঠক। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ৩ জুন- মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইংয়ের সাম্প্রতিক ভারত সফরকে ঘিরে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। চলতি বছরের বিতর্কিত নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই তাঁর প্রথম বিদেশ সফর। পাঁচ দিনের এই সফরে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন। দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের আলোচনায় বাণিজ্য, যোগাযোগ ব্যবস্থা, সীমান্ত নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর শুধু দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য নয়, বরং পুরো অঞ্চলের ভূরাজনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর মিয়ানমার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। পশ্চিমা দেশগুলোর অনেকেই দেশটির সামরিক নেতৃত্বের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং তাদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক সীমিত করে। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক মিয়ানমারের বর্তমান সরকারের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ স্থলসীমান্ত রয়েছে। এই সীমান্ত ভারতের মিজোরাম, মণিপুর, নাগাল্যান্ড এবং অরুণাচল প্রদেশের সঙ্গে সংযুক্ত। ফলে মিয়ানমারের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটিতে শুরু হওয়া সংঘাত ও গৃহযুদ্ধের কারণে হাজার হাজার মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়। এতে সীমান্ত নিরাপত্তা, শরণার্থী ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে ভারতের উদ্বেগ বাড়ে।

গত জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে মিন অং হ্লাইং ক্ষমতায় আসেন এবং এপ্রিলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। যদিও পশ্চিমা বিশ্ব নির্বাচনটিকে অবাধ ও সুষ্ঠু বলে স্বীকৃতি দেয়নি এবং অনেক দেশ এটিকে ‘প্রহসনের নির্বাচন’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে, তবুও মিয়ানমারের সরকার দাবি করে এটি দেশটিকে গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

সোমবার অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মিয়ানমারের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ এবং দীর্ঘদিন ধরে গৃহবন্দি অবস্থায় থাকা সাবেক নেত্রী অং সান সু চির প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিসরি পরে সাংবাদিকদের জানান, ভারত বিশ্বাস করে যে বিচ্ছিন্নতার নীতি নয়, বরং সংলাপ ও সহযোগিতার মাধ্যমেই মিয়ানমারে স্থিতিশীলতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। বৈঠকে দুই নেতা এ বিষয়েও একমত হন যে, উভয় দেশ তাদের ভূখণ্ডকে কোনো তৃতীয় দেশের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার কাজে ব্যবহার করতে দেবে না।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর মিয়ানমারের সামরিক নেতৃত্বের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তাও বহন করছে। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত রাজীব ভাটিয়ার মতে, মিয়ানমারের বর্তমান সরকার এই সফরকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির একটি সুযোগ হিসেবে দেখছে। বিশেষ করে ভারতের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ তাদের কূটনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে।

বর্তমানে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কিছু এলাকায় নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি করেছে সরকার। এই পরিস্থিতিতে দেশটির পশ্চিম সীমান্ত এবং সীমান্তবর্তী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম নিয়েও তারা উদ্বিগ্ন। পর্যবেক্ষকদের ধারণা, বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে তথ্য আদান-প্রদান এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও ভারতের সহায়তা চাওয়া হতে পারে।

ভারতীয় সাংবাদিক ও বিশ্লেষক অভিষেক দে মনে করেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রশ্নের চেয়ে ভারতের কাছে তার নিজস্ব কৌশলগত ও নিরাপত্তাগত স্বার্থ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, নয়াদিল্লি চায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে। দ্বিতীয়ত, ভারত তার ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতি বাস্তবায়নে মিয়ানমারকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবে বিবেচনা করে। এই নীতির লক্ষ্য হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য, যোগাযোগ, নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করা।

তৃতীয়ত, মিয়ানমারে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবও ভারতের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। চীন দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারে অবকাঠামো, জ্বালানি ও বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগ করে আসছে। বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত কৌশলগত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও মিয়ানমারকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে বেইজিং। ফলে ভারত চায় মিয়ানমারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে সেখানে চীনের একক প্রভাব বিস্তার রোধ করতে।

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মিন অং হ্লাইংয়ের ভারত সফর শুধু একটি আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সফর নয়; বরং এটি দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভবিষ্যৎ কৌশলগত সমীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং চীন-ভারত প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রেক্ষাপটে এই সফরের প্রভাব আগামী দিনগুলোতে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।

 

এই শাখার আরও খবর

ইরানি হামলায় সব ফ্লাইট বাতিল করল ইজিপ্টএয়ার

মেলবোর্ন, ৪ জুন- কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় দুই দিনের সব ফ্লাইট বাতিল করেছে মিসরের রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা…

মুক্তি পেলেন সেলিনা হায়াৎ আইভী

মেলবোর্ন, ৪ জুন- নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগের নেত্রী সেলিনা হায়াৎ আইভী কারামুক্ত হয়েছেন। বুধবার রাতে গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তিনি…

অতিগোপনে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলবে ইরান, থাকবে না গণমাধ্যমকর্মীও

মেলবোর্ন, ৪ জুন- ফিফা বিশ্বকাপকে সামনে রেখে নিজেদের চূড়ান্ত প্রস্তুতিতে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছে ইরান জাতীয় ফুটবল দল। বিশ্বকাপের আগে শেষ প্রস্তুতি ম্যাচটি সম্পূর্ণ গোপনীয়তার…

বীর মুক্তিযোদ্ধা একেএম রহমতুল্লাহ আর নেই

মেলবোর্ন, ৪ জুন- সাবেক সংসদ সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এ কে এম রহমতুল্লাহ মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি…

জেলা ডাকবাংলোয় মিলল মা ও মেয়ের মরদেহ

মেলবোর্ন, ৪ জুন-  বরগুনা জেলা পরিষদের ডাকবাংলো থেকে এক মা ও তার দুই মেয়ের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বুধবার বিকেলে ডাকবাংলোর তৃতীয় তলার দুটি পৃথক…

প্রত্যাহার হচ্ছে প্রিপেইড মিটারের মাসিক চার্জ

মেলবোর্ন, ৪ জুন-  বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটারে আরোপিত অতিরিক্ত মাসিক চার্জ প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং খুব শিগগিরই আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au