অন্তঃসত্ত্বা হলেন সরকারি শিশু পরিবারের কিশোরী
মেলবোর্ন, ১১ জুলাই- ফরিদপুরে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন সরকারি শিশু পরিবারে (বালিকা) এক কিশোরীর (১৪) অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় করা মামলায় একমাত্র আসামিকে গ্রেপ্তার…
মেলবোর্ন, ১০ জুলাই- সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার গড়কাটি গ্রামে ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার পর দুই সপ্তাহের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও আতঙ্ক কাটেনি ক্ষতিগ্রস্তদের। স্থানীয়দের দাবি, হামলার মিছিলে এলাকার মানুষের পাশাপাশি অনেক অপরিচিত মুখও ছিল। তারা মনে করছেন, সুদীপ্ত রায়কে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার পরও যেভাবে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, মন্দির ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হয়েছে, তার পেছনে কেবল ধর্মীয় ক্ষোভ নয়, অন্য উদ্দেশ্যও থাকতে পারে।
২৩ জুন সুনামগঞ্জের সীমান্তবর্তী গড়কাটি গ্রাম ও বাদাঘাট বাজারে চারটি মন্দির, একাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েকটি বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। ঘটনার সূত্রপাত হয় ২১ বছর বয়সী সুদীপ্ত রায়ের একটি ফেসবুক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ ওঠার পর।
সুদীপ্তর বাবা নিখিল রায় জানান, ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি মীমাংসার জন্য তিনি স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাদের পরামর্শে ছেলে সুদীপ্তকে নিয়ে বাদাঘাট বাজারে যান। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই উত্তেজিত লোকজন জড়ো হয়ে তাদের ঘিরে ফেলে।
তিনি বলেন, তিনি নিজে স্মার্টফোন ব্যবহার করেন না, ফেসবুকও বোঝেন না। বিষয়টি শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করতেই ছেলেকে নিয়ে বাজারে গিয়েছিলেন। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে শত শত মানুষ সেখানে জড়ো হয়ে সুদীপ্তকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তারা বাজারের একটি দোকানে আশ্রয় নেন। পরে খবর পেয়ে তাহিরপুর থানা পুলিশ এসে দোকানের পেছনের দরজা দিয়ে সুদীপ্তকে বের করে থানায় নিয়ে যায়। কিন্তু তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার পরই পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

গড়কাটি গ্রামে হামলার শিকার বাড়িতে ভাঙচুরের চিহ্ন। ছবিঃ সংগৃহীত
নিখিল রায়ের ভাষ্য, ছেলে পুলিশের হেফাজতে চলে যাওয়ার পর শত শত মানুষ মিছিল নিয়ে বাদাঘাট বাজার থেকে গড়কাটি গ্রামের দিকে যায় এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, দোকান ও মন্দিরে হামলা চালায়।
সুদীপ্তর মা কেতকী রায় বলেন, তারা জানতেন না তাদের ছেলে ফেসবুকে কী লিখেছে। তিনি বলেন, “আমার ছেলে কী করেছে, আমরা জানতাম না। আমরা তো বিষয়টি মীমাংসার জন্যই তাকে নিয়ে গিয়েছিলাম। আইনের হাতে তুলে দেওয়ার পরও কেন আমাদের ঘরবাড়ি ভাঙচুর করা হলো, তা আজও বুঝতে পারছি না।”
তিনি অভিযোগ করেন, হামলাকারীরা ঘরের আসবাবপত্র ভেঙে ফেলে, নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার ও অন্যান্য মালামাল নিয়ে যায়। পরিবারের দোকানটিও ভাঙচুর করা হয়।
ঘটনার সময় সুদীপ্তকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বাদাঘাট বাজারের ব্যবসায়ী মুক্তার হোসেন।
নিখিল রায় বলেন, উত্তেজিত জনতা বারবার সুদীপ্তকে দোকান থেকে বের করে নিতে চাইছিল। তখন মুক্তার হোসেন দোকানের শাটার নামিয়ে তাকে ভেতরে আটকে রাখেন। তার ভাষায়, শাটার নামিয়ে না রাখলে জনতা হয়তো তার ছেলেকে হত্যা করত।
