মেলবোর্ন, ১৫ জুলাই- বিশ্ব অর্থনীতিতে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা ফিরে আসায় বাংলাদেশের অর্থনীতি নতুন গতি পাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন এইচএসবিসি-র প্রধান এশিয়া অর্থনীতিবিদ ফ্রেডেরিক নিউম্যান। তাঁর মতে, সাম্প্রতিক বৈশ্বিক সংকটগুলো সফলভাবে মোকাবিলা করে বাংলাদেশ এখন এমন এক অবস্থানে রয়েছে, যেখানে আন্তর্জাতিক চাহিদা বৃদ্ধি, জ্বালানির দাম কমে আসা এবং অভ্যন্তরীণ সংস্কারের ফলে দেশের রপ্তানি, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
দ্য ডেইলি স্টার-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ফ্রেডেরিক নিউম্যান বলেন, তিন মাস আগের তুলনায় বিশ্ব অর্থনীতির পরিস্থিতি এখন অনেক বেশি আশাব্যঞ্জক। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তাদের ব্যয় ধীরে ধীরে বাড়ছে, যা বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে।
তিনি বলেন, গত বছর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং দুর্বল আন্তর্জাতিক চাহিদার কারণে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কিছুটা চাপের মধ্যে ছিল। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি অনেক বেশি পূর্বানুমানযোগ্য। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম কমে যাওয়ায় বছরের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশের রপ্তানি আরও শক্তিশালী হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সম্প্রতি আয়োজিত এক অর্থনৈতিক পূর্বাভাস অনুষ্ঠানে এইচএসবিসি জানিয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ কমে আসা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংস্কারের ধারাবাহিকতা এই প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক হবে বলে প্রতিষ্ঠানটির পূর্বাভাস।
ফ্রেডেরিক নিউম্যান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত কমে যাওয়ায় ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের হাতে অতিরিক্ত অর্থ থাকবে। এর ফলে তাদের ভোগ ব্যয় বাড়বে এবং সেই বাড়তি চাহিদার সুফল বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা পাবেন।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, জ্বালানি খাতে ঝুঁকি কমলেও এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হতে পারে খাদ্য মূল্যস্ফীতি। এল নিনো-জনিত আবহাওয়ার কারণে ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের মতো বড় কৃষিপণ্য উৎপাদনকারী দেশে খাদ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে, যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়তে পারে। তবে দেশের কৃষি উৎপাদন স্থিতিশীল থাকলে এই ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশ ও চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সম্পর্কের প্রসঙ্গেও ইতিবাচক মন্তব্য করেন এইচএসবিসির এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার পর বাংলাদেশ আবার আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে যে দেশটি বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত। বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সৌরবিদ্যুৎ, অবকাঠামো ও শিল্প খাতে চীনের প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ বাংলাদেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ যেন কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থল হিসেবে নিজেদের কৌশলগত অবস্থান কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব আরও বিস্তৃত করা উচিত।
বাংলাদেশের অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতার ভূয়সী প্রশংসা করে ফ্রেডেরিক নিউম্যান বলেন, কোভিড-১৯ মহামারি, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের মতো বড় বড় চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনীতি ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অন্যতম বড় শক্তি।
তবে তিনি বলেন, এই সাফল্য ধরে রাখতে হলে এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে অবকাঠামো উন্নয়নে। তাঁর ভাষায়, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হলো অবকাঠামো, অবকাঠামো এবং অবকাঠামো। সড়ক, বন্দর, বিদ্যুৎ, নগর উন্নয়ন এবং পরিবহন ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
একই সঙ্গে তিনি রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, সরকারের আয় বাড়াতে পারলে উন্নয়ন প্রকল্পে আরও বেশি বিনিয়োগ করা সম্ভব হবে। এতে অর্থনীতি আরও দ্রুত এগিয়ে যাবে এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশকে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর কিংবা শ্রীলঙ্কার সঙ্গে তুলনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসব দেশের ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা বাংলাদেশের তুলনায় ভিন্ন। প্রায় ১৭ কোটি মানুষের বিশাল বাজার নিয়ে বাংলাদেশ একেবারেই আলাদা ধরনের অর্থনীতি। তবে সঠিক পরিকল্পনা, ধারাবাহিক সংস্কার এবং উন্নয়নের প্রতি অবিচল মনোযোগ থাকলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশও উন্নত অর্থনীতির কাতারে পৌঁছাতে পারবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী এবং প্রযুক্তি গ্রহণের সক্ষমতা দেশটিকে এই খাতে এগিয়ে রাখবে। এআই শুধু কিছু প্রচলিত চাকরির পরিবর্তনই করবে না, বরং নতুন নতুন কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগও সৃষ্টি করবে। তবে এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রসঙ্গে ফ্রেডেরিক নিউম্যান বলেন, এলডিসি-পরবর্তী বাণিজ্য সুবিধা অব্যাহত থাকলে তা অবশ্যই ইতিবাচক হবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের সাফল্য নির্ভর করবে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংস্কার, সুশাসন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ওপর।
সাক্ষাৎকারের শেষদিকে তিনি বাংলাদেশের প্রতি এইচএসবিসি-র দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ওপর পূর্ণ আস্থা রাখে এবং ভবিষ্যতেও দেশের উন্নয়নের অংশীদার হয়ে থাকতে চায়। তাঁর ভাষায়, “আমরা বাংলাদেশে আছি, থাকব এবং বাংলাদেশের সাফল্যের অংশ হতে চাই।”