এএসআইও প্রধানের সতর্কবার্তা: ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী অস্ট্রেলিয়ায় হামলা বা গুপ্তহত্যার চেষ্টা করতে পারে। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৬ জুন: অস্ট্রেলিয়ার অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা এএসআইও (ASIO)-এর মহাপরিচালক মাইক বার্জেস সতর্ক করে বলেছেন, ইরান-সমর্থিত একটি গোষ্ঠী ভবিষ্যতে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর এমনকি লক্ষ্যভিত্তিক গুপ্তহত্যার মতো সহিংস কর্মকাণ্ড চালাতে বা অন্যদের এমন হামলায় উসকানি দিতে পারে।
বার্ষিক নিরাপত্তা মূল্যায়ন প্রতিবেদনে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং বিদেশি হস্তক্ষেপের কারণে অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি আগের তুলনায় আরও জটিল হয়ে উঠেছে। তাঁর মতে, ইউরোপে সক্রিয় থাকা ইরান-সমর্থিত নেটওয়ার্ক ভবিষ্যতে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও বিস্তার ঘটাতে পারে।
মাইক বার্জেস বলেন, “আমাদের মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে, এই গোষ্ঠী অস্ট্রেলিয়ায় অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর কিংবা গুপ্তহত্যার মতো কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে বা অন্যদের প্ররোচিত করতে পারে।”
তিনি আরও জানান, ইসলামিক স্টেট (আইএস), আল-কায়েদা এবং তাদের সহযোগী সংগঠনগুলো আবারও পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে হামলার সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ হওয়া ব্যক্তিদের সংখ্যা বাড়ছে, যা নিরাপত্তা সংস্থার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে।
‘সম্ভাব্য’ হুমকি স্তর বহাল
অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় সন্ত্রাসী হুমকির মাত্রা আপাতত “Probable” (সম্ভাব্য) পর্যায়েই রাখা হয়েছে। তবে বার্জেস বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি এই শব্দটির চেয়েও বেশি উদ্বেগজনক।
তিনি বলেন, গোয়েন্দাদের কাছে কোনো নির্দিষ্ট হামলার তথ্য নেই, কিন্তু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সহিংসতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সম্ভাবনা আগের তুলনায় বেড়েছে। তাঁর ভাষায়, “যেমন জলবায়ু পরিবর্তন চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়, তেমনি বর্তমান পরিস্থিতি সহিংসতার সম্ভাবনাও বাড়িয়ে দিয়েছে।”

এএসআইওর মহাপরিচালক মাইক বার্জেস বলেছেন, বৈশ্বিক সংঘাত, বিদেশি হস্তক্ষেপ ও সন্ত্রাসবাদের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির কারণে অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা পরিবেশ উল্লেখযোগ্যভাবে অবনতি হয়েছে।
ছবি: CC BY 3.0
বিদেশি গুপ্তচরবৃত্তি ও হত্যার আশঙ্কা
মাইক বার্জেস জানান, বর্তমানে অন্তত পাঁচটি বিদেশি রাষ্ট্র অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকদের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি পরিচালনা করছে। এদের প্রধান লক্ষ্য বিদেশি সরকারের সমালোচক বা ভিন্নমতাবলম্বীরা।
তিনি একটি ঘটনার উল্লেখ করে বলেন, সম্প্রতি ভিক্টোরিয়ার একটি ফাস্টফুড রেস্টুরেন্টে দুই বিদেশি গোয়েন্দা কর্মকর্তা এক ব্যক্তিকে ভয়ভীতি ও চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করেছিল। এছাড়া তিনি সতর্ক করেন, ভবিষ্যতে কোনো বিদেশি সরকার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতেই একজন অস্ট্রেলীয় নাগরিককে হত্যা করার চেষ্টা করতে পারে।
সাইবার হামলার বড় ঝুঁকি
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, একটি বিদেশি রাষ্ট্রের হ্যাকার দল অস্ট্রেলিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার নেটওয়ার্কে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যতে প্রয়োজনমতো সেই অবকাঠামো অচল করে দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করা।
এএসআইও জানায়, হ্যাকাররা শুধু নেটওয়ার্কে প্রবেশই করেনি, তারা আইটি কর্মকর্তাদের লগইন তথ্য ও পাসওয়ার্ডও সংগ্রহ করেছিল। পরে সংস্থাটি আক্রান্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে এই অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ব্যবস্থা নেয়।
অকাস (AUKUS) প্রকল্পও গুপ্তচরদের লক্ষ্য
মাইক বার্জেস জানান, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা জোট AUKUS-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের জন্যও বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সক্রিয় রয়েছে।
তিনি বলেন, এক বিদেশি গোয়েন্দা কর্মকর্তা একটি ভুয়া পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ে একজন অস্ট্রেলীয় নিরাপত্তা ছাড়পত্রধারী কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। প্রথমে গবেষণা প্রতিবেদনের জন্য অর্থ প্রদান করা হলেও পরে AUKUS-এর গোপন তথ্য চাওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বিষয়টি সন্দেহজনক মনে করে এএসআইওকে জানালে গোয়েন্দা সংস্থা পুরো অভিযানটি ব্যর্থ করে দেয়।
ইহুদিবিদ্বেষ ও রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ
এএসআইও প্রধান বলেন, ইসলামপন্থি উগ্রবাদী, নব্য-নাৎসি এবং কিছু চরমপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে ইহুদিবিদ্বেষ একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা যাচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, সিডনি ও মেলবোর্নে ইহুদি-সংশ্লিষ্ট কিছু স্থাপনায় অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ইরানের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে।
তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ইসরায়েল সরকারের সমালোচনা এবং ইহুদিবিদ্বেষ এক বিষয় নয়। রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকলেও সহিংসতা বা ভয়ভীতি প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।