মহাকাশে মাস্কের একক দাপট, উৎক্ষেপণের সুযোগ হারিয়ে বিপাকে অন্য সংস্থাগুলো। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৬ আগষ্ট: বাণিজ্যিক মহাকাশ উৎক্ষেপণে দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্য ধরে রাখা স্পেস এক্স এখন নিজেদের স্টারলিংক স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠাতে ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল বিভিন্ন কোম্পানি উৎক্ষেপণের সুযোগ পেতে সমস্যায় পড়ছে। এমনকি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে নতুন ফ্যালকন ৯ মিশনের জন্য ২০২৮ কিংবা ২০২৯ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।
জ্যোতির্বিজ্ঞানী জোনাথন ম্যাকডোওয়েলের সংগৃহীত উৎক্ষেপণ তথ্য বিশ্লেষণ করে রয়টার্স জানিয়েছে, ২০২০ সালে স্পেসএক্সের ফ্যালকন ৯ মিশনের প্রায় ৫৪ শতাংশ ছিল স্টারলিংকের জন্য। চলতি ২০২৬ সালে সেই হার বেড়ে প্রায় ৭৯ শতাংশে পৌঁছেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অন্তত সাতটি মহাকাশযান প্রতিষ্ঠানকে জানানো হয়েছে, ২০২৮ বা ২০২৯ সাল পর্যন্ত ফ্যালকন ৯-এর নতুন মিশনের জায়গা কার্যত পূর্ণ হয়ে গেছে।
এই সংকটের অন্যতম কারণ স্পেসএক্সের পরবর্তী প্রজন্মের রকেট স্টারশিপে রূপান্তরের পরিকল্পনা। সম্পূর্ণ পুনর্ব্যবহার যোগ্য করে তৈরি স্টারশিপের মাধ্যমে ভবিষ্যতে ফ্যালকন ৯-এর তুলনায় আরও কম খরচে মহাকাশ অভিযান পরিচালনার লক্ষ্য রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। তবে বাইরের গ্রাহকের স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের পরিবর্তে নিজেদের স্টারলিংক স্যাটেলাইট পাঠানো স্পেসএক্সের জন্য অর্থনৈতিকভাবে বেশি লাভজনক হতে পারে। বিশ্লেষকদের হিসাবে, একটি স্টারশিপ মিশনে বাণিজ্যিক গ্রাহকের পেলোড বহনের তুলনায় নিজেদের স্টারলিংক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করলে কয়েক কোটি ডলার পর্যন্ত বেশি রাজস্ব তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।
মহাকাশ শিল্প গবেষণা প্রতিষ্ঠান র্যাশনাল ফিউচার্সের প্রধান অর্থনীতিবিদ এবং নাসার সাবেক কর্মকর্তা আখিল রাওয়ের মতে, স্পেসএক্সের সবচেয়ে মূল্যবান সীমিত সম্পদ এখন তাদের নিজস্ব উৎক্ষেপণ সক্ষমতা। বাইরের প্রতিষ্ঠানের স্যাটেলাইট বহনে সেই সক্ষমতা ব্যবহার করলে নিজেদের স্যাটেলাইট পাঠিয়ে সম্ভাব্য যে মুনাফা অর্জন করা যেত, সেটিই ছেড়ে দিতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে।
স্পেসএক্সের আয়ের বড় উৎসও হয়ে উঠেছে স্টারলিংক। ২০২৫ সালে এই স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবসা থেকে প্রায় ১১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব এসেছে। বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটির মহাকাশ ও রকেট উৎক্ষেপণ ব্যবসার রাজস্ব ছিল প্রায় ৪ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। ভবিষ্যতে স্টারশিপ ব্যবহার করে স্টারলিংক নেটওয়ার্ক আরও বড় করার পাশাপাশি মহাকাশে সৌরবিদ্যুৎচালিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ডেটা সেন্টার তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে স্পেসএক্সের। এ উদ্দেশ্যে দীর্ঘমেয়াদে বিপুলসংখ্যক স্যাটেলাইট কক্ষপথে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
একই সঙ্গে নাসার চন্দ্র অভিযানের জন্য স্টারশিপকে ল্যান্ডার হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য মহাকাশে জ্বালানি স্থানান্তরসহ একাধিক পরীক্ষা ও মিশন পরিচালনার প্রয়োজন হবে। ফলে স্টারশিপ বাণিজ্যিক ভাবে পুরোদমে চালু হলেও প্রথম কয়েক বছরে বাইরের গ্রাহকদের জন্য পর্যাপ্ত উৎক্ষেপণ সক্ষমতা পাওয়া কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে ফ্যালকন ৯-এ উৎক্ষেপণের খরচও বেড়েছে। ২০১৩ সালে একটি উৎক্ষেপণের মূল্য প্রায় ৫৪ মিলিয়ন ডলার থাকলেও বর্তমানে তা প্রায় ৭৪ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
স্পেসএক্সের বিকল্প হয়ে ওঠার চেষ্টা করা অন্য প্রতিষ্ঠান গুলোরও নিজস্ব চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ব্লু অরিজিনের নিউ গ্লেন এবং ইউনাইটেড লঞ্চ অ্যালায়েন্সের ভালকান রকেট প্রযুক্তিগত সমস্যায় পড়েছে। অন্যদিকে রকেট ল্যাব নিজেদের নতুন পুনর্ব্যবহার যোগ্য নিউট্রন রকেট তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, পর্যাপ্ত বিকল্প উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা দ্রুত তৈরি না হলে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে পারে ছোট মহাকাশ প্রতিষ্ঠান ও স্টার্টআপগুলো। নিজস্ব রকেট না থাকায় তাদের স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠানোর খরচ যেমন বাড়তে পারে, তেমনি দীর্ঘ সময় অপেক্ষাও করতে হতে পারে।
এ অবস্থায় নিজেদের স্যাটেলাইট, স্টারলিংক নেটওয়ার্ক এবং ভবিষ্যতের এআই অবকাঠামোকে অগ্রাধিকার দিয়ে স্পেসএক্স এগিয়ে গেলে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক মহাকাশ উৎক্ষেপণের বাজারে প্রতিষ্ঠানটির প্রভাব আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সুত্রঃ রয়টার্স