বাংলাদেশের নতুন অর্থবছরের বাজেট। প্রতীকী ছবি
মেলবোর্ন, ১২ জুন- জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেট হিসেবে এটি দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট প্রস্তাব। নতুন বাজেটে বিভিন্ন খাতে কর, শুল্ক, ভ্যাট ও প্রণোদনা কাঠামোয় পরিবর্তনের ফলে কিছু পণ্যের দাম বাড়তে পারে, আবার কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে কমার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব অনুযায়ী, দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা এবং স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি আমদানিনির্ভর পণ্যের ওপর শুল্ক ও কর বৃদ্ধি করা হয়েছে। অন্যদিকে কৃষি, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পকে উৎসাহিত করতে কর ছাড় ও শুল্ক অব্যাহতির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী আমদানিকৃত ওয়াশিং মেশিনের ওপর নতুন করে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। ফলে বিদেশি ওয়াশিং মেশিনের দাম বাড়তে পারে। তবে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ওয়াশিং মেশিন, ইলেকট্রিক ওভেন ও মাইক্রোওয়েভ ওভেন তৈরির অন্যতম কাঁচামাল ফ্লোট গ্লাস আমদানিতে বিদ্যমান ৪৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে দেশীয়ভাবে উৎপাদিত এসব পণ্যের দাম কিছুটা কমতে পারে।
ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলচালিত গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে কর বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে এ ধরনের গাড়ির দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে সিগারেট তৈরিতে ব্যবহৃত আমদানিকৃত সিগারেট পেপারের ওপর সম্পূরক শুল্ক ৩০০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৫০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যার প্রভাব তামাকজাত পণ্যের বাজারেও পড়তে পারে।
স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে বাইসাইকেলের যন্ত্রাংশ, গ্রিজ প্রুফ ও গ্লাসিন পেপার, কম ক্ষমতাসম্পন্ন বৈদ্যুতিক মোটর, কাজুবাদাম এবং জিপসাম বোর্ড ও শিট আমদানির ওপর অতিরিক্ত শুল্ক ও রেগুলেটরি ডিউটি আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে এসব পণ্যের আমদানিনির্ভর বাজারে মূল্য বৃদ্ধি পেতে পারে।
অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জন্য কিছু স্বস্তির খবরও রয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০টি কৃষি ও ভোগ্যপণ্যের ওপর উৎসে কর কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে চাল, গম, আলু, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম স্থিতিশীল বা কিছুটা কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
শিশুখাদ্যের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ফলে আমদানিকৃত শিশুখাদ্যের দাম কমতে পারে। একই সঙ্গে সার ও কীটনাশকের ওপর ভ্যাট এবং আগাম কর অব্যাহতির ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যয়ও কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কর ছাড়ের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। হার্টের স্টেন্ট ও চোখের ইন্ট্রাওকুলার লেন্স সরবরাহে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়ার ফলে হার্টের রিংয়ের দাম প্রায় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত এবং চোখের লেন্সের দাম প্রায় ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কমতে পারে। এছাড়া ডায়ালাইসিস ফিল্টার ও হেমোডায়ালাইসিসে ব্যবহৃত ব্লাড টিউবিং সেট আমদানিতে কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব থাকায় কিডনি রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় কমতে পারে। ক্যানসারের ওষুধ তৈরির কয়েকটি কাঁচামালের আমদানি শুল্কও শূন্য করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করতে ইলেকট্রিক গাড়ি ও প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির ক্ষেত্রে শুল্ক-কর রেয়াতের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ফলে এসব গাড়ির দাম কমতে পারে এবং বাজারে এ ধরনের যানবাহনের ব্যবহার বাড়তে পারে।
স্থানীয় প্রসাধনী শিল্পের কাঁচামালে সম্পূরক শুল্ক কমানোর ফলে দেশীয় স্কিন কেয়ার ও বিউটি পণ্যের দামও কমতে পারে। পাশাপাশি গিটার, পিয়ানো, ভায়োলিনসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র আমদানিতে রেগুলেটরি শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে সংগীতচর্চার সরঞ্জাম তুলনামূলক সাশ্রয়ী হতে পারে।
সিনেমা ও মিডিয়া শিল্পের জন্যও রয়েছে ইতিবাচক খবর। উচ্চ প্রযুক্তির সিনেমাটোগ্রাফিক ক্যামেরা, প্রজেক্টর এবং এসব যন্ত্রের খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানির শুল্ক কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ফলে চলচ্চিত্র নির্মাণ ও পেশাদার ভিডিও উৎপাদনে ব্যবহৃত সরঞ্জামের দাম কমতে পারে।
এছাড়া খেজুর ও বিভিন্ন ধরনের মসলার ওপর বিদ্যমান ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব থাকায় এসব পণ্যের বাজারমূল্যেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতে স্থানীয় উৎপাদনকে উৎসাহ দিতে মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টার ও অন্যান্য প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদনে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধার মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। স্থানীয় মোবাইল ফোন শিল্পের ২২ ধরনের কাঁচামালের ওপর অগ্রিম কর কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণেরও প্রস্তাব রয়েছে। ফলে দেশে উৎপাদিত বা সংযোজিত প্রযুক্তিপণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকতে পারে।
একই সঙ্গে মোবাইল সিমের ওপর আরোপিত ৩০০ টাকার কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে নতুন সিম ক্রয়ে গ্রাহকরা সরাসরি সুবিধা পেতে পারেন।
ডিজিটাল অর্থনীতি ও উদ্ভাবনী খাতকে উৎসাহ দিতে স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান, কনটেন্ট নির্মাতা এবং ফ্রিল্যান্সারদের জন্যও বড় ধরনের কর সুবিধার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তাদের বিভিন্ন সেবার ওপর ভ্যাট অব্যাহতি, সেবা আমদানিতে কর ছাড় এবং স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানের ভাড়া খাতে ভ্যাট মওকুফের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব উদ্যোগ দেশের প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা ও স্বাধীন পেশাজীবীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রস্তাবিত বাজেটে একদিকে স্থানীয় শিল্প সুরক্ষার জন্য আমদানিনির্ভর পণ্যে কর বাড়ানো হয়েছে, অন্যদিকে কৃষি, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব খাতে কর ছাড় দিয়ে উৎপাদন ও বিনিয়োগ উৎসাহিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এসব পদক্ষেপের প্রকৃত প্রভাব বাজারে কতটা পড়ে, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন ও মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর।