মেলবোর্ন, ১১ আগষ্ট: একটা জাতিকে বোমা মেরে শেষ করা যায়। ট্যাংক দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু তার চেয়েও ভয়ংকর একটা মৃত্যু আছে-সেটা হলো সংস্কৃতির মৃত্যু। সংস্কৃতি মুছে গেলে জাতি নিজেই নিজেকে ভুলে যায়। আস্তে আস্তে নিঃশব্দে মরে যায়।
আমরা প্রায়ই বলি “বাংলাদেশ”। কিন্তু বাংলাদেশ বলতে আমরা কী বুঝি? শুধুই কি একটা মানচিত্র? শুধুই কি পদ্মা সেতু আর মেট্রোরেল? না। বাংলাদেশ মানে ভোরবেলার আজান আর শাঁখের শব্দ। বাংলাদেশ মানে বৈশাখের প্রথম বৃষ্টিতে পান্তা-ইলিশ। বাংলাদেশ মানে নকশী কাঁথার প্রতিটা সেলাইয়ে মায়ের গল্প। বাংলাদেশ মানে বাউলের একতারায় “আমি কোথায় পাব তারে”। আজ আমরা উন্নয়নের রাস্তায় অনেক দূর এসেছি। কিন্তু রাস্তা চলতে চলতে নিজের পায়ের নিচের মাটি, নিজের শেকড়টাই ভুলে যাচ্ছি। নিজের গান বাদ দিয়ে K-Pop শুনছি। নিজের ভাত-মাছ ছেড়ে বার্গার-পিজ্জায় অভ্যস্ত হচ্ছি। পেট ভরছে, কিন্তু আত্মা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের সংস্কৃতি আসলে কী?
আমার কাছে বাংলাদেশের সংস্কৃতি দাঁড়িয়ে আছে ৫টি শক্ত স্তম্ভের উপর।
প্রথম স্তম্ভ ভাষা। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি। রক্ত দিয়ে কেনা ভাষা। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন নজির আর একটাও নেই। আমাদের আঞ্চলিক টান, লোকভাষা, প্রবাদ-প্রবচন—এগুলোই আমাদের আসল আইডি কার্ড।
দ্বিতীয় স্তম্ভ লোকসংস্কৃতি। বাউল, ভাটিয়ালি, মুর্শিদি, জারি-সারি। পালাগান, কবিগান, যাত্রাপালা। এগুলো কোনো বিনোদন না। এগুলো মাটির মানুষের সাথে মাটির কথা।
তৃতীয় স্তম্ভ উৎসব ও মেলা। নবান্নের গন্ধ, পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা, পৌষ মেলার বাঁশি, রথের মেলার কোলাহল। মাটির হাঁড়ি, বেতের ঝুড়ি, কাদামাটির পুতুল—এগুলোতেই আমাদের শৈশব।
চতুর্থ স্তম্ভ খাবার ও পোশাক। মাছে-ভাতে বাঙালি। পান্তা-ইলিশ, পিঠা-পুলি, নারকেলের নাড়ু। জামদানি, মসলিন, খাদি। আর সবচেয়ে বড় কথা—”আসেন ভাত খান” বলে ডাকার যে আতিথেয়তা, সেটা আর কোথাও নেই।
আর পঞ্চম স্তম্ভ ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। ১৯৭১। গণসংগীত, দেয়ালের পোস্টার, মুক্তিযোদ্ধার শ্লোগান। “আমার সোনার বাংলা”—এটা শুধু জাতীয় সঙ্গীত না, এটা আমাদের বেঁচে থাকার শপথ।
কিন্তু আজ এই স্তম্ভগুলোতে ফাটল ধরেছে।
প্রথম ক্ষতটা আসছে বিদেশি সংস্কৃতির আগ্রাসন থেকে। নেটফ্লিক্স, টিকটক, কোরিয়ান ড্রামা আমাদের ঘর দখল করেছে। আমাদের ছেলেরা “ভাইয়া” ভুলে “Bro” বলছে। মেয়েরা শাড়ি ছেড়ে জিন্সকে আপন করেছে। দোষ দিচ্ছি না। পৃথিবীর সাথে তাল মেলাতে হবে। কিন্তু নিজের ঘর ভুলে গেলে তো আর হয় না।
দ্বিতীয় ক্ষত বাণিজ্যিকীকরণ। পহেলা বৈশাখ এলেই পান্তা-ইলিশের দাম ৮০০ টাকা। সংস্কৃতি এখন হয়ে গেছে “ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট”। গ্রামের আসল মেলা, গাজীর গান, পুতুল নাচ—এগুলো হারিয়ে যাচ্ছে কর্পোরেট স্পন্সরের ভিড়ে।
আর সবচেয়ে বড় ক্ষত রাষ্ট্রীয় ও পারিবারিক অবহেলা। স্কুলের বইয়ে লালনের গান নেই। টিভিতে যাত্রা নেই। বাবা-মা সন্তানকে বলে “বাবা লোকগান শিখে কী হবে? চাকরি হবে?” ফলাফল কী? আসল শিল্পী না খেয়ে মরে, আর স্টেজ কাঁপানো ভাড়াটে গায়ক কোটি টাকা নিয়ে যায়।
সংস্কৃতি হারালে ক্ষতি কার?
