কুড়িগ্রামে এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থীই উত্তীর্ণ হতে পারেনি।ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১১ আগষ্ট: কুড়িগ্রামে এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থীই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এর মধ্যে একটি বিদ্যালয়ে ১৬ জন শিক্ষক-কর্মচারী থাকলেও পরীক্ষার্থী ছিল মাত্র চারজন। অন্য একটি বিদ্যালয়ে ১২ জন শিক্ষক থাকা অবস্থায় ১২ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েও কেউ পাস করতে পারেনি। এ ঘটনায় জেলার এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান ও শিক্ষার্থী সংকট নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলের পরিসংখ্যান থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
যেসব প্রতিষ্ঠানে এবারের পরীক্ষায় পাসের হার শূন্য, সেগুলো হলো কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার তালতলা উচ্চ বিদ্যালয়, একই উপজেলার ব্রাহ্মণপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়, কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার পূর্ব কুমরপুর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় এবং ভূরুঙ্গামারী উপজেলার পাথরডুবি আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়।
দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল অনুযায়ী, এ বছর কুড়িগ্রাম জেলায় এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় মোট ১৮ হাজার ৮৯৭ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। তাদের মধ্যে ১০ হাজার ৬৪৭ জন শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে। জেলার গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ। এ ছাড়া জেলায় জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ হাজার ১৭৯ জন শিক্ষার্থী।
রাজারহাট উপজেলার তালতলা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালে। তবে মাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠদানের অনুমতি পায় ২০২৪ সালে। চলতি বছর প্রতিষ্ঠানটি থেকে প্রথমবারের মতো ১২ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। বিদ্যালয়টিতে ১২ জন শিক্ষক থাকলেও পরীক্ষায় অংশ নেওয়া কোনো শিক্ষার্থীই উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষক অজয় কুমার সরকার বলেন, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতির ক্ষেত্রে নানা সমস্যা রয়েছে। মেয়েদের অনেকের বাল্যবিবাহ হয়ে যাওয়ায় এবং ছেলেদের একটি অংশ বিভিন্ন ধরনের শ্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ায় বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম ছিল।
তিনি আরও বলেন, বিদ্যালয়টি উপজেলা শহর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের অনেকে পরে শহরের বিদ্যালয়ে চলে যায়। ফলে স্থানীয় এই বিদ্যালয়ে তুলনামূলকভাবে মেধাবী শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যায়। এসব কারণও ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে বলে তিনি মনে করেন।
রাজারহাট উপজেলার আরেক প্রতিষ্ঠান ব্রাহ্মণপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৭ সালে। ২০২২ সালে বিদ্যালয়টি নিম্নমাধ্যমিক পর্যায়ে এমপিওভুক্ত হয়। পরে ২০২৪ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠদানের অনুমতি পায় প্রতিষ্ঠানটি।
তবে মাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠদানের অনুমতি পেলেও এ স্তরের জন্য এখনো কোনো শিক্ষক নেই। বিদ্যালয়টিতে মোট নয়জন শিক্ষক রয়েছেন।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সফিকুল ইসলাম জানান, মাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠদানের অনুমতি পাওয়ার পর পাঁচজন শিক্ষার্থীকে ভর্তি করা হয়েছিল। পরে তাদের একজনের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় সে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। বাকি চারজন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। কিন্তু তাদের কেউই উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় আরও মনোযোগী করা এবং ফলাফল উন্নত করার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ভূরুঙ্গামারী উপজেলার পাথরডুবি আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকেও এবারের এসএসসি পরীক্ষায় চারজন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তবে তাদের কেউই পাস করতে পারেনি।
বিদ্যালয়টি ২০১২ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠদানের অনুমতি পায়। প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন মোট ১৬ জন। এত সংখ্যক শিক্ষক-কর্মচারী থাকার পরও পরীক্ষার্থী ছিল মাত্র চারজন এবং তাদের কেউ উত্তীর্ণ না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার পূর্ব কুমরপুর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ফলাফলও একই চিত্র তুলে ধরেছে। প্রতিষ্ঠানটি থেকে এবার মাত্র একজন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। কিন্তু সেই শিক্ষার্থীও উত্তীর্ণ হতে পারেনি। ফলে বিদ্যালয়টির পাসের হারও শূন্য।
একই জেলার চারটি প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ না হওয়ায় এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা, নিয়মিত উপস্থিতি, শিক্ষক সংকট, পাঠদানের মান এবং স্থানীয় আর্থসামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কুড়িগ্রাম জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় কোনো শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেনি, সেসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে তদন্ত করা হবে।
তিনি বলেন, তদন্তের পর পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিক্ষাবিদদের মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানের পাসের হার শূন্য হওয়ার পেছনে শুধু শিক্ষকদের দায়ী করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়া, নিয়মিত উপস্থিতির অভাব, বাল্যবিবাহ, শিক্ষার্থীদের শ্রমে যুক্ত হওয়া, মেধাবী শিক্ষার্থীদের অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে যাওয়া এবং পর্যাপ্ত বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না থাকার মতো বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার পরিবেশ ও পাঠদানের মান উন্নয়নে কার্যকর নজরদারি জরুরি।