বাংলাদেশ

উগ্র মৌলবাদ ও নারী: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

  • 10:17 pm - August 08, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৩৫ বার
উগ্র মৌলবাদ ও নারী: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট–পরবর্তী বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ৮ আগষ্ট- ইতিহাস কখনো কখনো নিজের সন্তানদের গিলে খায়। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যে আন্দোলন জন্ম নিয়েছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে, নারীর সমান অংশগ্রহণের দাবিতে, সেই আন্দোলনের রক্তক্ষরণ যাঁরা সবচেয়ে বেশি সয়েছেন, ইতিহাসের পাতায় তাঁদের নামই সবচেয়ে দ্রুত মুছে যাচ্ছে। রাজপথে যে নারীরা সামনের কাতারে দাঁড়িয়ে স্লোগান তুলেছিলেন, পুলিশের গুলির সামনে বুক পেতেছিলেন, ৫ আগস্টের পর তাঁদেরই ঠেলে দেওয়া হলো ইতিহাসের প্রান্তে। যে আন্দোলন “বৈষম্যবিরোধী” নাম নিয়ে শুরু হয়েছিল, দুই বছরের ব্যবধানে তা যেন পরিণত হয়েছে এক নীরব প্রতারণার আখ্যানে—নারীর প্রতি বিদ্বেষ বেড়েছে, অধিকারের পরিসর সংকুচিত হয়েছে, আর সাইবার বুলিং হয়ে উঠেছে দৈনন্দিন বাস্তবতার নাম। রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজ—প্রতিটি ক্ষেত্রে নারী পিছিয়ে পড়েছেন এমন এক গতিতে, যা নিছক কাকতালীয় বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

শেখ হাসিনাকে সেনাপ্রধান নিরাপদে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়ার সেই সন্ধ্যায় যাঁরা রাজপথে উল্লাস করেছিলেন, তাঁদেরই একটি বড় অংশের স্বপ্ন ছিল একটি অধিকতর সাম্যের বাংলাদেশ। কিন্তু গত দুই বছরের বাস্তবতা প্রমাণ করেছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সমানুপাতিক হারে বেড়েছে রক্ষণশীল ও উগ্র মৌলবাদী শক্তির স্বর। একদিকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সংস্কারের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ, অন্যদিকে রাজপথ ও সামাজিক পরিসরে নারীবিরোধী প্রচারণার জোয়ার—এই দ্বৈরথের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে আজকের বাংলাদেশ, যেন দুই স্রোতের সংঘাতে দিশাহারা এক নৌকা।

বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের অভিযোগ, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে যখন প্রকাশ্যে কটূক্তি চলেছে, তখন রাষ্ট্রের নীরবতা রীতিমতো প্রশ্নবিদ্ধ। এই নীরবতা নিছক ব্যর্থতা নয়—এটি একধরনের রাজনৈতিক বার্তা, যা বলে দেয় নারীর মর্যাদা রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার তালিকায় ঠিক কোথায় অবস্থান করছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বামী বা সঙ্গীর হাতে নারী নির্যাতনের হারে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ—১৬১টি দেশ ও অঞ্চলের ২০০০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি এই প্রতিবেদন যেন এক পূর্বাভাস, যা পরবর্তী বছরগুলোর সংকটকে আগেভাগেই চিহ্নিত করে রেখেছিল।

সংখ্যার আড়ালে যে রক্তক্ষরণ

পরিসংখ্যান কখনো নিরাসক্ত হয় না, বিশেষত যখন তার প্রতিটি ঘরে লুকিয়ে থাকে একেকটি জীবনের বিনাশ। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই—এই সাত মাসে দেশে ৩৬৩টি পারিবারিক সহিংসতার ঘটনায় প্রাণ গেছে ৩২২ জনের, যার মধ্যে ২০৮ জন নারী ও শিশু। আত্মহত্যা করেছেন আরও ১১৪ জন। সবচেয়ে নৃশংস সত্যটি হলো—সবচেয়ে বেশি হত্যার শিকার নারীরা হয়েছেন নিজের স্বামীর হাতে (১৩৩ জন), যে সম্পর্কটির কথা ছিল আশ্রয়ের, তা-ই পরিণত হয়েছে সবচেয়ে বড় হুমকিতে। স্বামীর পরিবারের হাতে খুন হয়েছেন আরও ৪২ জন, নিজের পরিবারের সদস্যদের হাতে ৩৩ জন।

