মতিঝিল মেট্রোস্টেশনের নিচে বোমা বিস্ফোরণ, উদ্ধার আরও একটি অবিস্ফোরিত বোমা
মেলবোর্ন, ২৫ জুলাই: রাজধানীর মতিঝিল শাপলা চত্বর এলাকায় মেট্রোরেল স্টেশনের নিচের সড়কে পেট্রল বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে আরও একটি অবিস্ফোরিত বোমা…
মেলবোর্ন, ২৫ জুলাই: চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ তিন পার্বত্য জেলায় সাম্প্রতিক বন্যায় প্রাণিসম্পদ খাতে মোট ৭৭ কোটি ১৫ লাখ ২ হাজার ২৪০ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ভয়াবহ এ বন্যায় মারা গেছে ১ লাখ ৬১ হাজার ৩৯৪টি পশু ও হাঁস-মুরগি। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার ৬৪২টি গবাদিপশু এবং ১০ হাজার ৯৯১টি খামার।
গ্রামের মানুষের কাছে গবাদিপশু শুধু সম্পদ নয়, অনেক সময় এটি পরিবারের শেষ ভরসা। সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, ঘরের প্রয়োজন কিংবা হঠাৎ কোনো বিপদে এই পশু বিক্রি করেই অনেক পরিবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু এবারের ভয়াবহ বন্যায় সেই শেষ সম্বলও কেড়ে নিয়েছে প্রকৃতি। কারও গোয়ালঘর ভেসে গেছে, কারও মারা গেছে আদরের গরু-ছাগল, আবার কারও হাঁস-মুরগির খামার মুহূর্তেই পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে।
বন্যার পানি নেমে গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জীবনে রয়ে গেছে দুর্ভোগ। বহু খামারি নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চিন্তায় দিশেহারা। আয়-রোজগারের একমাত্র অবলম্বন হারিয়ে অনেক পরিবার এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সাম্প্রতিক বন্যায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ তিন পার্বত্য জেলায় প্রাণিসম্পদ খাতে মোট ৭৭ কোটি ১৫ লাখ ২ হাজার ২৪০ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ বন্যায় মারা গেছে ১ লাখ ৬১ হাজার ৩৯৪টি পশু ও হাঁস-মুরগি। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার ৬৪২টি গবাদিপশু এবং ১০ হাজার ৯৯১টি খামার।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলার ৪৫টি উপজেলার ১৯১টি ইউনিয়নে এ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে শুধু চট্টগ্রাম জেলায় ক্ষতির পরিমাণ ৬০ কোটি ৬ লাখ ৮১ হাজার ১৪০ টাকা।

এছাড়া কক্সবাজারে ১৩ কোটি ৫৩ লাখ ৯১ হাজার ১১০ টাকা, বান্দরবানে ১৭ লাখ ৪৭ হাজার টাকা, রাঙামাটিতে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮২ হাজার টাকা এবং খাগড়াছড়িতে ৩৭ লাখ ১ হাজার টাকা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন ছোট ও মাঝারি খামারিরা। বিভাগজুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১০ হাজার ৯৯১টি গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির খামার। এর মধ্যে গবাদিপশুর ৪ হাজার ৭৫৬টি খামারে ১৭ কোটি ৫৫ লাখ ৭২ হাজার টাকা এবং হাঁস-মুরগির ৬ হাজার ২৩৫টি খামারে ১৯ কোটি ৭২ লাখ ৯৬ হাজার ৫০০ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
এছাড়া বন্যায় নষ্ট হয়েছে ৯১০ টন দানাদার খাবার, যার ক্ষতি ৫ কোটি ১৭ লাখ ৯২ হাজার টাকা। ১৪ হাজার ২৬৫ টন খড়ের ক্ষতি হয়েছে ২১ কোটি ৫৬ লাখ ৮৫ হাজার টাকা এবং ৯ হাজার ১২৯ টন ঘাসের ক্ষতি হয়েছে ৮ কোটি ২৬ লাখ ১৪ হাজার টাকা। মৃত গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগিতে ক্ষতির পরিমাণ ৪ কোটি ৮৫ লাখ ৪২ হাজার ৭৪০ টাকা। চট্টগ্রাম জেলার ১৫ উপজেলায় ১০৮টি ইউনিয়নে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪ হাজার ২১৮টি পশুর খামার। এতে ক্ষতি হয়েছে ১২ কোটি ৬৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা। এছাড়া ৫ হাজার ৬৭৪টি হাঁস-মুরগির খামারে ১৭ কোটি ২ লাখ ২০ হাজার টাকা, ১৬২ টন খাবারে ৯২ লাখ ২০ হাজার টাকা, ৬ হাজার ৯৬০ টন ঘাসে ৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা এবং মৃত গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগিতে ৩ কোটি ৮৬ লাখ ৭৬ হাজার ১৪০ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

