হঠাৎ কী বার্তা নিয়ে দিল্লি গেলেন দীনেশ ত্রিবেদী?
মেলবোর্ন, ১১ আগষ্টঃ এক দিনের ব্যবধানে বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপর্যায়ের তিন প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক করে নয়াদিল্লি গেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। সোমবার (১০ আগস্ট) বিকেলে…
মেলবোর্ন, ১১ আগষ্ট- বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা এনটিআরসিএর (বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ) কাছ থেকে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে, এমন দাবি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন প্রতিবাদ জানিয়েছে। কেউ কেউ আন্দোলনেরও হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
তবে এমন কোনো সিদ্ধান্ত সরকার নেয়নি বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। সোমবার রাত ৯টার দিকে নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি।
এর আগে সোমবার সন্ধ্যা থেকে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা এনটিআরসিএর কাছ থেকে ম্যানেজিং কমিটির হাতে নেওয়ার বিরোধিতা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন পোস্ট, বিবৃতি ও কর্মসূচি দেখা যায়। একই সময়ে সরকার–সমর্থকদের পক্ষ থেকেও গুজব ও অপপ্রচার থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়।
যে কার্যবিবরণী ঘিরে বিতর্ক
বর্তমানে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ হয় এনটিআরসিএর পরীক্ষা ও সুপারিশের ভিত্তিতে। অন্যদিকে অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক ও কর্মচারী পদে নিয়োগ এত দিন পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে হয়ে আসছিল।
সম্প্রতি এসব পদেও এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে লিখিত পরীক্ষাও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এনটিআরসিএর সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে গত ৩ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে একটি সভা হয়। ওই সভার কার্যবিবরণী প্রকাশ্যে আসার পরই শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
কার্যবিবরণীতে ১৯তম এনটিআরসিএ শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা গ্রহণের বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০০৫’ অনুযায়ী এনটিআরসিএ এখন থেকে কেবল নিবন্ধন ও প্রত্যয়নের কাজ করবে। ২০১৫ সালের পরিপত্র অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করবে না। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে।
কার্যবিবরণীতে আরও বলা হয়, এনটিআরসিএর বর্তমান অচলাবস্থা নিরসনে আগের মতো শুধু নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কার্যক্রম পরিচালনা এবং প্রত্যয়ন পাওয়া শিক্ষকদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে বর্তমান সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে বলে সভায় মত দেওয়া হয়।
এই কার্যবিবরণী সামনে আসার পরই এনটিআরসিএর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের বর্তমান ব্যবস্থা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
আন্দোলনের হুঁশিয়ারি
বিষয়টি সামনে আসার পর রোববার রাতে ফেসবুক পোস্টে আন্দোলনের আগাম ঘোষণা দেন এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণপ্রত্যাশী জোটের সদস্যসচিব অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন আজিজী। সোমবার বিকেলের পর চাকরিপ্রত্যাশীদের অনেকেও বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন।
সন্ধ্যার পর এনটিআরসিএর বদলে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের সম্ভাব্য উদ্যোগের সমালোচনা করেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতা–কর্মীরা।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এক ফেসবুক পোস্টে বলেন, ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হলে সরকারকে বড় ধরনের আন্দোলনের মুখে পড়তে হবে। তাঁর অভিযোগ, এ ধরনের ব্যবস্থা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণের সুযোগ তৈরি করবে।
জামায়াতের প্রতিবাদ
সন্ধ্যার পর জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীও এ বিষয়ে বিবৃতি দেয়।
বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় প্রবেশ পর্যায়ের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটির হাতে দেওয়ার উদ্যোগের নিন্দা জানিয়ে দলটি বলেছে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দলীয় প্রভাব ও ঘুষ-বাণিজ্যের পুরোনো চক্র আবার সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জামায়াতের দাবি, বিদ্যমান নিয়োগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও জটিলতা দূর করে সেটিকে আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করার বদলে ম্যানেজিং কমিটির হাতে নিয়োগের ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া হলে অতীতের অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ আবার তৈরি হবে। দলটি এ উদ্যোগ বাতিলের দাবি জানিয়েছে।
ঢাবিতে বিক্ষোভ, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারি
শিক্ষক নিয়োগের সম্ভাব্য পরিবর্তনের প্রতিবাদে এনসিপির ছাত্রসংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তি সোমবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেছে।
অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্র আন্দোলন এক বিবৃতিতে ম্যানেজিং কমিটির পরিবর্তে এনটিআরসিএকেই শিক্ষক নিয়োগের পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। দাবি আদায়ে প্রয়োজনে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারিও দিয়েছে সংগঠনটি।
আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) ছাত্রসংগঠন ছাত্রপক্ষও বিবৃতিতে বলেছে, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটির হাতে দেওয়া হলে ঘুষ-বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি হবে। সংগঠনটি এই উদ্যোগকে মেধাভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগের জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছে।

‘গুজবনির্ভর অপপ্রচার থেকে বিরত থাকুন’
এদিকে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা বাড়তে থাকলে সরকার–সমর্থক ছাত্রসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব হন।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন পৃথক ফেসবুক পোস্টে সবাইকে গুজবনির্ভর অপপ্রচার থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। তাঁরা বলেন, এনটিআরসিএ নিয়ে সঠিক তথ্য শিগগিরই জানা যাবে।
এরপর রাত ৯টার দিকে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের ফেসবুক পেজ ‘এহছানুল হক মিলন মিডিয়া সেল’ থেকে এ বিষয়ে বক্তব্য দেওয়া হয়।
পোস্টে বলা হয়, এনটিআরসিএ ২০০৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। এনটিআরসিএর কার্যক্রম ও শিক্ষক নিয়োগপ্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ, দক্ষ ও সুন্দরভাবে কীভাবে পরিচালনা করা যায়, সে বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনা অব্যাহত রয়েছে।
পোস্টে আরও বলা হয়, ‘ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডি কর্তৃক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া–সংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি।’এ বিষয়ে অপতথ্য প্রচার না করার জন্য সবার প্রতি অনুরোধ জানান শিক্ষামন্ত্রী।
শিক্ষামন্ত্রীর এই পোস্ট ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ সরকার–সমর্থক অনেকেই নিজেদের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে শেয়ার করেছেন।
ফলে কার্যবিবরণী ঘিরে শিক্ষক নিয়োগব্যবস্থা পরিবর্তনের যে আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে, আপাতত সরকারের পক্ষ থেকে তাতে সিদ্ধান্তের বিষয়টি নাকচ করা হয়েছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au