ক্ষতি সবার আগে আমাদের জাতীয় পরিচয়ের। ভাষা না থাকলে বাঙালি কে? জামদানি না থাকলে বাংলাদেশ কে? তখন আমরা হয়ে যাব “দক্ষিণ এশিয়ার আরেকটা দেশ”।
ক্ষতি হবে অর্থনীতির। UNESCO-এর হিসাব বলছে সাংস্কৃতিক শিল্প এখন বিশ্বে ২.২ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজার। ভারত বলিউড দিয়ে ডলার কামাচ্ছে। কোরিয়া K-Pop দিয়ে কামাচ্ছে। আমাদের হাতে আছে লোকগান, জামদানি, নকশীকাঁথা। এগুলো ঠিকমতো ধরতে পারলে এগুলোই হতে পারত আমাদের বড় রপ্তানি পণ্য।
আর সবচেয়ে বড় ক্ষতি মানসিকতার। শেকড় ছাড়া গাছ যেমন বাঁচে না, মানুষও বাঁচে না। আজকের তরুণের ডিপ্রেশন, আত্মপরিচয়ের সংকট—এর মূল কারণ “আমি কে?” এই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া। সংস্কৃতিই দেয় সেই উত্তর।
তাহলে উপায় কী?
আমার মতে এখনই ৫ দফা কর্মসূচি নিতে হবে।
এক. শিক্ষায় সংস্কৃতি বাধ্যতামূলক করতে হবে। ক্লাস ওয়ান থেকে টেন পর্যন্ত “বাংলাদেশ ও সংস্কৃতি” নামে আলাদা বিষয়। প্রতিটা স্কুলে সপ্তাহে একদিন লোকসংগীত আর নকশীকাঁথার ক্লাস।
দুই. “এক জেলা এক ঐতিহ্য” প্রকল্প। টাঙ্গাইলের জামদানি, বিক্রমপুরের পাটশিল্প, সিলেটের বাউল—প্রতিটা জেলার নিজস্ব ঐতিহ্যকে GI সনদ দিয়ে বিশ্ববাজারে নিয়ে যেতে হবে।
তিন. মিডিয়ায় কোটা। সরকারি-বেসরকারি সব টিভি-রেডিওতে ৩০% সময় বাধ্যতামূলকভাবে দেশি সংস্কৃতির জন্য রাখতে হবে। লোকগান, যাত্রা, পালাগান। বিজ্ঞাপনেও দেশি পণ্য।
চার. শিল্পীর সম্মান ও গ্রাম থিয়েটার। প্রতিটা ইউনিয়নে একটা “সাংস্কৃতিক কেন্দ্র”। মাসে অন্তত একটা মেলা। বয়স্ক, অসচ্ছল শিল্পীদের মাসে ১০ হাজার টাকা সম্মানী ভাতা।
পাঁচ. ডিজিটাল আর্কাইভ। “বাংলাদেশ সংস্কৃতি ব্যাংক” নামে একটা জাতীয় আর্কাইভ। যেখানে সব লোকগান, পালা, প্রবাদ ভিডিও করে রাখা হবে। ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে সারা বিশ্বকে দেখানো হবে—আমাদেরও ৫০ বছরের গর্বের ঐতিহ্য আছে।
একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে আমি বলব, পাকিস্তান একবার আমাদের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল। পারে নাই। আজ আমরা নিজেরাই নিজেদের সংস্কৃতি কেড়ে নিচ্ছি। এটা নীরব আগ্রাসন। এর বিরুদ্ধে দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ করতে হবে।
আর একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে বলব, আজকের বাচ্চা লালন চেনে না, জেমস চেনে। দাদুর মুখের রূপকথা শোনে না, মোবাইলের কার্টুন দেখে। সংস্কৃতি না থাকলে পরিবার টেকে না, সমাজ টেকে না। কারণ সংস্কৃতিই তো মানুষকে আসল “মানুষ” বানায়।
শেষে একটা কথাই বলতে হচ্ছে আমাদের উন্নয়ন দরকার। ব্রিজ দরকার। রাস্তা দরকার। কিন্তু ব্রিজের উপর দিয়ে যে মানুষটা হাঁটবে, তার তো একটা পরিচয় লাগবে। সংস্কৃতি মানে অতীতকে আঁকড়ে পড়ে থাকা না। সংস্কৃতি মানে ভবিষ্যতের শক্ত ভিত্তি।
আসুন সবাই মিলে শপথ করি—
“নিজের গান গাইব, নিজের ভাষায় কথা বলব, নিজের ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করব।”
কারণ ২০৪১ সালের স্মার্ট বাংলাদেশ যদি “কালচারলেস” হয়,
তাহলে সেটা বাংলাদেশ হবে না। সেটা হবে শুধুই একটা কোম্পানি।
বাংলাদেশ মানে শেকড়ের বাংলাদেশ।
আর শেকড় বাঁচলেই জাতি বাঁচে।
সরদার সেলিম রেজা
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি : বাংলাদেশ ইতিহাস ঐতিহ্য কেন্দ্র