টিফিন কিনতে বেরিয়েই গুলিবিদ্ধ ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৬ জুন- কুমিল্লা নগরের কাটাবিল এলাকায় মাদক ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছে ষষ্ঠ শ্রেণির এক শিক্ষার্থী। টিফিনের বিরতিতে বিদ্যালয় থেকে বন্ধুদের সঙ্গে খাবার কিনতে বের হয়ে এ হামলার শিকার হয় সে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে নগরের কাটাবিল এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। আহত শিক্ষার্থীর নাম ইথান আহমেদ। সে এলাকার ইউনুস মিয়ার ছেলে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গুলিটি ইথানের পিঠে বিদ্ধ হয়ে তার ফুসফুসেও আঘাত করেছে। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. মোহাম্মদ শাহজাহান জানান, হাসপাতালে তাৎক্ষণিকভাবে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের শয্যা খালি না থাকায় প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, কুমিল্লা নগরের কাটাবিল এলাকা দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ও স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাতপ্রবণ হিসেবে পরিচিত। বুধবার রাত থেকেই স্থানীয় দুটি পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। রাতভর কয়েক দফা ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল।
বৃহস্পতিবার দুপুরে আগের রাতের ঘটনার প্রতিবাদ এবং এলাকায় মাদক ব্যবসা বন্ধের দাবিতে স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের ব্যানারে একটি মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মানববন্ধন শেষ হওয়ার পর একদল অস্ত্রধারী ব্যক্তি সেখানে হামলা চালায়। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয় এবং গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে।
এ সময় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ প্রাণ বাঁচাতে ছোটাছুটি শুরু করে। ঠিক তখনই টিফিনের বিরতিতে বিদ্যালয় থেকে বের হওয়া ইথান আহমেদের পিঠে গুলি লাগে। সংঘর্ষে উভয় পক্ষের আরও অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন। তাদের স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল হালিম বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে মানববন্ধন চলছিল। হঠাৎ হামলা ও গুলির ঘটনায় পুরো এলাকা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। একটি স্কুলপড়ুয়া শিশু গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। এলাকাবাসী মাদক ব্যবসার স্থায়ী অবসান চায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক বাসিন্দা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় দুটি পক্ষের মধ্যে মাদককেন্দ্রিক বিরোধ চলছে। প্রশাসন দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে নিরীহ মানুষ আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
গুলিবিদ্ধ ইথানের মা সোনিয়া আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তার একমাত্র ছেলে স্কুলে পড়তে গিয়েছিল। টিফিন খেতে বের হওয়ার সময় গুলিবিদ্ধ হয়েছে। কোনো অপরাধ না করেও তাকে এমন ঘটনার শিকার হতে হয়েছে। তিনি জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
ঘটনার পর শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। অভিভাবক মাহাবুব আলম বলেন, সন্তানদের নিরাপদে লেখাপড়া করার জন্য স্কুলে পাঠানো হয়। কিন্তু স্কুলসংলগ্ন এলাকায় যদি প্রকাশ্যে গুলি চলে, তাহলে শিশুদের নিরাপত্তা কোথায়, সেই প্রশ্ন এখন সবার।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, বুধবার রাত থেকেই এলাকায় সংঘর্ষ চলছিল। পুলিশ রাতের বেলায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলেও পরদিন সকালে কঠোর অভিযান চালানো হলে এমন ঘটনা এড়ানো যেত।
কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. সাইফুল মালিক বলেন, ঘটনাস্থলে পুলিশের একাধিক টিম ও গোয়েন্দা পুলিশ কাজ করছে। জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, মাদক ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে স্থানীয় অপু গ্রুপ ও সাব্বির গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। গুলিবিদ্ধ শিক্ষার্থীকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে এবং অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার শরীর থেকে গুলি অপসারণের প্রস্তুতি চলছে।
তবে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এ ঘটনায় কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ। সংঘর্ষ ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং মাদক কারবার নির্মূলে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।