২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি, না দিলে হিন্দু প্রধান শিক্ষককে সপরিবারে পুড়িয়ে হত্যার হুমকি
পিরোজপুরের নাজিরপুরে এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হিন্দু প্রধান শিক্ষকের কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা না দিলে তাকে ও তার…
বাংলাদেশ পুলিশে নতুন করে ৪ হাজার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) নিয়োগ ও পদোন্নতির প্রক্রিয়া নিয়ে বাহিনীর ভেতরে অসন্তোষ ও নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেছেন পুলিশের কয়েকজন সদস্য। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করা বিপুলসংখ্যক কনস্টেবলের পদোন্নতির সুযোগের পাশাপাশি সরাসরি এএসআই নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও অর্থের বিনিময়ে পদ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
তবে প্রকাশ্য সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ৪ হাজার এএসআই পদ পূরণের ক্ষেত্রে অর্ধেক সরাসরি নিয়োগ এবং অর্ধেক পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তৎকালীন পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম জানিয়েছিলেন, ৪ হাজার এএসআইয়ের মধ্যে ২ হাজার সরাসরি এবং ২ হাজার পদোন্নতির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হবে।
এর আগে পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে মোট ৮ হাজার নতুন এএসআই পদ সৃষ্টির প্রস্তাব করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট নথি ও সরকারি প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, এর মধ্যে ৪ হাজার পদ সরাসরি নিয়োগ এবং ৪ হাজার পদ বিভাগীয় পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। প্রস্তাবিত পদগুলোর মধ্যে নারী এএসআইয়ের জন্যও পদ রাখার কথা বলা হয়।
এএসআই নিয়োগের এই উদ্যোগকে ঘিরেই এখন পুলিশের ভেতরে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা চলছে। অভিযোগকারীদের কেউ কেউ বলছেন, বহু বছর ধরে কনস্টেবল হিসেবে কাজ করা পুলিশ সদস্যদের একটি অংশ বিভাগীয় পরীক্ষার মাধ্যমে এএসআই হওয়ার অপেক্ষায় থাকেন। তাঁদের আশঙ্কা, সরাসরি নিয়োগের কারণে নিজেদের পদোন্নতির সুযোগ ও ক্যারিয়ার পরিকল্পনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বাংলাদেশ পুলিশের মাঠপর্যায়ের সবচেয়ে বড় জনবল কাঠামোর একটি হলো কনস্টেবল পদ। প্রচলিত ব্যবস্থায় অভিজ্ঞতা, দায়িত্ব পালনের রেকর্ড, শৃঙ্খলা, দক্ষতা ও বিভাগীয় পরীক্ষার মাধ্যমে কনস্টেবল ও অন্যান্য নিম্নপদস্থ সদস্যদের ওপরের পদে পদোন্নতির সুযোগ রয়েছে। এএসআই পদে পদোন্নতি পাওয়ার পর যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে অনেকে পরবর্তী সময়ে উপপরিদর্শক (এসআই), পরিদর্শক এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
সরাসরি এএসআই নিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের এই কাঠামোয় পরিবর্তন এসেছে বলে অভিযোগকারীরা মনে করছেন। তাঁদের বক্তব্য, নতুন পদ সৃষ্টির প্রয়োজন থাকলেও একই সঙ্গে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের পদোন্নতির সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে সরাসরি নিয়োগের যুক্তি হিসেবে পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সিনিয়র সচিব মো. মোখলেস উর রহমান জানিয়েছিলেন, নির্বাচনের আগে পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীতে প্রয়োজনীয় নিয়োগ সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আইজিপি বাহারুল আলমও বলেছিলেন, ৪ হাজার এএসআইয়ের অর্ধেক সরাসরি এবং অর্ধেক পদোন্নতির মাধ্যমে নিয়োগ হবে।
অন্যদিকে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর কিছু অভিযোগও সামনে এসেছে। পুলিশের কয়েকটি সূত্রের দাবি, লিখিত পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর কিছু প্রার্থীর কাছ থেকে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সুপারদের ফলাফল-সংক্রান্ত কাগজে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে, যদিও তখনও লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়নি। একই সঙ্গে পরবর্তী লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার কার্যক্রম পুলিশ সদর দপ্তরের মাধ্যমে পরিচালনার কথা প্রার্থীদের জানানো হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে নিশ্চিত প্রমাণ প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত সরকারি সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকেও এসব অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে কোনো নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা বা তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের তথ্য পাওয়া যায়নি।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে অর্থের বিনিময়ে এএসআই পদে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে। অভিযোগকারীদের দাবি, কোনো কোনো প্রার্থীর কাছ থেকে একটি পদ নিশ্চিত করার বিনিময়ে ১৫ থেকে ১৮ লাখ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে। কয়েকটি সূত্রে এই অর্থের পরিমাণ ১৬ থেকে ১৮ লাখ টাকা বলেও দাবি করা হয়েছে।