প্রবণতার রেখচিত্রও উদ্বেগজনক। ২০২৪ সালে যেখানে প্রতি মাসে গড়ে ৪৩টি পারিবারিক সহিংসতার খবর গণমাধ্যমে এসেছে, ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১-এ। ধর্ষণের চিত্র আরও ভয়াবহ—২০২৪ সালের পুরো বছরে যেখানে ৪০১টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল, ২০২৫ সালের মাত্র সাত মাসেই তা ছাড়িয়ে গেছে ৪৯২-এ, সঙ্গে ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছেন আরও ১৭২ জন। এর মধ্যে ২৪ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে, ছয়জন বেছে নিয়েছেন আত্মহননের পথ—যেন বিচারের আশা ছেড়ে দেওয়াই তাঁদের কাছে একমাত্র উত্তর মনে হয়েছে। যৌতুকের নামে নির্যাতনের অন্তত ৫১টি ঘটনায় মারা গেছেন ২৫ জন, আর এসিড নিক্ষেপের মতো বর্বরতাও ঘটেছে অন্তত সাতবার।

এই পরিসংখ্যান দেশের শীর্ষ ১০-১৫টি গণমাধ্যম থেকে সংগৃহীত—অর্থাৎ প্রকৃত চিত্র নিঃসন্দেহে আরও বীভৎস, কারণ প্রতিটি নির্যাতন সংবাদের শিরোনাম হয় না, প্রতিটি অভিযোগ মামলার রূপ নেয় না। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবও একই দিকে ইঙ্গিত করে—বাংলাদেশে যত অপরাধে মামলা হয়, তার শীর্ষে নারী ও শিশু নিপীড়ন। শুধু ২০২৪ সালেই এ ধরনের মামলা হয়েছে ১৭ হাজার ৫৭১টি। আর ২০২৫ সালে মাসওয়ারি চিত্র আরও ভয়ংকর—জানুয়ারিতে ১,৪৪০টি, ফেব্রুয়ারিতে ১,৪৩০টি, মার্চে ২,০৫৪টি, এপ্রিলে ২,০৮৯টি, মে মাসে ২,০৮৭টি, জুনে ১,৯৩৩টি, জুলাইয়ে ২,০৯৭টি মামলা। সংখ্যাগুলো পড়তে পড়তে মনে হয়, প্রতিটি মাস যেন আগের মাসের ট্রমাকেই নতুন রূপে ফিরিয়ে আনছে।

২০২৪ সালের নিজস্ব হিসাবেও চিত্র ভয়াবহ—ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ৪০১ জন নারী, যাঁদের মধ্যে ৩৪ জন ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যার শিকার, সাতজন আত্মহত্যা করেছেন। গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২১ জন নারী, রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে ছয়জনের—এই “রহস্যজনক” শব্দটির আড়ালেই লুকিয়ে থাকে কত অব্যাখ্যাত নিষ্ঠুরতা, তা অনুমান করাও কঠিন। যৌন হয়রানি ও উত্ত্যক্তকরণের শিকার হয়েছেন অন্তত ১৬৬ জন নারী, যাঁদের মধ্যে দুজন আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন, তিনজন খুন হয়েছেন। পারিবারিক নির্যাতনের শিকার ৫২৩ জন নারীর মধ্যে ২৭৮ জন মারা গেছেন, ১৭৪ জন আত্মহত্যা করেছেন—এই সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়, এক একটি নিভে যাওয়া জীবনের সাক্ষ্য।

