তিস্তা মহাপরিকল্পনায় যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ, সফরে মার্কিন প্রতিনিধিরা
বাংলাদেশের পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। গত দুই মাসে রংপুর ও তিস্তা অঞ্চল সফর করেছে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি পৃথক প্রতিনিধি দল। বাংলাদেশ পানি…
মুসলিম এক নারী সহপাঠীকে হিন্দু বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে নিষেধ করার প্রতিবাদে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার পর রংপুর সরকারি পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী দেবাশীষ রায়কে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ। পরে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠালে জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রথমে দেবাশীষকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে আটক করা হলেও মামলায় সেব্যাপারে কোন অভিযোগ আনা হয়নি।
গত বৃহস্পতিবার(১০ সেপ্টেম্বর) পুলিশ তাকে আটকের পর শুক্রবার(১১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে আদালত দেবাশীষকে কারাগারে পাঠায়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একাধিক পোস্টে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তোলা হলেও দেবাশীষের বিরুদ্ধে করা মামলার নথিতে ইসলাম ধর্ম অবমাননার কোনো নির্দিষ্ট বক্তব্যের উল্লেখ নেই।
মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণে তাঁকে ভয়ভীতি, গালিগালাজ ও অপমানজনক শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে শান্তিভঙ্গের অভিযোগে রংপুর মহানগরী পুলিশ আইন, ২০১৮-এর ৭৯ ধারায় অভিযুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে দেবাশীষের পরিবার ও সহপাঠীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
দেবাশীষ রায় রংপুর সরকারি পলিটেক্যাল ইনস্টিটিউটের ইলেকট্রিক্যাল বিভাগের অষ্টম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী। তাঁর বাড়ি নীলফামারী সদর উপজেলার লাশবাড়ী ইউনিয়নের খলিশাপচা গ্রামে।
ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে
ঘটনার সূত্রপাত বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর দুপুরে। দেবাশীষের বন্ধুদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁদের বন্ধু মহলের এক মুসলিম ছাত্রীকে একই ক্লাসের আরেক মুসলিম সহপাঠী দেবাশীষসহ কয়েকজন হিন্দু বন্ধুর সঙ্গে মিশতে নিষেধ করেন। বিষয়টি ওই ছাত্রী তাঁর হিন্দু বন্ধুদের জানান। এরপর তাঁরা এর প্রতিবাদ করেন।
বন্ধুদের দাবি, এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে দেবাশীষ নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট দেন। পোস্টটিতে কোনো ধর্মের নাম উল্লেখ করা হয়নি বলে তাঁরা জানান। তবে পোস্টের ভাষা নিয়ে পরে কয়েকজন সহপাঠী ক্ষুব্ধ হন এবং বিষয়টি কলেজ কর্তৃপক্ষকে জানান। তখনই তার বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ আনা হয়।
এরপর বৃহস্পতিবার বিকেলে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কয়েকজন শিক্ষার্থীর বৈঠক হয়। সেখানে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত দেবাশীষকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টার দিকে রংপুর সরকারি পলিটেক্যাল ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষের কার্যালয় থেকে পুলিশ দেবাশীষকে আটক করে নিয়ে যায়। পরদিন শুক্রবার বিকেলে তাঁকে আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাঁর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
দেবাশীষের এক বন্ধু নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তাঁদের পড়াশোনা প্রায় শেষ পর্যায়ে। এতদিন তাঁরা হিন্দু-মুসলিম সবাই মিলে একসঙ্গে পড়াশোনা করেছেন, আড্ডা দিয়েছেন এবং বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে থেকেছেন। হঠাৎ করে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার বিষয়টি তাঁরা বুঝতে পারছেন না।
ওই বন্ধু বলেন, দেবাশীষের ফেসবুক পোস্টে এমন কিছু লেখা হয়নি, যার কারণে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাঁর অভিযোগ, দেবাশীষের কয়েকজন মুসলিম বন্ধুই বিষয়টি নিয়ে তাঁকে ফাঁসিয়েছেন।
ফেসবুকে কি লিখেছিলেন দেবাশীষ?
