ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই অভিযান শুরু হতে পারে। অভিযানে স্থলভাগে এক লাখের বেশি ইয়েমেনি সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে। তাদের সহায়তায় বিমান হামলা চালাবে সৌদি আরব। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, তুরস্ক ও ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশ বিভিন্ন ধরনের সামরিক ও প্রতিরক্ষামূলক সহায়তা দিচ্ছে রিয়াদকে। তবে এসব মিত্র দেশের সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
সৌদি আরবের সম্ভাব্য এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলীয় এলাকায় হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি ঠেকানো এবং গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালির আশপাশের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করা। এই প্রণালি লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথ এবং এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। সাম্প্রতিক সংঘাতে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ সেখানে আরও শক্তিশালী হওয়ায় সৌদি আরব ও তার মিত্রদের কাছে অঞ্চলটির কৌশলগত গুরুত্ব বেড়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমা দেশগুলোর একাধিক কর্মকর্তা এবং এই প্রস্তুতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাতে বলা হয়েছে, সৌদি আরব সম্ভাব্য অভিযানের দুটি বিকল্প বিবেচনা করছে। প্রথমটি হলো বাব আল-মানদেব প্রণালি ও এর আশপাশে সীমিত আকারে অভিযান চালানো। দ্বিতীয়টি হলো ইয়েমেনের একাধিক অঞ্চলে একই সময়ে বড় ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনা করা। দ্বিতীয় পরিকল্পনায় আল-বায়দা, মারিব, তাইজ ও আল-জাওফ প্রদেশও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
এক লাখের বেশি ইয়েমেনি সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা
সম্ভাব্য অভিযানের স্থলভাগের মূল দায়িত্ব থাকবে সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনীর ওপর। অভিযানের ব্যাপ্তির ওপর নির্ভর করে এক লাখের বেশি ইয়েমেনি সেনা মোতায়েন করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। সৌদি আরব তাদের বিমান হামলা ও অন্যান্য সামরিক সহায়তা দিয়ে সমর্থন করবে।
তবে অভিযান শুরুর নির্দিষ্ট সময় এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ধারণা অনুযায়ী, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেও অভিযান শুরু হতে পারে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরও তা শুরু হতে পারে। ফলে সময় নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।
সৌদি আরব ২০১৫ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছিল। সে সময় হুতিদের বিরুদ্ধে একটি আরব জোটের নেতৃত্ব দিয়েছিল রিয়াদ। ২০২২ সালে দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতির পর সীমান্তে বড় ধরনের সংঘাত অনেকটা কমে আসে। তবে চলতি বছর ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার পর সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ে।
সৌদি আরবে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনি রয়টার্সকে বলেছেন, সম্ভাব্য নতুন অভিযান ২০১৫ সালের মতো ব্যাপক হওয়ার সম্ভাবনা কম। তার মতে, অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে বাব আল-মানদেবের আশপাশের উপকূলীয় অঞ্চল পুনর্দখল করে ওই নৌপথে স্বাভাবিক চলাচল ফিরিয়ে আনা।
সাম্প্রতিক সংঘাতে ব্যাপক হামলা
সৌদি আরবের বড় অভিযানের প্রস্তুতির মধ্যেই ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে সরকারি বাহিনীর বিমান হামলা জোরদার হয়েছে। ইয়েমেনি বাহিনীর দাবি, গত কয়েক দিনে হুতিদের বিভিন্ন অবস্থানে শত শত বিমান হামলা চালানো হয়েছে। তাদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এক দফায় ৪৭৪টি বিমান হামলায় প্রায় ১ হাজার ৫৪০ হুতি যোদ্ধা হতাহত হয়েছেন এবং ২১৬টি সামরিক যান ও বিভিন্ন সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস হয়েছে।
এরপর তাইজ অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় আরও ৭১টি হামলার কথাও জানিয়েছে ইয়েমেনি বাহিনী। তবে এসব হতাহতের সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে হুতিরাও সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনা ও এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের আসির অঞ্চলের আহাদ রাফিদাহ এলাকায় হুতিদের একটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে। নাজরান শহরের একটি স্কুলেও হুতিদের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। এসব ঘটনায় হতাহতের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নিয়েও হামলার আশঙ্কা বাড়ছে। আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের মতে, হুতিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষা করা সম্ভাব্য অভিযানের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
পাশে যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক ও পাকিস্তান
হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক তৎপরতায় সৌদি আরবকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করছে যুক্তরাষ্ট্র। একজন পশ্চিমা কূটনীতিকের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, ইয়েমেনে সৌদি বিমান হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা তথ্য এবং লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তা দিচ্ছে। তবে ওয়াশিংটনের সামরিক সহায়তার পরিধি সীমিত থাকতে পারে।
সৌদি আরব গত মাসে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে। এই চুক্তির আওতায় তিন দেশ পরস্পরের নিরাপত্তাকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ সম্প্রতি বলেছেন, সৌদি আরবের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন হলে পাকিস্তান তার সামরিক সক্ষমতা ব্যবহার করবে।
