অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে চলচ্চিত্র অগ্রদূত হীরালাল সেনের জন্মভিটা। ছবি ঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২ আগস্ট : ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম চলচ্চিত্রকার হিসেবে স্বীকৃত হীরালাল সেনের মানিকগঞ্জের জন্মভিটা আজ অবহেলা ও অযত্নে ধ্বংসের মুখে। একসময় যেখানে চলচ্চিত্রের স্বপ্ন বোনা হয়েছিল, সেই ঐতিহাসিক স্থাপনার অবশিষ্টাংশ এখন বটগাছের শিকড় আর সময়ের ক্ষয়ে বিলীন হওয়ার অপেক্ষায়।
মানিকগঞ্জের বকজুড়ি গ্রামে অবস্থিত হীরালাল সেনের পৈতৃক বাড়ির ধ্বংসাবশেষ বর্তমানে প্রায় পুরোপুরি গাছপালায় ঢেকে গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন কোনো সংরক্ষণ উদ্যোগ না থাকায় ভবনটির দেয়াল ফেটে গেছে এবং কাঠামোর বড় অংশ বটগাছের শিকড়ের ওপর ভর করে টিকে আছে। স্থানীয় বকজুড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানান, বিদ্যালয়ের বর্তমান ভবন, খেলার মাঠ ও পাশের পুকুর একসময় হীরালাল সেনদের পারিবারিক সম্পত্তির অংশ ছিল। বিদ্যালয়ের একটি ভবনের নামও তাঁর নামে রাখা হয়েছে।
১৮৬৬ সালের ২ আগস্ট মানিকগঞ্জের বকজুড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন হীরালাল সেন। তাঁর বাবা চন্দ্রমোহন সেন ছিলেন একজন খ্যাতনামা আইনজীবী। পরে পরিবার কলকাতায় বসবাস শুরু করলেও শৈশব ও শিক্ষাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ কেটেছে বাংলাদেশেই।
চলচ্চিত্র ইতিহাসবিদদের মতে, হীরালাল সেনই ব্রিটিশ ভারতের প্রথম দেশীয় চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘রয়্যাল বায়োস্কোপ কোম্পানি’ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৯৮ সালে তিনি লন্ডন থেকে সিনেমাটোগ্রাফ ক্যামেরা এনে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেন।
১৮৯৮ থেকে ১৯১৩ সালের মধ্যে তিনি ৪০টিরও বেশি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, মঞ্চনাট্যের চিত্রায়ণ, তথ্যচিত্র এবং বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাণ করেন। তাঁর নির্মিত ‘আলিবাবা অ্যান্ড দ্য ফোর্টি থিভস’ (১৯০৩) উপমহাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।
শুধু চলচ্চিত্র নয়, বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাণেও তিনি ছিলেন পথিকৃৎ। জবাকুসুম হেয়ার অয়েল ও এডওয়ার্ডস টনিকের মতো পণ্যের জন্য তিনি বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাণ করেছিলেন, যা এ অঞ্চলের প্রথমদিকের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র উদ্যোগ হিসেবে পরিচিত। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাও তিনি ক্যামেরাবন্দি করেছিলেন। ইতিহাসবিদদের মতে, এ কারণে রাজনৈতিক ঘটনাবলির চিত্রায়ণেও তিনি ছিলেন অগ্রগামী।
তবে ব্যবসায়িক সংকটের কারণে ১৯১৩ সালে রয়্যাল বায়োস্কোপ কোম্পানির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে এক রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ডে তাঁর নির্মিত প্রায় সব চলচ্চিত্র ধ্বংস হয়ে যায়। ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ১৯১৭ সালে মাত্র ৫০ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। পরবর্তী সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম চলচ্চিত্রকারের স্বীকৃতি নিয়ে হীরালাল সেন ও দাদাসাহেব ফালকেকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হলেও ইতিহাসবিদরা মনে করেন, হীরালাল সেন প্রথম চলমান চিত্র ধারণকারী চলচ্চিত্রকার এবং দাদাসাহেব ফালকে প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র নির্মাতা। তাই চলচ্চিত্র ইতিহাসে দুজনের অবদানই স্বতন্ত্র ও অনন্য।
স্থানীয়দের দাবি, দেশের চলচ্চিত্র ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই স্মৃতি বিজড়িত স্থাপনাটি সংরক্ষণে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এই নিদর্শন একসময় পুরোপুরি বিলীন হয়ে যেতে পারে।