মেলবোর্ন, ৬ জুন- বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বত মাউন্ট এভারেস্টকে ঘিরে অসংখ্য ইতিহাস, অর্জন ও ট্র্যাজেডির গল্প রয়েছে। তবে এসব কাহিনির মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী রহস্যগুলোর একটি জড়িয়ে আছে দুই ব্রিটিশ পর্বতারোহী জর্জ ম্যালোরি ও অ্যান্ড্রু কোমিন আরভিনের নামের সঙ্গে। প্রায় এক শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি, তারা ১৯২৪ সালেই এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছেছিলেন কি না।
যদি তারা সফল হয়ে থাকেন, তাহলে এভারেস্ট জয়ের ইতিহাস নতুন করে লিখতে হবে। কারণ বর্তমানে স্বীকৃত ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯৫৩ সালে নিউজিল্যান্ডের এডমুন্ড হিলারি ও নেপালের তেনজিং নোরগে প্রথম মানুষ হিসেবে এভারেস্টের শীর্ষে পৌঁছান। কিন্তু ম্যালোরি ও আরভিন যদি তার ২৯ বছর আগেই শিখরে উঠে থাকেন, তাহলে তারাই হতেন বিশ্বের প্রথম এভারেস্টজয়ী।
তবে এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। আর সেই কারণেই প্রায় ১০০ বছর পরও ম্যালোরি-আরভিনের অভিযান পর্বতারোহণ ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও অমীমাংসিত রহস্য হিসেবে রয়ে গেছে।
বিজ্ঞান ও অনুসন্ধানবিষয়ক সাময়িকী ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক এবং জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের বিভিন্ন প্রতিবেদনে এই রহস্যময় অভিযানের নানা দিক উঠে এসেছে।
১৯২৪ সালের সেই অভিযানের শুরু
১৯২৪ সালে একটি ব্রিটিশ অভিযাত্রী দলের সদস্য হিসেবে এভারেস্ট অভিযানে অংশ নেন ৩৭ বছর বয়সী জর্জ ম্যালোরি এবং ২২ বছর বয়সী তরুণ প্রকৌশলী অ্যান্ড্রু আরভিন। সে সময় এভারেস্টে ওঠা ছিল প্রায় অসম্ভব বলে বিবেচিত একটি চ্যালেঞ্জ। আধুনিক সরঞ্জাম, আবহাওয়া পূর্বাভাস বা উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থার কিছুই তখন ছিল না।
তখন নেপাল বিদেশি অভিযাত্রীদের জন্য বন্ধ ছিল। ফলে তারা তিব্বতের উত্তর দিক দিয়ে এভারেস্টে আরোহণ শুরু করেন।
১৯২৪ সালের ৬ জুন ম্যালোরি ও আরভিন কয়েকজন তিব্বতি সহযোগীকে সঙ্গে নিয়ে প্রায় ২২ হাজার ৯৬৬ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত নর্থ কোল এলাকা থেকে চূড়ার দিকে যাত্রা শুরু করেন। পরদিন তারা আরও প্রায় চার হাজার ফুট উপরে উঠে ২৬ হাজার ৯০২ ফুট উচ্চতায় শেষ ক্যাম্প স্থাপন করেন।

অ্যান্ড্রু আভরিন (বামে) ও জর্জ ম্যালোরি (ডানে)। ছবি: সংগৃহীত
সেখানেই তিব্বতি সহযোগীদের দায়িত্ব শেষ হয়। তারা নিচে ফিরে আসেন এবং ম্যালোরির লেখা একটি চিরকুট দলের আরেক সদস্য নোয়েল ওডেলের কাছে পৌঁছে দেন।
চিরকুটে ম্যালোরি লিখেছিলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ৮ জুন খুব ভোরে তারা চূড়ার উদ্দেশে শেষ আরোহন শুরু করবেন। তিনি এমন ইঙ্গিতও দিয়েছিলেন যে নির্দিষ্ট সময়ে ওডেল তাদের দেখতে পেতে পারেন।
এরপর আসে ৮ জুন। আকাশে মেঘের ফাঁক তৈরি হলে নোয়েল ওডেল দূরে পাহাড়ের ঢালে দুটি ক্ষুদ্র চলমান অবয়ব দেখতে পান। পরবর্তীতে ধারণা করা হয়, তারা ছিলেন ম্যালোরি ও আরভিন।
এটাই ছিল তাদের শেষ দেখা।
এরপর থেকে দুই পর্বতারোহী পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকায় জায়গা করে নেন।
নিখোঁজ হওয়ার পর শুরু হয় অনুসন্ধান
ম্যালোরি ও আরভিনের কোনো খোঁজ না পেয়ে নোয়েল ওডেল নিজেই তাদের শেষ ক্যাম্পে ওঠেন। তিনি আরও কিছুটা উপরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়া ও তীব্র ঝড়ের কারণে তাকে ফিরে আসতে হয়।