পাকিস্তানের কর্মকর্তাদের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, গত মাসে পাকিস্তান চারটি কার্গো উড়োজাহাজে করে ইয়েমেনের এডেনে বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, হালকা গোলাবারুদ, ড্রোন এবং ড্রোন প্রতিরোধী সরঞ্জাম পাঠিয়েছে। এডেন সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা গুরুত্বপূর্ণ শহর।
এ ছাড়া পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তারাও সৌদি বাহিনীর সঙ্গে কাজ করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। পাকিস্তান সৌদি আরবের স্থলসীমা রক্ষায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার সেনা মোতায়েন করেছে বলেও একজন পাকিস্তানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন। এসব সেনা সৌদি আরবের সীমান্ত প্রতিরক্ষা এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কাজে সহায়তা করছে। তবে ইয়েমেনের ভেতরে যুদ্ধ করার জন্য পাকিস্তানি সেনা পাঠানোর কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
সৌদি আরবের আগে কেনা তুরস্কের তৈরি ড্রোনও ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে পাকিস্তানি ও আঞ্চলিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। পাশাপাশি সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ ইয়ানবু বন্দর রক্ষায় প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও সেনা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্স।
বাব আল-মানদেব কেন গুরুত্বপূর্ণ
সৌদি আরবের সম্ভাব্য অভিযানের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাব আল-মানদেব প্রণালি। লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত এই জলপথটি এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্যিক নৌ চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ পথ। বিশেষ করে সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপের সঙ্গে এশিয়ার বাণিজ্যিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অনেক।
বর্তমান আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় লোহিত সাগরের বিকল্প নৌপথ হিসেবে বাব আল-মানদেবের গুরুত্ব আরও বেড়েছে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কোনো একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে থাকা সৌদি আরব ও তার মিত্রদের জন্য বড় কৌশলগত উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
রয়টার্সের সূত্রগুলোর মতে, হুতিদের নিয়ন্ত্রণে বাব আল-মানদেব থাকা অবস্থায় সৌদি আরব নতুন করে তাদের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় বসতে অনিচ্ছুক। কারণ, এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ হুতিদের আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বড় ধরনের কৌশলগত প্রভাব তৈরি করতে পারে।
ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের ওপর বাড়ছে চাপ
সৌদি আরব ও হুতিদের সংঘাতের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের ওপর। দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি ও খাদ্যসংকটের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় দেশটির মানবিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি বা ডব্লিউএফপি জানিয়েছে, ইয়েমেনের সরকারনিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে প্রতি চার পরিবারের প্রায় তিনটি পরিবার খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, এসব এলাকায় বসবাসকারী প্রায় ১ কোটি মানুষের মধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষ খাদ্যের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারছেন না। নতুন সংঘাতে হাজারো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাও ব্যাহত হয়েছে।
ডব্লিউএফপি আরও সতর্ক করেছে, নতুন করে বাস্তুচ্যুত প্রায় ১ লাখ ৫২ হাজার মানুষকে সহায়তা এবং আগে থেকেই সহায়তা পাওয়া প্রায় ১৪ লাখ মানুষের খাদ্য সহায়তা অব্যাহত রাখতে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন। সংস্থাটি জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় অর্থ না পেলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই খাদ্য সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।
স্থলবাহিনীর সক্ষমতাই বড় প্রশ্ন
সম্ভাব্য সৌদি অভিযানের ফল অনেকটাই নির্ভর করবে ইয়েমেনের বিভিন্ন হুতি-বিরোধী বাহিনীর সমন্বয় ও যুদ্ধক্ষমতার ওপর। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে এসব বাহিনীকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের সংঘাতে হুতি-বিরোধী বাহিনীগুলোর মধ্যে বিভাজনও তৈরি হয়েছে।
ইয়েমেন বিশ্লেষক মোহাম্মদ আলবাশার রয়টার্সকে বলেছেন, হুতিদের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি অভিযান পরিচালনার জন্য অনেক হুতি-বিরোধী বাহিনী এখনো পর্যাপ্তভাবে সংগঠিত বা প্রস্তুত নয়। একই সময়ে হুতিরা একাধিক ফ্রন্টে চাপ সৃষ্টি করছে।
সৌদি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলী শিহাবিও বলেছেন, সম্ভাব্য অভিযানের ফল অনেকটাই নির্ভর করবে ইয়েমেনের স্থলবাহিনীর সক্ষমতা ও কার্যকারিতার ওপর। এখন পর্যন্ত তাদের প্রধান মনোযোগ ছিল নিজেদের অবস্থান ধরে রাখা ও ফ্রন্ট স্থিতিশীল রাখা। সম্ভাব্য নতুন অভিযানে তাদের আক্রমণাত্মক ভূমিকায় যেতে হবে।
এদিকে সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনা, বন্দর ও অন্যান্য অবকাঠামো হুতিদের পাল্টা হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ফলে রিয়াদের সামনে একদিকে বাব আল-মানদেব ও ইয়েমেনের উপকূলীয় অঞ্চল পুনর্দখলের সামরিক লক্ষ্য, অন্যদিকে নিজেদের ভূখণ্ড ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষার চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
সূত্রঃ রয়টার্স