মুক্তার হোসেনও একই তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, স্থানীয় কয়েকজনের অনুরোধে সুদীপ্তকে তার দোকানের সামনে আনা হয়েছিল। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই মিছিলকারীরা সেখানে এসে তাকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করে। তিনি তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন, আশ্রয় নেওয়া একজন মানুষকে আঘাত করা ঠিক হবে না। কিন্তু পরিস্থিতি এতটাই উত্তেজনাপূর্ণ ছিল যে শেষ পর্যন্ত দোকানের শাটার বন্ধ করে দিতে হয়। পরে বাজার কমিটির সদস্যদের সহায়তায় পুলিশ এসে সুদীপ্তকে নিরাপদে নিয়ে যায়।
সুদীপ্তকে সরিয়ে নেওয়ার পরপরই কয়েকশ মানুষ বাদাঘাট বাজার থেকে মিছিল নিয়ে গড়কাটি গ্রামে যায়। সুদীপ্তর কাকা দিলীপ রায়ের দাবি, হামলাকারীরা তিন দফায় তাদের বাড়িতে হামলা চালায়। প্রতিবার স্থানীয় লোকজন প্রতিরোধ করলে তারা কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে আসে। হামলার সময় বাড়ির নারীরা অন্য কক্ষে দরজা বন্ধ করে আতঙ্কে অবস্থান করেন।
তিনি আরও জানান, বাদাঘাট বাজারে তাদের পরিবারের সদস্য অরুণ রায় ও রঙ্গন রায়কে মারধর করা হয় এবং কয়েকটি দোকানেও ভাঙচুরের চেষ্টা চালানো হয়।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এবং স্থানীয় অনেকেই দাবি করেছেন, মিছিলে বিপুল সংখ্যক অপরিচিত মানুষ ছিলেন। তাদের অনেককে আগে এলাকায় কখনও দেখা যায়নি। স্থানীয়দের ধারণা, আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন এনে মিছিলকে বড় করা হয়েছিল।
বাদাঘাট বাজারের একজন ব্যবসায়ী বলেন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা শুরুতেই এগিয়ে এলে হয়তো হামলা ও ভাঙচুর ঠেকানো সম্ভব হতো। কিন্তু ধর্মীয় ইস্যু হওয়ায় তারা সক্রিয় ভূমিকা নিতে চাননি।
হামলার পর গড়কাটি গ্রামের সার্বজনীন মন্দির, কালীমন্দির, দুর্গামন্দির এবং নাটমন্দিরে গিয়ে দেখা যায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন। বড় বড় হাতুড়ি দিয়ে নাটমন্দিরের পিলার ভেঙে ফেলা হয়েছে। টিনের ছাউনি মাটিতে লুটিয়ে রয়েছে। কালীমন্দিরের প্রতিমা ভাঙচুর করে টেনে দরজার সামনে এনে ফেলে রাখা হয়েছে। দুর্গামন্দিরের দেয়াল, পিলার এবং ভেতরের পূজার সামগ্রীও নষ্ট করা হয়েছে।

পাথর ভাঙার কাজে ব্যবহৃত বড় আকারের হাতুড়ি দিয়ে মন্দির ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ছবিঃ সংগৃহীত
গড়কাটি উত্তরপাড়া সার্বজনীন মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুব্রত রায় সুমন বলেন, সুদীপ্ত নিজের ভুল বুঝতে পেরে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পরে উত্তেজিত জনতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভ ও মাইকিং করে লোকজনকে একত্র করে হামলা চালায়।
তিনি বলেন, প্রথমে সুদীপ্তর বাড়িতে হামলা হয়। এরপর কালীমন্দির, দুর্গামন্দির ও নাটমন্দিরে ব্যাপক ভাঙচুর এবং লুটপাট চালানো হয়। মন্দিরে থাকা মূল্যবান সামগ্রীও নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
তাহিরপুর উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক গণেশ তালুকদার বলেন, গড়কাটি গ্রামের তিনটি ধর্মীয় স্থাপনা এবং বাদাঘাট বাজারের কালীমন্দির ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মন্দিরের প্রতিমা, আসবাবপত্র ও মূল্যবান সামগ্রী ভাঙচুর ও লুট করা হয়েছে। তিনি বলেন, প্রশাসন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলেও এখনো হামলাকারীদের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি।

প্রথমে সুদীপ্তর বাড়িতে হামলা হয়। ছবিঃ সংগৃহীত
স্থানীয় মুসলিম নেতারাও হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের তাহিরপুর উপজেলা সভাপতি মো. মুখলেছুর রহমান বলেন, বাজার কমিটির সদস্যদের সঙ্গে মিলে তারাও সুদীপ্তকে জনতার সামনে না এনে গোপনে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিলেন, কারণ প্রকাশ্যে দিলে তার প্রাণহানির আশঙ্কা ছিল।