অভিযাত্রী দলের নেতা এডওয়ার্ড নর্টন পরে লন্ডনের দ্য টাইমস পত্রিকায় একটি টেলিগ্রাম পাঠান। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, শেষ অভিযানে ম্যালোরি ও আরভিন নিহত হয়েছেন।
তবে তাদের মরদেহের কোনো সন্ধান তখন পাওয়া যায়নি।
রহস্য আরও গভীর হয় ১৯৩৩ সালে। সে বছর একটি ব্রিটিশ অভিযাত্রী দল এভারেস্টের প্রায় ২৭ হাজার ৭৫৫ ফুট উচ্চতায় অ্যান্ড্রু আরভিনের আইস অ্যাক্স বা বরফ কাটার কুড়াল খুঁজে পায়। এতে প্রমাণ হয়, তারা খুব উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন।
এরপর ১৯৬০, ১৯৭৫ এবং ১৯৯৫ সালে বিভিন্ন দেশের কয়েকজন পর্বতারোহী এভারেস্টে একটি পুরোনো মরদেহ দেখার দাবি করেন। তবে তাদের দেওয়া অবস্থান ও বর্ণনায় মিল না থাকায় কোনো তথ্যই নিশ্চিত করা যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব সাক্ষ্য অনেক সময় একে অপরের সঙ্গে মিশে গিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে এবং রহস্য আরও জটিল করেছে।

১৯২৪ সালে এভারেস্টে অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন আরভিন। ছবি: সংগৃহীত
৭৫ বছর পর মিলল ম্যালোরির মরদেহ
দীর্ঘ ৭৫ বছর ধরে রহস্যে ঢাকা থাকার পর ১৯৯৯ সালের ১ মে গুরুত্বপূর্ণ এক আবিষ্কার হয়।
মার্কিন পর্বতারোহী কনরাড অ্যাঙ্কার এভারেস্টের উত্তর পাশে প্রায় ২৬ হাজার ৭৬৮ ফুট উচ্চতায় বরফে জমে থাকা একটি মরদেহ খুঁজে পান। পরে সেটি জর্জ ম্যালোরির বলে নিশ্চিত করা হয়।
মরদেহ পরীক্ষা করে দেখা যায়, তার একটি পা ভেঙে গিয়েছিল এবং মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল। ধারণা করা হয়, তিনি পাহাড় থেকে পড়ে গিয়ে মারা যেতে পারেন।
তবে ম্যালোরির মরদেহ উদ্ধারের পরও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি। কারণ তার সঙ্গে থাকা ক্যামেরা বা অভিযানের কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
আরভিনের খোঁজ তখনো অধরা ছিল।
১০০ বছর পর মিলল আরভিনের প্রথম নিশ্চিত নিদর্শন
রহস্যের নতুন অধ্যায় শুরু হয় ২০২৪ সালে।
মার্কিন পর্বতারোহী ও চলচ্চিত্র নির্মাতা জিমি চিনের নেতৃত্বাধীন একটি দল এভারেস্টের উত্তর দিকে সেন্ট্রাল রংবুক হিমবাহ এলাকায় একটি পুরোনো বুট খুঁজে পায়। বুটটির ভেতরে একটি মানব পা ও মোজা ছিল।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল মোজার ওপর সেলাই করা একটি নাম। সেখানে লেখা ছিল ‘এ সি আরভিন’, যা অ্যান্ড্রু কোমিন আরভিনের নামের সংক্ষিপ্ত রূপ। পরবর্তীতে বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা করে জানান, এটি প্রায় নিশ্চিতভাবেই আরভিনের নিদর্শন।
বুটটিতে ১৯২০-এর দশকের পর্বতারোহীদের ব্যবহৃত লোহার পেরেক লাগানো ছিল। চামড়ার ক্ষয়প্রাপ্ত অবস্থাও প্রায় ১০০ বছর বরফের নিচে পড়ে থাকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করেন গবেষকেরা।
২০২৪ সালের ১১ অক্টোবর এই আবিষ্কারের খবর প্রকাশ্যে আসে এবং তা বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

জর্জ ম্যালোরির মরদেহ পাওয়া যায় ১৯৯৯ সালে। ছবি: সংগৃহীত
নতুন আবিষ্কার থেকে কী জানা গেল
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আবিষ্কার অন্তত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে।
এখন নিশ্চিত হওয়া গেছে যে অ্যান্ড্রু আরভিন এভারেস্টেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
আরভিনের আত্মীয় ও তার জীবনীকার জুলি সামার্স বলেন, উদ্ধার হওয়া বুট, পা এবং মোজাই তার শেষ পরিণতির গল্প বলে দেয়।
তবে নতুন আবিষ্কার আরও কিছু প্রশ্নও তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞরা জানতে চাইছেন, কীভাবে আরভিনের বুট এবং পায়ের অংশ সেন্ট্রাল রংবুক হিমবাহে এসে পৌঁছাল?