সংস্কারের প্রস্তাব বনাম প্রতিরোধের প্রাচীর

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গঠিত ১১-১২টি সংস্কার কমিশনের একটি ছিল নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন, যা আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয় ২০২৪ সালের ১৮ নভেম্বর। শিরীন পারভীন হকের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের এই কমিশন দীর্ঘ পরিশ্রমের ফসল হিসেবে ৪২৩টি সুপারিশসহ ৩১৮ পৃষ্ঠার এক বিস্তৃত প্রতিবেদন জমা দেয় ২০২৫ সালের ১৯ এপ্রিল। উত্তরাধিকার আইন, কর্মক্ষেত্রে সমতা, পারিবারিক আইন—এমন একাধিক স্পর্শকাতর ও দীর্ঘদিনের অবহেলিত বিষয়ে সংস্কারের রূপরেখা তুলে ধরেছিল এই প্রতিবেদন।

কিন্তু প্রতিবেদন প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে যে প্রতিক্রিয়া দেখা দিল, তা যেন প্রমাণ করে দিল—বাংলাদেশে নারীর অধিকারের প্রশ্নটি এখনো কতটা রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বিষয়। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ পুরো কমিশন বাতিলের দাবি তুলে সরকারকে সময়সীমা বেঁধে দেয়। ২০২৫ সালের ৩ মে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত মহাসমাবেশে সংগঠনটির নেতারা প্রতিবেদনকে আখ্যা দেন “কোরআন-সুন্নাহবিরোধী” বলে। জামায়াতে ইসলামীও একই সুরে প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে। মুরাদনগরের মতো উপজেলা পর্যায়েও প্রতিবাদ মিছিল ছড়িয়ে পড়ে, যা প্রমাণ করে বিরোধিতাটি কেবল রাজধানীকেন্দ্রিক ছিল না, বরং সারাদেশে এক সংগঠিত প্রতিরোধের রূপ নিয়েছিল। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় বামপন্থী ও নারীবাদী সংগঠনগুলো রাজপথে নামে, হেফাজতের কিছু নেতার বিরুদ্ধে আইনি নোটিশও পাঠানো হয়—কিন্তু এই সংঘাতের মধ্যে হারিয়ে গেল মূল প্রশ্নটি: রাষ্ট্র কি আদৌ তার নাগরিক নারীদের পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত?

মব সহিংসতার নতুন ব্যাকরণ

৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর দেশের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে অবনতি ঘটে, তার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয়েছে নারীকেই। পুলিশ প্রশাসনের সাময়িক নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী অধিকারকর্মী, শিক্ষার্থী ও ভিন্নমতের নারীদের লক্ষ্য করে চরিত্রহনন ও কুৎসা রটনার ঢেউ ওঠে। রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে সাধারণ নারী ও সংখ্যালঘুরা পড়েন বাড়তি ঝুঁকিতে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী শুধু দুই মাসেই—মার্চ ও এপ্রিলে—মব সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৪০ জন, আর নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৬০১টি। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) হিসাব বলছে, গত পাঁচ বছরে প্রায় ১২ হাজার নারী ও কন্যাশিশু সহিংসতার শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ছয় হাজারের বেশি ধর্ষণের ঘটনা। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক শিক্ষাক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে প্রচলিত কুসংস্কার ও ধর্মীয় অপব্যাখ্যাকে এই সহিংসতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন—যা প্রমাণ করে, সহিংসতার শিকড় কেবল আইনি শূন্যতায় নয়, সমাজের গভীরে প্রোথিত মানসিকতাতেও।