তবে অর্থের বিনিময়ে নিয়োগের অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো আদালতস্বীকৃত প্রমাণ বা সরকারি তদন্তের ফলাফল প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে বিষয়টিকে আপাতত অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
অভিযোগকারীদের হিসাব অনুযায়ী, ৪ হাজার প্রার্থীর প্রত্যেকের কাছ থেকে ১৫ থেকে ১৮ লাখ টাকা নেওয়া হলে মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ৬০০ থেকে ৭২০ কোটি টাকা। তবে এই হিসাব সম্পূর্ণ অভিযোগনির্ভর এবং বাস্তবে এমন কোনো অর্থ লেনদেন হয়েছে কি না, তার কোনো নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এ কারণে নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপের নথি প্রকাশ, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ এবং নিয়োগ বোর্ডের কার্যক্রমের রেকর্ড সংরক্ষণের দাবি উঠেছে। অভিযোগকারীদের কেউ কেউ পুরো প্রক্রিয়াটি স্বাধীনভাবে তদন্তেরও দাবি জানিয়েছেন।
পুলিশের নিয়োগ ব্যবস্থায় এ ধরনের অভিযোগ নতুন নয়। তবে এএসআই পদে সরাসরি নিয়োগের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে, কারণ ঐতিহ্যগতভাবে পুলিশ বাহিনীর নিচের পদগুলো থেকে অভিজ্ঞ সদস্যদের পদোন্নতির মাধ্যমে ওপরের পদে যাওয়ার একটি কাঠামো রয়েছে।
২০২৫ সালে পুলিশে ৪ হাজার এএসআই যুক্ত করার সিদ্ধান্তের কথা প্রকাশ্যে আসার পরই বিষয়টি নিয়ে পুলিশ সদস্যদের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষের খবর প্রকাশিত হয়েছিল। একটি প্রতিবেদনে পুলিশ সদস্যদের প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে সরাসরি এএসআই নিয়োগ বন্ধ করে কর্মরত সদস্যদের পদোন্নতির সুযোগ বাড়ানোর দাবি তোলার কথাও উল্লেখ করা হয়।
এদিকে নতুন এএসআই পদ সৃষ্টির পেছনে পুলিশের জনবল সংকট ও কাজের চাপের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, পুলিশে বিভিন্ন পর্যায়ে নতুন পদ সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য হিসেবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলা, থানার কার্যক্রম শক্তিশালী করা এবং মাঠপর্যায়ে পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়গুলো সামনে এসেছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ৪ হাজার এএসআই নিয়োগের উদ্যোগটি কেবল সরাসরি নিয়োগনির্ভর নয়। সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনায় ৫০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগ এবং ৫০ শতাংশ পদোন্নতির কথা বলা হয়েছিল। ফলে পুরো ৪ হাজার পদে কর্মরত কনস্টেবলদের পদোন্নতির সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, এমন দাবি সরকারি ঘোষণার সঙ্গে মেলে না।
তবে সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে ২ হাজার এএসআই নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে কর্মরত কনস্টেবলদের একটি অংশের মধ্যে যে প্রশ্ন ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, সেটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার বিষয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, নতুন জনবল নিয়োগের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করা পুলিশ সদস্যদের ক্যারিয়ার অগ্রগতির পথও স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।
অর্থের বিনিময়ে নিয়োগের অভিযোগটি সত্য হলে বিষয়টি শুধু একটি নিয়োগ অনিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এতে পুলিশের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা এবং বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও মনোবলের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। তবে অভিযোগটি সত্য কি না, তা নির্ধারণের জন্য স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।
এদিকে সরাসরি এএসআই নিয়োগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রার্থী বাছাই, নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়োগের সুযোগ দেওয়া এবং পুলিশের ভেতরে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের যে অভিযোগ বিভিন্ন মহল থেকে করা হচ্ছে, সেসব দাবিরও স্বাধীনভাবে যাচাই প্রয়োজন। এসব অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্যে নির্ভরযোগ্য সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।
সূত্রঃ নর্থইস্ট নিউজ
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au