অবসরের দুদিন আগে বাসা থেকে পুলিশ কর্মকর্তা মনোজ কান্তি দাসের মরদেহ উদ্ধার
মেলবোর্ন, ৩১ জুলাই: অবসরে যাওয়ার মাত্র দুই দিন আগে সিলেট নগরীর নিজ বাসা থেকে পুলিশের এক কর্মকর্তার মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার (২৮ জুলাই, ২০২৬)…
মেলবোর্ন, ৩০ জুলাই: ভারতের গণমাধ্যম-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের যেকোনো সম্পর্ক অবশ্যই ১৯৭১ সালের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ এবং পাকিস্তানি বাহিনীর সংঘটিত গণহত্যার সত্যকে ভিত্তি করেই গড়ে উঠতে হবে। তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং দেশের রাষ্ট্রীয় চরিত্র, গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
সৌরভ শর্মাকে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ এখন শুধু সরকার পরিবর্তনের সংকটের মধ্যে নেই, বরং রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্র বদলে দেওয়ার একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তার সরকারের সময়ে বাংলাদেশ ছিল ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, উন্নয়নমুখী ও নিরাপদ রাষ্ট্র। কিন্তু বর্তমানে দেশে ভয়, সহিংসতা, প্রতিশোধের রাজনীতি, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং উগ্রবাদের বিস্তার ঘটছে। তিনি এসব পরিস্থিতির জন্য সাবেক প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনীতিকে দায়ী করেন।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, প্রতিটি দেশের নিজস্ব কূটনৈতিক অগ্রাধিকার নির্ধারণের অধিকার রয়েছে। তবে সেই অগ্রাধিকার ইতিহাস, ভৌগোলিক বাস্তবতা, জাতীয় স্বার্থ এবং জনগণের কল্যাণের ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত। তার মতে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কখনোই প্রতিবেশী দেশ, বিশেষ করে ঐতিহাসিক বন্ধু ভারতের কাছে ভুল বার্তা দেওয়া উচিত নয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কেবল দুই সরকারের সম্পর্ক নয়; এটি মুক্তিযুদ্ধ, রক্তের ঋণ, ভৌগোলিক বাস্তবতা, নিরাপত্তা এবং দুই দেশের জনগণের দীর্ঘদিনের বন্ধনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। একই সঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশকে চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ সব বন্ধুরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। তবে ভারসাম্য মানে ইতিহাস ভুলে যাওয়া নয় কিংবা পরীক্ষিত বন্ধুর সঙ্গে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করা নয়।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকারের নীতি ছিল “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়”। উন্নয়নে বিদেশি অংশীদারদের সম্পৃক্ততায় তার আপত্তি নেই, তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা, জনগণের স্বার্থের সুরক্ষা এবং বাংলাদেশের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকা জরুরি। তিনি বলেন, উন্নয়ন প্রয়োজন, কিন্তু রাজনৈতিক নির্ভরশীলতাকে প্রকৃত উন্নয়ন বলা যায় না। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, ভারত তাকে এবং তার পরিবারকে সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছে এবং ১৯৭১ সালের মতো কঠিন সময়েও ভারতের জনগণ ও সরকার বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হয়েছে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও ধ্বংসযজ্ঞ মানুষ ভুলে যায়নি। তাই পাকিস্তানের সঙ্গে যেকোনো সম্পর্ক ইতিহাসের সত্যের ভিত্তিতে হতে হবে। তবে বর্তমানে স্বাভাবিক কূটনীতির আড়ালে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা দুর্বল করা, পাকিস্তানপন্থী শক্তিকে পুনর্বাসন, সামরিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে পাকিস্তানের প্রভাব বৃদ্ধি এবং তরুণদের পাকিস্তানি প্রতিষ্ঠানের দিকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা চলছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তার মতে, এটি একটি বিপজ্জনক রাজনৈতিক বার্তা বহন করে।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের নিরাপত্তা, সংযোগ এবং সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকারের সময়ে গঙ্গা পানি চুক্তি, স্থলসীমান্ত চুক্তি, সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তি, আঞ্চলিক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা, শরণার্থী প্রত্যাবাসন এবং সন্ত্রাসবাদ দমনসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার এবং বর্তমান সরকারের সময় এ ধরনের উল্লেখযোগ্য কোনো চুক্তি হয়নি বলে তিনি দাবি করেন। তার মতে, বাংলাদেশে উগ্রবাদ বৃদ্ধি, সংখ্যালঘুদের মধ্যে ভীতি এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ভারতবিরোধী রাজনীতি জোরদার হলে দুই দেশের অর্জিত সম্পর্ক চাপের মুখে পড়বে।