গণপরিসর যখন নিষিদ্ধ ভূমি

নারীর অস্তিত্ব যেন ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে গণপরিসরে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে জয়পুরহাটে নারীদের একটি ফুটবল ম্যাচ আয়োজনে বাধা দেওয়া হয়, মাঠে ভাঙচুর চালিয়ে ম্যাচ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামেন। কিন্তু এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন উদাহরণ নয়—দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নারীদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা এমনকি পোশাক নিয়ে হস্তক্ষেপের খবর গণমাধ্যমে বারবার উঠে এসেছে, যেন একটি অদৃশ্য সীমারেখা এঁকে দেওয়া হচ্ছে নারীর চলাফেরার ওপর।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের (ওএইচসিএইচআর) একটি স্বাধীন তদন্ত প্রতিবেদনে ৫ থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি, ব্যবসাস্থল ও উপাসনালয়ে হামলার একাধিক ঘটনার উল্লেখ রয়েছে, যেখানে বিশ্লেষকদের মতে সংখ্যালঘু নারীরা পড়েছেন দ্বিগুণ ঝুঁকিতে—একদিকে নারী হওয়ার কারণে, অন্যদিকে সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে।

জুলাই অভ্যুত্থানে নারীদের ঐতিহাসিক ভূমিকা সত্ত্বেও রাষ্ট্র ও সমাজ তা যথাযথভাবে ধারণ করতে পারেনি বলে অভিযোগ ক্রমাগত উঠছে। শ্রমজীবী নারী মৈত্রীর এক আলোচনা সভায় বক্তারা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, আন্দোলনের পর নারীর পোশাক, চলাফেরা ও ব্যক্তিস্বাধীনতাকে কেন্দ্র করে বিদ্বেষমূলক প্রচারণা কমেনি, বরং বেড়েছে। যে নারীরা রাজপথে জীবন বাজি রেখেছিলেন, ইতিহাস যেন তাঁদের প্রতিই সবচেয়ে অকৃতজ্ঞ হয়ে উঠল।

সাম্প্রদায়িক সহিংসতার দীর্ঘ ছায়া

৫ আগস্ট-পরবর্তী দুই বছরে দেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ২,৯৬৩টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি—প্রায় ৭৩.৭ শতাংশ—ঘটেছে প্রথম পাঁচ মাসেই, যা প্রমাণ করে ক্ষমতার শূন্যতা কতটা দ্রুত সহিংসতার জন্ম দেয়। ২০২৫ সালে মোট ঘটনার ১৭.৬ শতাংশ ও ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ৮.৭ শতাংশ ঘটনা রেকর্ড হয়েছে। ২০২৪ সালের সহিংসতার মাত্রা ২০২৫ সালের তুলনায় প্রায় ৪.২ গুণ বেশি ছিল—সংখ্যার দিক থেকে প্রবণতা নিম্নমুখী মনে হলেও, মোট সহিংসতার প্রায় ৭০ শতাংশ ছিল বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, প্রায় ১০ শতাংশ ধর্মীয় উপাসনালয়কেন্দ্রিক। প্রতি ২১টি ঘটনায় গড়ে একজন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, প্রতি ১০টি ঘটনার একটি ছিল ধর্মীয় স্থাপনায় হামলা।

২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুন—এই ২৩ মাসে মোট ২,০৫৫টি ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। তুলনামূলক পর্যালোচনায় উঠে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা—মোট ঘটনার সংখ্যা পরবর্তী ১৮ মাসে কমলেও হত্যাকাণ্ড, নারী নির্যাতন, সম্পত্তি দখল ও ধর্মঅবমাননার অভিযোগে হয়রানির ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে—অর্থাৎ সহিংসতা কমছে না, বরং তার রূপ বদলাচ্ছে, আরও লক্ষ্যভেদী ও পরিকল্পিত হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক ছয় মাসের হিসাবে দেশজুড়ে ২৫৭টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ৪০টি ঘটনায় ৪৪ জন নিহত, নারী নির্যাতন/ধর্ষণ/গণধর্ষণের ঘটনা পাঁচটি, অপহরণ/চাঁদাদাবি/নির্যাতনের ঘটনা ১০টি।

ভিন্নমত ন্যায্য প্রেক্ষাপট: একপাক্ষিকতার ফাঁদ এড়িয়ে

এই বিতর্কে একপাক্ষিক চিত্র উপস্থাপন করা সাংবাদিকতার ধর্ম নয়। হেফাজতে ইসলামের নেতারা নিজেদের অবস্থানকে নারীবিরোধী বলে মানতে নারাজ। সংগঠনের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি জাবের কাশেমীর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁদের আন্দোলন নারীবিরোধী নয়, বরং ইসলাম নারীকে যে মর্যাদা ও অধিকার দিয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন, নারী সংস্কার কমিশনের সুপারিশকে তাঁরা তার পরিপন্থী মনে করছেন। তাঁদের মূল আপত্তি বিশেষত উত্তরাধিকার আইন সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলো নিয়ে, যা তাঁদের বিশ্বাসে কোরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

অন্যদিকে নারী অধিকারকর্মী ও প্রগতিশীল সংগঠনগুলোর যুক্তি—সংবিধান স্বীকৃত সাম্যের নীতি ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড, যেমন সিডও সনদ অনুসরণ ছাড়া প্রকৃত সাম্য অর্জন সম্ভব নয়। এই দুই অবস্থানের মধ্যে সংলাপ ও আপসের জায়গা এখনো সংকুচিত, আর এই সংকীর্ণতাই রাজনৈতিক ঝুঁকি হয়ে থেকে যাচ্ছে—কারণ যেখানে সংলাপের পথ বন্ধ, সেখানে সংঘাতই একমাত্র ভাষা হয়ে দাঁড়ায়।

দৈনন্দিনতার নিষ্ঠুরতা: কিছু নাম, কিছু মুখ

পরিসংখ্যানের আড়ালে আসল মানুষের গল্পগুলো প্রায়ই হারিয়ে যায়। ঢাকায় গত ১৩ আগস্ট চার সন্তানের এক জননীর লাশ হাসপাতালে ফেলে পালিয়ে যান স্বামী। ১৭ আগস্ট আরেক স্ত্রীকে কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেন তাঁর স্বামী। সিলেটের গোলাপগঞ্জে ১৮ জুন স্ত্রীকে হত্যা করে পুকুরে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে স্বামীর বিরুদ্ধে। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে এপ্রিলে পারিবারিক কলহের জেরে স্ত্রী, সন্তান ও স্ত্রীর বড় বোনকে হত্যা করে লাশ তিনটি বস্তাবন্দি করে মাটিচাপা দেওয়ার ঘটনা ঘটে।

এই খবরগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি প্যাটার্নের অংশ। গুগলে ২১ আগস্ট বিকেল পাঁচটায় বাংলায় “স্ত্রীকে হত্যা” লিখে সার্চ দিলে এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে আসে আট কোটি রেজাল্ট; “স্ত্রীকে কুপিয়ে হত্যা” লিখলে আসে ৪০ লাখ রেজাল্ট। এই সংখ্যাগুলো শুধু ডিজিটাল দুনিয়ার প্রতিফলন নয়—এগুলো বাস্তবতারই আয়না, যেখানে “মসলা বাটার নোড়া দিয়ে আঘাত করে গৃহবধূকে হত্যা”, “অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে পেট্রোল ঢেলে আগুন”, “স্ত্রীকে হত্যা করে লাশে আগুন”—এমন সব বর্বরতার খবর নিয়মিত উঠে আসছে গণমাধ্যমে, যা কেবল সংবাদ নয়, বরং সমাজের এক গভীর অসুখের লক্ষণ।

বাংলাদেশে নারীর গন্তব্য কোথায়?

৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর বাংলাদেশের নারী নিরাপত্তা ও অধিকার প্রশ্নে যে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা নিছক পরিসংখ্যানের বিষয় নয়—এটি একটি সভ্যতাগত প্রশ্ন। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, নিজেদের নারীবান্ধব ও প্রগতিশীল বলে পরিচয় দেওয়া অনেক ব্যক্তি ও সংগঠনের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর সমালোচকদের কাছে যথেষ্ট জোরালো মনে হচ্ছে না। শহরের অপেক্ষাকৃত সুবিধাপ্রাপ্ত ও এলিট সমাজের একটি অংশ হয়তো এখনো সরাসরি এই সংকটের মুখোমুখি হননি বলেই তাঁদের কণ্ঠস্বর নীরব থেকে যাচ্ছে। কিন্তু প্রান্তিক নারী, গার্মেন্টস শ্রমিক, ক্ষুদ্র শ্রমজীবী ও দিনমজুর নারীদের একটি বিশাল অংশ প্রতিদিন নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কের মধ্যে জীবনযাপন করছেন—তাঁদের গল্প খবরের শিরোনাম হয় না, কিন্তু তাঁদের ভয় প্রতিদিনের বাস্তবতা।

সমালোচকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ধর্মভিত্তিক ও মৌলবাদী রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে, আর আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পক্ষের ভূমিকা নিয়েও জনপরিসরে নানা মত ও বিতর্ক রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে কয়েকটি প্রশ্ন অনিবার্যভাবে সামনে চলে আসে—এই নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশের নারীর ভবিষ্যৎ কোথায়? তিনি কি কেবল সন্তান জন্মদানের ভূমিকাতেই সীমাবদ্ধ থাকবেন? গৃহস্থালির দায়িত্ব পালনকারী হিসেবেই কি তাঁর পরিচয় নির্ধারিত হবে? নাকি তাঁকে এখনো পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির ভোগ্যপণ্য হিসেবেই বিবেচনা করা হবে?

বাংলাদেশের সংবিধান নারী-পুরুষের সমান মর্যাদা ও অধিকারের কথা স্পষ্ট ভাষায় বলে। তাই যে-ই রাষ্ট্র পরিচালনা করুক না কেন, নারীর জীবন, সম্মান, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব—এই দায়িত্ব থেকে কোনো সরকারই নিজেকে মুক্ত রাখতে পারে না। একটি নিরাপদ, বৈষম্যহীন ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে নারীর অধিকার ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।

উপসংহার: দ্বিমুখী বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা এক জাতি

৫ আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশে নারীর অবস্থান একটি দ্বিমুখী বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে রাষ্ট্রীয় সংস্কারের উদ্যোগ ও আইনি অগ্রগতির সম্ভাবনা যেন এক ক্ষীণ আলোকরেখা, অন্যদিকে রক্ষণশীল ও উগ্র মৌলবাদী শক্তির সরব প্রতিরোধ এবং সমাজে ক্রমবর্ধমান মব সহিংসতা যেন সেই আলো নিভিয়ে দেওয়ার প্রাণান্তকর চেষ্টা। এই দ্বন্দ্বের সমাধান কোনো একক পক্ষের হাতে নেই—প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আইনের যথাযথ ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ, এবং বিভিন্ন মতাদর্শিক অবস্থানের মধ্যে অর্থবহ সংলাপ, যাতে নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা কোনো রাজনৈতিক দর-কষাকষির উপকরণ হয়ে না ওঠে।

কারণ ইতিহাস সাক্ষী—যে জাতি তার নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, সেই জাতির অগ্রযাত্রাও থমকে থাকে অর্ধেক পথে।

আমাদের দাবি

নারীর প্রতি সকল প্রকার সহিংসতা, বৈষম্য ও নির্যাতনমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমরা নিম্নলিখিত দাবিসমূহ উত্থাপন করছি:

১. নারীর প্রতি সকল প্রকার হয়রানি, নির্যাতন ও সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সরকার, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

২. নারীর বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি এবং তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও দ্রুত তদন্ত নিশ্চিত করে প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

৩. নারী নির্যাতনের কোনো ঘটনা প্রত্যক্ষ বা অবগত হলে তাৎক্ষণিকভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে অবহিত করতে হবে। সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ও জনসম্পৃক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে, যাতে অপরাধীরা কোনোভাবেই সামাজিক বা রাজনৈতিক প্রশ্রয় না পায়।