দেবাশীষের ফেসবুক পোস্টে লেখা ছিল, ‘তোদের পচা ধর্ম আমি পালন করি না। যে একটা মেয়ের সাথে কথা বললে মনে কু চিন্তা আসবে। তোদের আসতে পারে। এই দেবাশীষের আসবে না। কারণ ছোট থেকে আমার পারিবারিক শিক্ষা আমি যথাযথভাবে পেয়েছি। তোরা হয়তো তোদের পারিবারিক শিক্ষা কম পেয়েছিস। এজন্য তোদের মনে কোনো মেয়ের সাথে কথা বললে কু চিন্তা আসে।’
পোস্টটির ভাষা নিয়ে আপত্তি থাকলেও সেখানে কোনো ধর্মের নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। অন্যদিকে, দেবাশীষের বিরুদ্ধে দায়ের করা পুলিশি প্রসিকিউশনের বর্ণনাতেও ইসলাম ধর্ম অবমাননার কোনো নির্দিষ্ট বক্তব্য বা ধর্মীয় অবমাননার উদ্ধৃতি উল্লেখ করা হয়নি।
মামলায় কি বলা আছে?
মামলার বাদী রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতয়ালী থানার উপপরিদর্শক আরাফাত হোসেন। প্রসিকিউশনে বলা হয়েছে, ১০ সেপ্টেম্বর কোতয়ালী থানার জিডি নম্বর ৯৪-এর ভিত্তিতে বিশেষ অভিযান পরিচালনার সময় বিকেল ৪টা ৫০ মিনিটে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে পুলিশ জানতে পারে, রংপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ভেতরে একজন শিক্ষার্থী ভয়ভীতি সৃষ্টি, গালিগালাজ ও অপমানজনক শব্দ ব্যবহার করছেন। এতে এলাকায় শান্তিভঙ্গের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
পুলিশের বর্ণনা অনুযায়ী, খবর পেয়ে পুলিশ সদস্যরা বিকেল ৫টা ১০ মিনিটে ওই প্রতিষ্ঠানে যান। সেখানে অধ্যক্ষের কার্যালয় থেকে দেবাশীষকে আটক করে থানায় নেওয়া হয়। পরে সাক্ষীদের উপস্থিতিতে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি ভয়ভীতিমূলক, গালিগালাজপূর্ণ বা অপমানজনক শব্দ ব্যবহারের কথা স্বীকার করেছেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এর ভিত্তিতে পুলিশ রংপুর মহানগরী পুলিশ আইন, ২০১৮-এর ৭৯ ধারায় অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ আনে এবং একই আইনের ১০২ ধারায় তাঁকে গ্রেপ্তার করে। পরে ১১ সেপ্টেম্বর তাঁর বিরুদ্ধে নন-এফআইআর প্রসিকিউশন নম্বর ৪৪৭/২৬ আদালতে দাখিল করা হয়।
অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অভিযোগ এবং পুলিশের মামলার নথিতে থাকা অভিযোগের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। বাইরে থেকে ঘটনাটিকে ধর্ম অবমাননার মামলা হিসেবে আলোচনা করা হলেও পুলিশের নথিতে যে ধারার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে মূল অভিযোগ হিসেবে শান্তিভঙ্গ, ভয়ভীতি, গালিগালাজ ও অপমানজনক শব্দ ব্যবহারের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
এলাকায় বিক্ষোভ, নিরাপত্তাহীনতায় পরিবার
এদিকে দেবাশীষকে গ্রেপ্তারের খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁর গ্রামের বাড়ি নীলফামারী সদর উপজেলার লাশবাড়ী ইউনিয়নের খলিশাপচা গ্রামে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
শুক্রবার দুপুরের পর দেবাশীষের গ্রামে তাঁর বিচারের দাবিতে তৌহিদী জনতার ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এ ঘটনার পর দেবাশীষের পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন বলে পরিবারটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

শুক্রবার দুপুরের পর দেবাশীষের গ্রামে তাঁর বিচারের দাবিতে তৌহিদী জনতার ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ছবিঃ সংগৃহীত
পরিবার ও স্বজনদের দাবি, একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে বিষয়টি যেভাবে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে পরিণত হয়েছে, তা নিয়ে তাঁরা উদ্বিগ্ন। তাঁদের মতে, ঘটনার শুরুতে কী হয়েছিল, কেন ওই মুসলিম ছাত্রীকে হিন্দু বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে নিষেধ করা হয়েছিল, দেবাশীষের পোস্টের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল এবং তাঁর পোস্টের কারণে আদৌ কোনো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল কি না, সেসব বিষয় নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au