কলম্বিয়ায় শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বাড়ছে। ছবিঃ রয়টার্স
মেলবোর্ন, ১১ আগষ্ট- দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ায় শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত ৬৯ জন নিহত হয়েছেন। সোমবার স্থানীয় সময় ৭ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এতে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন শহরে বহু ভবন ধসে পড়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে অনেকে আটকা পড়েছেন এবং আরও বহু মানুষ আহত হয়েছেন।
ভূমিকম্পের পর রাজধানী বোগোতাসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা আতঙ্কে বাড়িঘর ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। উদ্ধারকারী দলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় অভিযান শুরু করেছে এবং হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা এবং কলম্বিয়ার ভূতাত্ত্বিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সোমবার কলম্বিয়ার চোকো অঞ্চলের সান হোসে দেল পালমার পৌরসভার কাছে ভূমিকম্পটির উৎপত্তি হয়। এলাকাটি রাজধানী বোগোতা থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পশ্চিমে।
কলম্বিয়ার কর্তৃপক্ষ প্রথমে ভূমিকম্পটির মাত্রা ৬ দশমিক ৬ বলে জানিয়েছিল। পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ভূমিকম্পটির মাত্রা ৭ দশমিক ৪ বলে জানায়। এর উৎপত্তিস্থল ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১০৭ কিলোমিটার গভীরে ছিল।
ভূমিকম্পের পর সুনামির কোনো সতর্কতা জারি করা হয়নি বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সুনামি সতর্কীকরণ ব্যবস্থা।
চোকোর গভর্নর নুবিয়া ক্যারোলিনা কর্দোবা-কুরি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, চোকো বিভাগে বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়েছে। ভূমিকম্পের পরবর্তী কম্পন নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
তিনি জানান, ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল সান হোসে দেল পালমারের কাছে হলেও চোকোর রাজধানী কিবদোতেও হতাহত ও ভবনের উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে এরই মধ্যে কাজ শুরু হয়েছে এবং শিগগিরই প্রাথমিক সরকারি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।
দেশটির কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি প্রতিবেশী ইকুয়েডরের কর্তৃপক্ষও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। জরুরি সেবা ও উদ্ধারকারী দলগুলো ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করছে।
ভূমিকম্পের তীব্র কম্পন রাজধানী বোগোতাতেও অনুভূত হয়েছে। কম্পনে গাড়ি ও বিভিন্ন ভবনের অ্যালার্ম বেজে ওঠে। আতঙ্কিত মানুষ দ্রুত বাড়িঘর ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন।

পেরেইরা শহরে অন্তত ১৮ জন, মানিসালেসে দুজন এবং ক্যালি অবস্থিত ভায় দেল কাওকা এলাকায় ২৭ জন নিহত হয়েছেন। ছবিঃ রয়টার্স
বোগোতার মেয়র কার্লোস ফার্নান্দো গালান ভূমিকম্পের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, রাজধানীতে এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে কিছু ভবনে ফাটল দেখা গেছে।
তিনি বলেন, বোগোতায় গুরুতর কোনো কাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। দেশের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দেওয়ার জন্য রাজধানীর জরুরি সেবাগুলো প্রস্তুত রয়েছে।
ভূমিকম্পে কলম্বিয়ার পশ্চিমাঞ্চলের বেশ কয়েকটি শহরে ভবন ধসে পড়েছে। ক্যালি শহরে অন্তত ২৫টি ভবন ধসে পড়ার খবর পাওয়া গেছে।
স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পেরেইরা শহরে অন্তত ১৮ জন, মানিসালেসে দুজন এবং ক্যালি অবস্থিত ভায় দেল কাওকা এলাকায় ২৭ জন নিহত হয়েছেন।
পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় ‘এহে কাফেতেরো’ বা কফি অঞ্চল হিসেবেও পরিচিত এলাকায় বেশ কয়েকটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত ও ধসে পড়েছে।
দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মেডেলিনেও শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হয়। বেশ কয়েকটি আবাসিক ভবনে জরুরি সাইরেন বেজে ওঠে। আতঙ্কে অনেক বাসিন্দা ঘুমের পোশাক পরেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন। কেউ কেউ শুধু গায়ে তোয়ালে জড়িয়ে রাস্তায় চলে আসেন।
শহরটিতে এখন পর্যন্ত কোনো ভবন পুরোপুরি ধসে পড়া বা প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। তবে মেডেলিনের মেয়র ফেদেরিকো গুতিয়েরেজ অবকাঠামোর নিরাপত্তা পরীক্ষা করার জন্য শহরের মেট্রোর স্বাভাবিক চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেন।
মেডেলিনের আশপাশের ছোট শহরগুলোতেও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। কোথাও ছাদ ধসে পড়েছে, আবার কোথাও ভবনের দেয়ালে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে। চোকো অঞ্চলের গভর্নরসহ স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ভূমিকম্পের পরবর্তী কম্পন বা আফটারশকের বিষয়ে সতর্ক করেছে। উদ্ধারকারী দলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ও ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি চালাচ্ছে।
ভূমিকম্পের কারণে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থায় সাময়িক বিঘ্ন ঘটেছে কি না এবং আরও কত ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা নিরূপণে কর্তৃপক্ষ কাজ করছে। ভূমিকম্পের তীব্রতার কারণে ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও মানুষ আটকা থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কলম্বিয়ায় এই ভূমিকম্প এমন সময়ে আঘাত হানল, যখন প্রতিবেশী ভেনেজুয়েলায় কয়েক সপ্তাহ আগে পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানি হয়েছিল।
গত জুনের শেষ দিকে ভেনেজুয়েলায় ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। ওই দুই ভূমিকম্পে ৬ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন এবং শত শত ভবন ধ্বংস হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ আমেরিকার অন্যতম প্রাণঘাতী ভূমিকম্পগুলোর মধ্যে ওই দুটি ভূমিকম্পকে বিবেচনা করা হচ্ছে। এর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কলম্বিয়ায় নতুন করে শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানায় পুরো অঞ্চলে ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
সূত্রঃ আল জাজিরা