নিজের বক্তব্য ও সাক্ষাৎকার প্রচারে বাধার অভিযোগ তুলে শেখ হাসিনা বলেন, শুধু তার কণ্ঠ নয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি ও প্রগতিশীল মূল্যবোধের পক্ষের মানুষদেরও জনপরিসর থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তার অভিযোগ, শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী এবং অভিনেত্রীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হচ্ছে কিংবা উগ্রবাদী গোষ্ঠীর হামলার শিকার হতে হচ্ছে।
বাংলাদেশে ফেরার বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি আগেই ঘোষণা দিয়েছেন যে চলতি বছর দেশে ফিরবেন। তার দাবি, বাংলাদেশ ভালো নেই এবং জনগণ কষ্টে আছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখলকারী অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরবর্তী বিএনপি সরকার দেশকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। দেশে আইনের শাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার নেই বলেও তিনি অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, জনগণ তাকে ফিরে আসতে চায় এবং তাদের পাশে দাঁড়ানো তার দায়িত্ব।
আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, প্রতিটি বড় রাজনৈতিক দলই কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যায়। তার মতে, আওয়ামী লীগ বর্তমানে আত্মশুদ্ধির একটি পর্যায়ের মধ্যে রয়েছে। যারা আদর্শের জন্য দলে ছিলেন, তারা আরও দৃঢ়ভাবে পাশে রয়েছেন। আর যারা ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য এসেছিলেন, তারা দল ছেড়ে যাচ্ছেন বা নীরব হয়ে পড়ছেন। তিনি বলেন, এতে দল দুর্বল হয়নি, বরং আরও শুদ্ধ হয়েছে। ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরলে নতুন কাউন্সিলের মাধ্যমে তরুণ, দেশপ্রেমিক এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী নেতৃত্বকে সামনে আনা হবে।
ভারতে অবস্থান প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ভারত তাকে সর্বোচ্চ সম্মান, মর্যাদা ও সহমর্মিতার সঙ্গে আশ্রয় দিয়েছে। তিনি নিয়মিত পরিবারের সদস্য, দলের নেতা-কর্মী এবং শুভানুধ্যায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তার মতে, বাংলাদেশের সংকটের সময়ে ভারত আবারও ১৯৭১ সালের মতো পাশে দাঁড়িয়েছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বা জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে তিনি সরাসরি কিছু বলতে চাননি। তবে তিনি বলেন, ভারত বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী এবং ঐতিহাসিক বন্ধু। ভারতীয় নীতিনির্ধারকেরা বাংলাদেশের পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা, ভারতের নিরাপত্তা ও বৃহত্তর আঞ্চলিক স্বার্থের পারস্পরিক সম্পর্ক তারা উপলব্ধি করেন।
ক্ষমতার শেষ সময়ে কোনো বিষয়ে ভিন্নভাবে কাজ করতেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকারের সময় সংবাদপত্র, টেলিভিশন, অনলাইন মাধ্যম, টকশো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিনই সরকার ও তাকে সমালোচনা করা হতো। তিনি দাবি করেন, তিনি সেই সমালোচনা শুনতেন এবং প্রয়োজন হলে সংশোধনও করতেন। শুধুমাত্র সরকারের সমালোচনা করার কারণে কাউকে রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, দুই দেশের জনগণের কল্যাণ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য স্থিতিশীল ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক অপরিহার্য। সীমান্ত নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ দমন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, যোগাযোগ, সমুদ্রসীমা ও স্থলসীমা নিষ্পত্তি এবং জনগণের পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতেই দুই দেশের বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সাক্ষাৎকারের শেষ অংশে শেখ হাসিনা বলেন, ২০২৪ সালের ঘটনাকে কেবল একটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট বা স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলন হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না। তার অভিযোগ, বাংলাদেশবিরোধী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী, উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক, বিএনপি-জামায়াত জোটের সংগঠিত অংশ এবং বিভিন্ন সুযোগসন্ধানী মহল শুরু থেকেই সক্রিয় ছিল। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রচারণা, অর্থায়ন, চাপ এবং ভূরাজনৈতিক স্বার্থও এতে ভূমিকা রেখেছে বলে তিনি দাবি করেন। তিনি বলেন, মুহাম্মদ ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রে ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের এক অনুষ্ঠানে আন্দোলনটিকে “অত্যন্ত পরিকল্পিত” এবং “একজন মাস্টারমাইন্ডের পরিচালিত” প্রক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। শেখ হাসিনার ভাষ্য অনুযায়ী, এ বক্তব্য থেকেই বোঝা যায় এটি স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলন ছিল না; বরং ২০২৪ সালের কোটা আন্দোলনকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়েছিল।
সুত্রঃ আউটলুক
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au