পলিন হ্যানসন । ছবি সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৫ জুন- অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসীদের সম্পত্তি মালিকানা নিয়ে ডানপন্থী রাজনৈতিক দল ওয়ান নেশনের প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। দলটির নেতা পলিন হ্যানসন অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক নন এমন ব্যক্তিদের আবাসন সম্পত্তি কেনার বিষয়ে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে দলটির নীতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দলটির নতুন সহযোগী ও সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী বার্নাবি জয়েস প্রকাশ্য টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দেওয়ায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন।
ওয়ান নেশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক নন এমন কিছু বিদেশি ব্যক্তি ও অস্থায়ী ভিসাধারীদের আবাসন সম্পত্তির মালিকানা সীমিত করার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে স্থায়ী বাসিন্দাদের (পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট) ক্ষেত্রে এই নীতি প্রযোজ্য হবে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় প্রায় চার লাখ স্থায়ী বাসিন্দা নিজস্ব বাড়ির মালিক। শুরুতে বার্নাবি জয়েস এক সাক্ষাৎকারে ইঙ্গিত দেন যে স্থায়ী বাসিন্দাদেরও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নাগরিকত্ব গ্রহণ করতে হবে, অন্যথায় তাদের বাড়ি বিক্রি করতে হতে পারে। পরে তিনি সেই বক্তব্য থেকে সরে এসে বলেন, নীতিটি স্থায়ী বাসিন্দাদের জন্য নয়; বরং বিদেশে বসবাসকারী বিদেশি নাগরিক এবং অস্থায়ী ভিসাধারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে।
বিতর্কের মধ্যেই পলিন হ্যানসন নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, অস্ট্রেলিয়ার আবাসন সংকট মোকাবিলায় নাগরিক নন এমন ব্যক্তিদের সম্পত্তি কেনার বিষয়ে কঠোর নীতি প্রয়োজন। তাঁর মতে, দেশের আবাসন বাজারে স্থানীয় নাগরিকদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
এদিকে নিউ সাউথ ওয়েলসের সিনেটর শন বেল-ও একই বিষয়ে একটি রেডিও সাক্ষাৎকারে কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হন। উপস্থাপক বারবার জানতে চান, কেউ যদি সম্পত্তি বিক্রি করতে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে সরকার কি জোরপূর্বক তাদের বাড়ি থেকে বের করে দেবে? জবাবে সিনেটর বেল সরাসরি উত্তর দিতে পারেননি। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পত্তি বিক্রির সুযোগ দেওয়া হবে এবং নীতিটি এখনও পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে।
তাঁর অস্পষ্ট জবাবে অসন্তোষ প্রকাশ করেন উপস্থাপক। একপর্যায়ে তিনি সাক্ষাৎকার শেষ করে দেন এবং পরে মন্তব্য করেন যে নীতিটি সম্পর্কে পরিষ্কার ব্যাখ্যা না থাকায় পুরো আলোচনা বিশৃঙ্খল হয়ে পড়েছে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে স্কাই নিউজে বার্নাবি জয়েসের সাক্ষাৎকার। সাক্ষাৎকারে তিনি প্রথমে বলেন, স্থায়ী বাসিন্দাদের ক্ষেত্রেও সম্পত্তি বিক্রির বিষয়টি প্রযোজ্য হতে পারে। কিন্তু অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর তিনি দ্রুত দলীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং পরে আবার স্টুডিওতে ফিরে এসে নিজের বক্তব্য সংশোধন করতে চান।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী সাংবাদিক জানান, অনুষ্ঠান শেষে বার্নাবি জয়েস বুঝতে পারেন যে তিনি দলের নীতির সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। এরপর তিনি দলীয় কার্যালয়ে একাধিকবার ফোন করেন। বিভিন্ন কর্মকর্তার কাছ থেকে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা পাওয়ার পর তিনি পুনরায় স্টুডিওতে ফিরে এসে নতুন বক্তব্য রেকর্ড করার অনুরোধ জানান।
পরে সম্প্রচারিত নতুন বক্তব্যে জয়েস বলেন, স্থায়ী বাসিন্দাদের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হবে না এবং তাদের সম্পত্তি বিক্রিতে বাধ্য করার কোনো পরিকল্পনা নেই। তিনি বলেন, স্থায়ী বাসিন্দাদের নাগরিকত্ব অর্জনে উৎসাহিত করা হলেও তাদের বাড়ি বিক্রিতে বাধ্য করা নীতির অংশ নয়। বিষয়টি নিয়ে আরও স্পষ্টতা প্রয়োজন ছিল এবং এখন তিনি সে বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পেয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, প্রস্তাবিত নীতিটি মূলত এমন বিদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে যারা অস্ট্রেলিয়ার স্থায়ী বাসিন্দা নন।
ঘটনার পর স্কাই নিউজের উপস্থাপক মন্তব্য করেন, পুরো ঘটনা দুটি বিষয় স্পষ্ট করেছে। প্রথমত, ওয়ান নেশন এখনো তাদের নীতি চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করতে পারেনি। দ্বিতীয়ত, বার্নাবি জয়েস প্রথমে দলটির নীতির সবচেয়ে কঠোর ব্যাখ্যাটিই ধরে নিয়েছিলেন।
এদিকে ন্যাশনালস পার্টির নেতা ম্যাট ক্যানাভান পুরো ঘটনাকে দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, বার্নাবি জয়েস তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু হলেও টেলিভিশনে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া সত্যিই কষ্টকর ছিল।
ম্যাট ক্যানাভানের ভাষ্য, তিনি মনে করেন না যে বার্নাবি জয়েস ব্যক্তিগতভাবে এমন নীতিতে বিশ্বাস করেন। তাঁর মতে, এ ধরনের নীতি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে কঠোর এবং সমাজে অপ্রয়োজনীয় বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার আবাসন সংকট, অভিবাসন নীতি এবং বিদেশিদের সম্পত্তি মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। ওয়ান নেশনের সাম্প্রতিক প্রস্তাব সেই বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। তবে নীতিটির সুনির্দিষ্ট রূপ কী হবে এবং এটি বাস্তবায়নের কোনো সম্ভাবনা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত সামনে আসেনি।
সূত্রঃ News.com.au