জার্মান পর্বতারোহণ ইতিহাসবিদ জোচেন হেমলেবের মতে, কয়েকটি সম্ভাবনা রয়েছে। আরভিন হয়তো পাহাড়ের উত্তর-পূর্ব ঢাল থেকে পড়ে গিয়েছিলেন, কোনো তুষারধস তাকে বহুদূর নিয়ে যেতে পারে অথবা দুর্ঘটনার পর তার দেহ পাহাড়ের অন্য অংশে ছিটকে পড়ে থাকতে পারে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নের উত্তর এখনো নেই
ম্যালোরি ও আরভিন কি সত্যিই এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছেছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তর আজও অজানা।
হেমলেবের মতে, নতুন আবিষ্কার নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটি থেকে বোঝা যাচ্ছে না তারা চূড়ায় পৌঁছেছিলেন কি না বা তাদের সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল। তার ভাষায়, এখনো এই রহস্য সমাধানের কোনো স্পষ্ট পথ দেখা যাচ্ছে না।
রহস্যের চাবিকাঠি হতে পারে একটি ক্যামেরা
বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস, এই শতবর্ষী রহস্যের উত্তর হয়তো লুকিয়ে আছে একটি ছোট ক্যামেরার মধ্যে।
ম্যালোরি ও আরভিন তাদের অভিযানের সময় একটি কোডাক ক্যামেরা সঙ্গে নিয়েছিলেন। সেটি এখনো উদ্ধার করা যায়নি।
যদি কোনোদিন সেই ক্যামেরা পাওয়া যায় এবং তার ভেতরের ফিল্ম সংরক্ষিত অবস্থায় থাকে, তাহলে হয়তো জানা যাবে তাদের শেষ মুহূর্তের ঘটনা এবং তারা এভারেস্টের শীর্ষে পৌঁছেছিলেন কি না।
জিমি চিন মনে করেন, আরভিনের বুট যেখানে পাওয়া গেছে, তার আশপাশের এলাকাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান ক্ষেত্র। তিনি সুনির্দিষ্ট অবস্থান প্রকাশ করতে চান না, কারণ এতে ওই এলাকায় অতিরিক্ত মানুষের ভিড় হতে পারে।
তার বিশ্বাস, সেই এলাকাতেই হয়তো আরও গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন, এমনকি বহু প্রতীক্ষিত ক্যামেরাটিও লুকিয়ে রয়েছে।
চিন বলেন, যদি ক্যামেরাটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়, তাহলে সেটিই হবে এভারেস্টের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারগুলোর একটি। কারণ সেটি হয়তো এক শতাব্দী ধরে মানুষের মনে ঘুরপাক খাওয়া প্রশ্নটির উত্তর দিতে পারবে, ম্যালোরি ও আরভিন কি সত্যিই বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জয় করেছিলেন, নাকি চূড়ার খুব কাছাকাছি গিয়েই তাদের যাত্রার সমাপ্তি ঘটেছিল।
সূত্রঃ ডেইলি স্টার