মেলবোর্ন, ৯ জুলাই- সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর বৈধতা নিয়ে করা আপিলগুলোর ওপর আজ বৃহস্পতিবার রায় ঘোষণা করবেন আপিল বিভাগ। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপ, গণভোটের বিধান বাতিলসহ সংবিধানে আনা একাধিক পরিবর্তনের বৈধতা নিয়ে দীর্ঘ শুনানি শেষে এ রায় দেওয়া হচ্ছে। দেশের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে বহুল আলোচিত এ মামলার রায়ের দিকে এখন সবার নজর।
প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বিভাগ বুধবার টানা তৃতীয় দিনের শুনানি শেষে রায়ের জন্য আজকের দিন ধার্য করেন।
পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে মোট তিনটি পৃথক আপিল করা হয়েছে। এর মধ্যে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ চারজন একটি আপিল করেন। নওগাঁর বাসিন্দা মো. মোফাজ্জল হোসেন আরেকটি পৃথক আপিল করেন। এছাড়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও পৃথক একটি আপিল দায়ের করেন।
শুনানি শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব পরিবর্তনের কারণে বাক্স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেলের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, শুনানিতে আদালতের কাছে যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে যে, পঞ্চদশ সংশোধনীর যেসব বিধান সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর (বেসিক স্ট্রাকচার) সঙ্গে সাংঘর্ষিক, সেগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার আদালতের রয়েছে।
২০১১ সালের ৩০ জুন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জাতীয় সংসদে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হয়। ওই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ৫৪টি ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হয়েছিল। এর মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপ, অবৈধভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা এই চার মূলনীতি পুনর্বহাল ছিল উল্লেখযোগ্য।
পরবর্তীতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে পৃথক দুটি রিট আবেদন করা হয়।
ওই বছরের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট রায় দেন। রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপ এবং গণভোটের বিধান বাতিলসংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনীর ২০ ও ২১ ধারা বাতিল ঘোষণা করা হয়। পাশাপাশি সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত ৭ক, ৭খ এবং ৪৪(২) অনুচ্ছেদও সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক উল্লেখ করে বাতিল ঘোষণা করেন আদালত।
হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিলগুলোর শুনানি গত সোমবার শুরু হয়। টানা তিন দিনের শুনানি শেষে বুধবার আপিল বিভাগ রায় ঘোষণার জন্য বৃহস্পতিবার দিন নির্ধারণ করেন।
শুনানিতে বিভিন্ন আপিলকারীর পক্ষে আইনজীবী এ এস এম শাহরিয়ার কবির অংশ নেন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ, অনীক আর হক এবং ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আবদুল্যাহ আল মাসুদ। এছাড়া লিভ টু আপিলকারী সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ইমরান এ সিদ্দিক আদালতে শুনানিতে অংশ নেন।
আজকের রায়ের মাধ্যমে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর বিতর্কিত বিভিন্ন বিধানের ভবিষ্যৎ এবং দেশের সাংবিধানিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রশ্নে সর্বোচ্চ আদালতের অবস্থান স্পষ্ট হবে বলে আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।