৪. সংবাদমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ও সংবেদনশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। নারী ও শিশু নির্যাতনের সংবাদ প্রকাশে ভুক্তভোগীর মর্যাদা, গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নিরপেক্ষ, তথ্যনির্ভর ও মানবিক সাংবাদিকতা অনুসরণ করতে হবে।

৫. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে হবে—

  • ঘটনার শিকার নারীকে হেয়, অপমান বা সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন কোনো মন্তব্য, ছবি বা তথ্য প্রচার থেকে বিরত থাকতে হবে।
  • অপরাধীকে শনাক্ত করতে ও আইনের আওতায় আনতে প্রয়োজনীয় তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দিয়ে সহযোগিতা করতে হবে।
  • কোনো ঘটনার ছবি বা ভিডিও প্রচারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতা প্রদর্শন করতে হবে, যাতে ভুক্তভোগী নারী ও তাঁর পরিবারের সামাজিক মর্যাদা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন না হয়।

৬. নারীর সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। শুধু পুলিশি নিরাপত্তাই নয়, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, গণপরিবহন ও সমাজের প্রতিটি স্তরে নারীর প্রতি সম্মান, সমতা ও নিরাপত্তার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

আমরা বিশ্বাস করি, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ কেবল রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়; এটি সমাজের প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব। তাই আসুন—যেকোনো স্থান, যেকোনো সময় ও যেকোনো পরিস্থিতিতে নারীর প্রতি সকল প্রকার সহিংসতা, হয়রানি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হই, প্রতিবাদ গড়ে তুলি এবং একটি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও মানবিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করি।

লেখক- ঝর্না বাড়ৈ

এই শাখার আরও খবর

রিজভীর বক্তব্যে ক্ষুব্ধ শাবনূর, দিলেন বিস্তারিত ব্যাখ্যা

মেলবোর্ন, ৮ আগষ্ট: তিন দশক ধরে দেশের চলচ্চিত্রে সবচেয়ে আলোচিত ও রহস্যময় ঘটনা হয়ে আছে সালমান শাহর মৃত্যু। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর বাসায় তাকে ঝুলন্ত…

সংকটাপন্ন মোজতবা খামেনেই, ইরানে ছড়াচ্ছে মৃত্যুর গুঞ্জন

মেলবোর্ন, ৮ আগষ্ট: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেই সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর খবর শিগগিরই আসতে পারে বলেও…

শিল্প না থাকলে জাতি থাকে না: নাটক-সিনেমা-গানের বাংলাদেশ

মেলবোর্ন, ৮ আগষ্ট- সভ্যতার চাকা ঘোরে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি দিয়ে। কিন্তু সভ্যতাকে বাঁচিয়ে রাখে শিল্প-সাহিত্য। একটা জাতিকে অস্ত্র দিয়ে দমানো যায়, কিন্তু তার গান, নাটক, কবিতা কেড়ে…

মুছে ফেলা ইনস্টাগ্রাম পোস্টে ভাতিজির মৃত্যুর কারণ প্রকাশ করলেন আরএফকে জুনিয়র

মেলবোর্ন, ৮ আগষ্ট: যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা মন্ত্রী রবার্ট এফ. কেনেডি জুনিয়রের একটি ইনস্টাগ্রাম পোস্ট ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে তাঁর ভাতিজি সাওইর্স কেনেডি হিলের…

তনু হত্যা মামলায় অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য হাফিজুর রহমান গ্রেপ্তার

মেলবোর্ন, ৮ আগষ্ট: কুমিল্লার সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। শনিবার (৮ আগস্ট) পিবিআই থেকে…

রাশিয়ার তেল-গ্যাসের ক্রেতা দেশগুলোতে ১০০% শুল্কের পথ খুলল যুক্তরাষ্ট্র

মেলবোর্ন, ৮ আগষ্ট: রাশিয়া থেকে তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাস কেনা বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ দেশের ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au