বন্যায় চট্টগ্রামে ১ হাজার ১ একর, কক্সবাজারে ৭ হাজার ৮৪০ একর, বান্দরবানে ৫১০ একর এবং রাঙামাটিতে ১ হাজার ১২৯ একর চারণভূমি প্লাবিত হয়েছে।
এতে মারা গেছে ৭১টি গরু, ১৬৫টি ছাগল, ৫০টি ভেড়া, ১ লাখ ৫৮ হাজার ৬০০টি মুরগি এবং ২ হাজার ৫০৮টি হাঁস। এর মধ্যে শুধু চট্টগ্রাম জেলায় মারা গেছে ৩৯টি গরু, ৯৫টি ছাগল, ৪২টি ভেড়া, ১ লাখ ৪২ হাজার ১৩৭টি মুরগি এবং ১ হাজার ৩০০টি হাঁস। এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৪ কোটি ৮৫ লাখ ৪২ হাজার ৭৪০ টাকা। এদিকে বন্যায় পাঁচ জেলায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৩৯০টি গরু, ৪ হাজার ৭৫৫টি মহিষ, ১ লাখ ৬০ হাজার ৮৭টি ভেড়া, ২৮ লাখ ৪৫ হাজার ৮২৮টি মুরগি এবং ৭০ হাজার ৩৭০টি হাঁস অসুস্থ হয়েছে। এ পর্যন্ত ১১ হাজার ৮৯৭টি পশু এবং ৮৪ হাজার ৬৫০টি হাঁস-মুরগিকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১০ হাজার ৬৮৯টি পশু এবং ১৯ হাজার ২৭টি হাঁস-মুরগিকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে।বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রামের ৩টি, কক্সবাজারের ১টি এবং বান্দরবানের ৪টি প্রাণিসম্পদ কার্যালয়।
বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা শেলী আক্তারের কণ্ঠে ফুটে উঠেছে বন্যার নির্মম চিত্র। স্থানীয় ভাষায় তিনি বলেন, ‘চোখত ঘুম নাই, পেডত ভাত নাই। বন্যার পানি হ-ত্তে নামিব, ন জানি। এরহম দুদ্দশাত ক্যা-নে পড়িলাম। আরেক্কান ঘর তুলিবার টিঁয়াও নাই।’৬ সন্তান নিয়ে এখনো পানিবন্দি ঘরের ভেতর কোনোমতে দিন কাটাচ্ছেন শেলী। মাটির ঘরের মেঝে এখনো পানির নিচে। প্লাস্টিকের ঝুড়ি ও কাঠের তক্তা জোড়া দিয়ে তৈরি উঁচু মাচায় বসেই কাটছে তার দিন-রাত।
বাঁশখালীর বাসিন্দা মো. রফিক আহমেদ বলেন, ‘৩৩ বছরের পুরোনো মাটির ঘরটি এক রাতেই ধসে পড়ে। তিলে তিলে গড়া ঘরটা এক রাতেই শেষ হয়ে গেল। এখন আবার নতুন করে কীভাবে শুরু করব, বুঝতে পারছি না।’পশ্চিম বাঁশখালী উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দা জসিম বলেন, ‘বন্যার পানিতে আমার গরু ও হাঁস-মুরগি মারা গেছে। এগুলোই ছিল আমাদের পরিবারের বড় ভরসা। অনেক কষ্ট করে পশুগুলো পালন করেছিলাম। এখন সব হারিয়ে কীভাবে আবার শুরু করব, বুঝতে পারছি না।’
বাঁশখালীর পুইছড়ি এলাকার বাসিন্দা লায়লা বেগম বলেন, ‘ঘরে থাকা হাঁস-মুরগিগুলো চোখের সামনে পানিতে ডুবে মারা গেছে। এগুলো বিক্রি করে সংসারের অনেক প্রয়োজন মেটাতাম। বন্যা আমাদের শুধু ঘরবাড়ি নয়, জীবিকার শেষ আশ্রয়টুকুও কেড়ে নিয়েছে।’চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের উপ-পরিচালক (ভেটেরিনারি পাবলিক হেলথ) ডা. মুহাম্মদ ইজমাল হাসান কালবেলাকে বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী প্রাণিসম্পদ খাতে ৭৭ কোটি ১৫ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতির হিসাব পাওয়া গেছে।’
প্রাণিসম্পদের পাশাপাশি বন্যায় চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকায় মানুষের স্বাভাবিক জীবনও বিপর্যস্ত হয়েছে। বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, ফটিকছড়ি ও হাটহাজারীর অনেক এলাকায় ঘরবাড়ি, খাদ্যশস্য, রাস্তাঘাট ও পানির উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক এলাকার নলকূপ এখনো পানির নিচে থাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে।
দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সাত জেলায় বন্যায় এ পর্যন্ত ৫৮ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১২ লাখের বেশি মানুষ। দুর্গত এলাকায় ত্রাণ কার্যক্রম চললেও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানো।
বন্যার পানি সরে গেছে, কিন্তু খালি গোয়ালঘর, নষ্ট খামার আর হারানো জীবিকার ক্ষত এখনো রয়ে গেছে। যে পশু-পাখি ছিল হাজারো পরিবারের বিপদের দিনের ভরসা, সেই আশ্রয়টুকুই কেড়ে নিয়েছে এবারের বন্যা। এখন তাদের অপেক্ষা পুনর্বাসন ও নতুন করে বাঁচার সুযোগের।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au