তিনি বলেন, গড়কাটি গ্রামে যে ভাঙচুর হয়েছে, সেটি সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত এবং ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও গ্রহণযোগ্য নয়। এলাকার সম্প্রীতি নষ্ট করার মতো এমন ঘটনার কোনো সমর্থন তারা দেন না।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গড়কাটি এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য পরিচিত। মেঘালয় সীমান্তের যাদুকাটা নদীর তীরে অবস্থিত এই এলাকায় একদিকে রয়েছে অদ্বৈত আচার্য মহাপ্রভুর আশ্রম, অন্যদিকে রয়েছে হযরত শাহ আরেফিন (র.)-এর মাজার। প্রতি বছর চৈত্র মাসে হিন্দুদের বারুণী স্নান এবং শাহ আরেফিনের ওরস একই সময়ে অনুষ্ঠিত হয়। দুই ধর্মের মানুষ একসঙ্গে সেই আয়োজন সম্পন্ন করেন। তীর্থযাত্রীদের মুসলিম পরিবারের বাড়িতে আশ্রয় দেওয়া এবং তাদের জন্য পানির ব্যবস্থা করাও দীর্ঘদিনের প্রচলিত রীতি।

ভাঙচুরের শিকার পরিবারগুলোতে এখনও রয়েছে আতঙ্ক। ছবিঃ সংগৃহীত
এমন একটি এলাকায় এ ধরনের সহিংসতার ঘটনায় স্থানীয় মুসলিম ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ বিস্ময় ও হতাশা প্রকাশ করেছেন।
বাদাঘাট বাজার বণিক সমিতির সভাপতি নজরুল সিকদার বলেন, এই এলাকায় বহু বছর ধরে হিন্দু-মুসলমান শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করছেন। তিনি ও বাজারের ব্যবসায়ীরা পুলিশকে নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত হামলা ঠেকাতে পারেননি।
একই ধরনের মন্তব্য করেছেন তাহিরপুর উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক গণেশ তালুকদার। তিনি বলেন, এই এলাকায় আগে কখনো এমন ঘটনা ঘটেনি। বাজার কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ অনেকেই হামলা ঠেকানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু উত্তেজিত জনতাকে থামানো সম্ভব হয়নি।
ঘটনার পর এলাকায় যান স্থানীয় সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তির কাজের দায় পুরো একটি সম্প্রদায় বা কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপানো যায় না। তিনি বলেন, ইসলাম কখনো অন্য ধর্মের উপাসনালয় ভাঙার শিক্ষা দেয় না এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে সুদীপ্ত রায়ের বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করেছে পুলিশ। সেই মামলায় তিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। তার বাবা-মায়ের দাবি, এবার তার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গ্রেপ্তারের কারণে তিনি পরীক্ষায় বসতে পারেননি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে কেতকী রায় বলেন, তাদের ছেলের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে গেছে। লেখাপড়া করে সংসারের হাল ধরবে, এমন স্বপ্ন দেখেছিলেন তারা। কিন্তু এখন সেই স্বপ্ন ভেঙে গেছে।
অন্যদিকে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি এবং কাউকে গ্রেপ্তারও করা হয়নি। তাহিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফারুক আহমেদ জানিয়েছেন, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কেউ মামলা করেননি এবং কাউকে আটকও করা হয়নি।
ফলে একদিকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে সুদীপ্ত রায় কারাগারে থাকলেও, অন্যদিকে তার বাড়ি, মন্দির ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় এখনো কোনো দৃশ্যমান আইনি অগ্রগতি না হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে হতাশা ও উদ্বেগ বিরাজ করছে।
সূত্রঃ বিডি নিউজ ২৪
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au