ঐতিহাসিক জয়ে ফাইনালে আর্জেন্টিনা।ছবি: সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৬ জুলাই- অবিশ্বাস্য এক প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখে বিশ্বকাপ ২০২৬-এর ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। আটলান্টায় অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় সেমিফাইনালে একসময় পিছিয়ে পড়েও শেষ মুহূর্তে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছে লিওনেল স্কালোনির দল। ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজতেই উল্লাসে ফেটে পড়েন আর্জেন্টিনার ফুটবলার ও সমর্থকেরা। অন্যদিকে, ১৯৬৬ সালের পর আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার স্বপ্নভঙ্গের বেদনা নিয়েই মাঠ ছাড়তে হয় ইংল্যান্ডকে।
আগামী ১৯ জুলাই বিশ্বকাপের শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে স্পেনের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা। অন্যদিকে ইংল্যান্ডকে খেলতে হবে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ।
পুরো ম্যাচজুড়েই ছিল উত্তেজনা, শারীরিক লড়াই এবং নাটকীয়তার ছাপ। প্রথমার্ধে দুই দলই রক্ষণাত্মক ও সতর্ক ফুটবল খেলায় গোলের কোনো দেখা মেলেনি। লিওনেল মেসি কিংবা হ্যারি কেইন, কেউই প্রতিপক্ষের গোলরক্ষককে বড় কোনো পরীক্ষায় ফেলতে পারেননি। প্রথম ৪৫ মিনিটে দুই দলের কেউই লক্ষ্যে একটি শটও রাখতে পারেনি।
প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা ৫৮ শতাংশ সময় বলের দখল ধরে রাখলেও ইংল্যান্ডের সংগঠিত রক্ষণ ভাঙতে ব্যর্থ হয়। ম্যাচে ফাউলের সংখ্যাও ছিল উল্লেখযোগ্য। প্রথমার্ধেই দুই দল মিলে ১৯টি ফাউল করে। আর্জেন্টিনা করে ১২টি এবং ইংল্যান্ড ৭টি। রেফারি সংযত থেকে মাত্র দুটি হলুদ কার্ড দেখান।
বিরতির পর ম্যাচের চিত্র পাল্টে যায়। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই মেসি ও হুলিয়ান আলভারেসের দারুণ বোঝাপড়ায় আর্জেন্টিনা গোলের সুযোগ তৈরি করলেও ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ড অসাধারণ সেভ করে দলকে রক্ষা করেন।
এরপর ৫৫ মিনিটে পাল্টা আক্রমণ থেকে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড। ডান প্রান্ত দিয়ে তৈরি হওয়া আক্রমণে দুর্দান্ত একটি ক্রস থেকে অ্যান্থনি গর্ডন ব্যাকপোস্টে সুযোগ কাজে লাগিয়ে এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে পরাস্ত করেন। তার গোলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড এবং ৬০ বছর পর বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে থ্রি লায়ন্সরা।
গোল হজমের পর আক্রমণের তীব্রতা বাড়ায় আর্জেন্টিনা। ৬৪ মিনিটে বদলি হিসেবে মাঠে নেমেই ম্যাচে প্রভাব ফেলেন নিকোলাস গঞ্জালেজ। ৬৯ মিনিটে মেসির দারুণ ক্রস থেকে তার শক্তিশালী হেড অবিশ্বাস্য দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন পিকফোর্ড।
৭২ মিনিটে একসঙ্গে তিনটি পরিবর্তন আনেন কোচ লিওনেল স্কালোনি। রদ্রিগো ডি পল, গঞ্জালো মন্তিয়েল ও নিকোলাস ওতামেন্দিকে মাঠে নামিয়ে ম্যাচের গতি বদলে দেন তিনি।
এরপর একের পর এক আক্রমণে ইংল্যান্ডকে চাপে রাখে আর্জেন্টিনা। ৭৬ মিনিটে ডি পলের ক্রস থেকে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের হেড গোলপোস্টে লেগে ফিরে আসে। কয়েক মিনিট পর গঞ্জালেজের আরেকটি হেড অল্পের জন্য বাইরে চলে যায়।
ম্যাচের ৮৫ মিনিটে আসে কাঙ্ক্ষিত সমতা। কর্নার থেকে মেসির বাড়ানো বল পেয়ে প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে দুর্দান্ত শটে জর্ডান পিকফোর্ডকে পরাস্ত করেন এনজো ফার্নান্দেজ। তার দুর্দান্ত গোলে ১-১ সমতায় ফেরে আর্জেন্টিনা।
সমতায় ফেরার পরও আক্রমণ থামায়নি আলবিসেলেস্তেরা। যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে আবারও বাজিমাত করে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। দ্রুতগতির আক্রমণ থেকে বল পেয়ে লাউতারো মার্তিনেজ নির্ভুল ফিনিশিংয়ে ইংল্যান্ডের জালে বল জড়িয়ে দেন। ৯২ মিনিটে করা সেই গোলেই ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা।
শেষ কয়েক মিনিটে সমতায় ফেরার মরিয়া চেষ্টা চালায় ইংল্যান্ড। তবে আর্জেন্টিনার দৃঢ় রক্ষণভাগ এবং গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজের আত্মবিশ্বাসী পারফরম্যান্সে আর কোনো সুযোগ তৈরি করতে পারেনি গ্যারেথ সাউথগেটের দল।
নকআউট পর্বজুড়েই কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা। কেপ ভার্দে, মিশর ও সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে কঠিন লড়াইয়ের পর এবার সেমিফাইনালেও পিছিয়ে পড়েছিল তারা। তবে প্রতিবারের মতোই দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে জয় ছিনিয়ে নিয়ে আবারও প্রমাণ করেছে কেন তারা বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।
এবার তাদের সামনে আর মাত্র একটি বাধা। ১৯ জুলাই স্পেনকে হারাতে পারলেই টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের শিরোপা জয়ের ইতিহাস গড়বে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা।