আসন্ন বড় খাদ্য সংকটের জন্য কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সতর্ক করে বলেছেন, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই বিশ্ব বড় ধরনের খাদ্য সংকটের মুখে পড়তে পারে। যুদ্ধ, জ্বালানি ও সার সরবরাহে চাপ,…
আজ ৫ অক্টোবর ২০২৬। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আজ শিক্ষকের অবদান স্মরণ করা হচ্ছে। শিক্ষক দিবসের আন্তর্জাতিক প্রতিপাদ্য ‘শিক্ষকদের পাশে: পেশা সুরক্ষা, এর মর্যাদা বৃদ্ধি এবং আমাদের ভবিষ্যৎ গড়ার ৬০ বছর’। প্রতিপাদ্যের তিনটি অংশ তিন ধরনের দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রথম অংশ- রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে শিক্ষকের নিরাপত্তার দাবি জানায়। দ্বিতীয় অংশ- পেশার সামাজিক স্বীকৃতির প্রশ্ন তোলে। তৃতীয় অংশ- শিক্ষকের হাতে গড়ে ওঠা ভবিষ্যতের প্রতি আমাদের দৃষ্টি ফেরায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে আমি আজ প্রতিপাদ্যের কথাগুলো নিজেদের পেশার আয়নায় দেখতে চাই। সহকর্মীদের পক্ষ থেকে যেমন কথা বলব, তেমনি নিজেদের দায়িত্বের জায়গাগুলোও খোলাখুলি আলোচনা করব। আমার আলোচনায় থাকবে দিবসের উৎপত্তি, ১৯৬৬ ও ১৯৯৭ সালের আন্তর্জাতিক সুপারিশ, শিক্ষক সংকটের বৈশ্বিক চিত্র, শিক্ষকের বহুমুখী ভূমিকা, প্রযুক্তির নতুন বাস্তবতা এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট। শেষে থাকবে শিক্ষকের পাশে দাঁড়ানোর জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট করণীয়।
চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিচারক, বিজ্ঞানী, প্রশাসক, কৃষিবিদ ও শিল্পী, সবার জীবনের শুরুতে শিক্ষক আছেন। মানবসভ্যতার ইতিহাসে শিক্ষকের স্থান সব যুগে কেন্দ্রে ছিল। প্রাচীন গ্রিসে সক্রেটিস প্রশ্ন করার মাধ্যমে শিষ্যদের চিন্তা করতে শিখিয়েছেন। চীনের কনফুসিয়াস শিক্ষা ও নৈতিকতাকে সমাজ গঠনের ভিত্তি বলে মনে করতেন। আমাদের উপমহাদেশে জ্ঞান বহু শতাব্দী ধরে গুরু-শিষ্য পরম্পরা, টোল, চতুষ্পাঠী, মক্তব ও মাদ্রাসার মাধ্যমে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে পৌঁছেছে। সময়ের সঙ্গে শ্রেণিকক্ষের চেহারা বদলেছে, কিন্তু শিক্ষকের মূল দায়িত্ব বদলায়নি। তিনি জ্ঞান দেন, প্রশ্ন করতে শেখান এবং মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলেন। রাষ্ট্রের উন্নয়ন, অর্থনীতির শক্তি ও সমাজের চরিত্র শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে শিক্ষার মানের ওপর। শিক্ষার মান নির্ভর করে শিক্ষকের যোগ্যতা, মনোবল ও সামাজিক মর্যাদার ওপর।
বিশ্ববিদ্যালয়ে দাঁড়িয়ে ভিন্ন সত্য আমরা প্রতিদিন অনুভব করি। আমাদের শ্রেণিকক্ষে যে শিক্ষার্থীরা আসে, তাদের ভিত্তি তৈরি হয়েছে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের হাতে। বর্ণমালা চেনানো, পড়তে ও লিখতে শেখানো, অঙ্কের প্রথম পাঠ দেওয়া এবং নৈতিকতার প্রথম শিক্ষা দেওয়ার কাজ তাঁরাই করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধা, গবেষণার সাফল্য ও পেশাজীবীদের দক্ষতা অনেকাংশে সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তাই শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান প্রথমে আমাদের নিজেদের কাছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষা-শৃঙ্খলের দুটি অংশ। যে কোনো অংশ দুর্বল হলে পুরো শৃঙ্খল দুর্বল হয়। ইউনেসকো বারবার বলেছে, শিক্ষকের ওপর বিনিয়োগ শিক্ষার ভবিষ্যতে বিনিয়োগ। এর অর্থ সমাজের ভবিষ্যতে বিনিয়োগ।
প্রতিপাদ্য শুরু হয়েছে ‘শিক্ষকদের পাশে’ কথাটি দিয়ে। এর অর্থ সংহতি, সহযোগিতা ও দায়িত্ববোধ। শিক্ষক বছরের পর বছর শিক্ষার্থীর পাশে থাকেন। তাঁর ক্লান্তি, সংকট ও প্রত্যাশার সময় সমাজ ও রাষ্ট্রের তাঁর পাশে থাকার কথা। এবারের প্রতিপাদ্য সে প্রত্যাশাকে স্পষ্ট ভাষায় উচ্চারণ করেছে। আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়, জাতীয় সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অভিভাবক ও নাগরিক সমাজ, সবাইকে এ আহ্বানের অংশীদার হতে হবে। প্রতিপাদ্যে ‘ষাট বছর’ কথাটি ১৯৬৬ সালে গৃহীত শিক্ষকদের মর্যাদা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সুপারিশের ষাট বছর পূর্তির দিকে ইঙ্গিত করে। অর্থাৎ ষাট বছরের পথচলার হিসাব নেওয়ার আহ্বান এতে আছে। কী অর্জিত হয়েছে, কী বাকি আছে এবং আগামী দশকে কোন পথে এগোতে হবে, এ প্রশ্নগুলোর জবাব খোঁজার সময় এখন।
প্রতিপাদ্যের তিনটি অংশ তিন স্তম্ভের মতো। প্রথম স্তম্ভ ‘পেশা সুরক্ষা’, যার মধ্যে আছে চাকরির নিরাপত্তা, ন্যায্য বেতন, সুস্থ কর্মপরিবেশ ও পেশাগত স্বাধীনতা। দ্বিতীয় স্তম্ভ ‘মর্যাদা বৃদ্ধি’, যার মধ্যে আছে সামাজিক স্বীকৃতি, প্রশিক্ষণের মান, পেশাগত উন্নতির সুযোগ এবং নীতিনির্ধারণে শিক্ষকের কণ্ঠস্বর। তৃতীয় স্তম্ভ ‘ভবিষ্যৎ গড়া’, যা শিক্ষকের সবচেয়ে বড় ভ‚মিকা। আজকের শিক্ষার্থীরা আগামী দিনের নাগরিক, গবেষক, উদ্যোক্তা ও নেতা। তাদের চিন্তা, মূল্যবোধ ও দক্ষতা শিক্ষকের হাতেই গড়ে ওঠে। তিন স্তম্ভ পরস্পর যুক্ত। পেশা সুরক্ষিত না হলে মর্যাদা বাড়ে না। মর্যাদা না বাড়লে মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসেন না। দক্ষ শিক্ষক না থাকলে ভবিষ্যৎ নির্মাণ অসম্পূর্ণ থাকে। প্রতিটি স্তম্ভ ভেঙে পড়লে বাকি দুটিও টলে যায়।
ইংরেজি পাঠের স্ট্যাটাস’ শব্দটিও গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬৬ সালের মূল দলিলের নাম ‘রেকমেন্ডেশন কনসার্নিং দ্য স্ট্যাটাস অব টিচার্স’। অর্থাৎ প্রতিপাদ্যে মূল দলিলের শব্দ ফিরে এসেছে। প্রতিপাদ্য আমাদের সেই দলিলের কাছে ফিরে যেতে বলছে। প্রশ্ন সরল, কিন্তু উত্তর সহজ নয়: ষাট বছর পর দলিলের প্রতিশ্রুতি কতটা পূরণ হয়েছে? বেতন, নিয়োগ, কর্মঘণ্টা, প্রশিক্ষণ ও পেশাগত স্বাধীনতার যে মানদণ্ড দলিল নির্ধারণ করেছিল, আজ বিশ্বের কত দেশ তা অনুসরণ করছে? বাংলাদেশের শিক্ষকেরা এ মানদণ্ডের কোন জায়গায় আছেন? এ প্রশ্নগুলো এড়িয়ে গেলে দিবস উদযাপন আনুষ্ঠানিকতায় আটকে যায়।
শিক্ষক দিবসের উৎপত্তি বুঝতে ১৯৬৬ সালে ফিরতে হবে। সে বছরের ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ অক্টোবর ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ‘শিক্ষকদের মর্যাদা বিষয়ক বিশেষ আন্তঃসরকার সম্মেলন’ অনুষ্ঠিত হয়। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেসকো আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বা আইএলও-র সহযোগিতায় সম্মেলনের আয়োজন করে। বিভিন্ন দেশের সরকারি প্রতিনিধি, শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষক সংগঠনের প্রতিনিধিরা সম্মেলনে অংশ নেন। সম্মেলনের শেষ দিন ৫ অক্টোবর ‘শিক্ষকদের মর্যাদা সংক্রান্ত সুপারিশ’ গৃহীত হয়। শিক্ষকের অধিকার, দায়িত্ব, প্রস্তুতি, নিয়োগ, কর্মপরিবেশ ও সামাজিক অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এটি প্রথম পূর্ণাঙ্গ নীতিদলিল। এর আগে শিক্ষকের পেশাগত অবস্থান নিয়ে এত বিস্তৃত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ছিল না।
সুপারিশ গৃহীত হওয়ার আটাশ বছর পর, ১৯৯৪ সালে ৫ অক্টোবর প্রথমবার বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে পালিত হয়। দিবস নির্ধারণের উদ্দেশ্য ছিল ১৯৬৬ সালের সুপারিশকে বিশ্বজুড়ে স্মরণে রাখা এবং শিক্ষকের প্রশ্নে সরকার ও সমাজের মনোযোগ ধরে রাখা। দিবস উদযাপনে ইউনেসকো, আইএলও, ইউনিসেফ ও ইউএনডিপি যৌথভাবে কাজ করে। শিক্ষক সংগঠনগুলোর বৈশ্বিক ফেডারেশন এডুকেশন ইন্টারন্যাশনালও এতে যুক্ত। সংগঠনটি ১৯৯৩ সালে গঠিত হয়েছে এবং বিশ্বের শতাধিক দেশের শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর প্রতিনিধিত্ব করে। প্রতিবছর দিবসের জন্য নতুন প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়। প্রতিপাদ্যগুলোর দিকে তাকালে শিক্ষাভাবনার বিবর্তন বোঝা যায়। ২০২২ সালে বলা হয়েছিল, শিক্ষার রূপান্তর শুরু হয় শিক্ষক থেকে। ২০২৩ সালে বৈশ্বিক শিক্ষক ঘাটতি কাটানোর ওপর জোর দেওয়া হয়। ২০২৪ সালে শিক্ষকের কণ্ঠস্বরের মূল্যায়ন এবং শিক্ষার নতুন সামাজিক চুক্তির কথা আসে। ২০২৫ সালে শিক্ষকতাকে সহযোগিতামূলক পেশা হিসেবে নতুনভাবে গড়ার আহ্বান জানানো হয়। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য সে ধারাবাহিকতার সঙ্গে ষাট বছরের অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন যুক্ত করেছে।
অনেক দেশে জাতীয় শিক্ষক দিবসও আছে। ভারতে ৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবস, যা শিক্ষাবিদ ও রাষ্ট্রপতি সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের জন্মদিন। চীনে ১৯৮৫ সাল থেকে ১০ সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবস পালিত হয়। ভিয়েতনামে ২০ নভেম্বর শিক্ষকদের স্মরণ করা হয়। তারিখ ভিন্ন হলেও বার্তা সমান: শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। ৫ অক্টোবরের বিশেষত্ব হলো, এ তারিখ শিক্ষকের মর্যাদার আন্তর্জাতিক দলিলের সঙ্গে যুক্ত। তাই দিবসটি সব দেশের শিক্ষকের জন্য প্রযোজ্য। দিবসের চরিত্রও দ্বিমুখী। আনন্দ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন এটি, আবার আত্মমূল্যায়নেরও দিন। শিক্ষকের জন্য নীতি তৈরি হচ্ছে কি না, সে নীতি বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না এবং শিক্ষকের সংখ্যা ও মান বাড়ছে কি না, এসব প্রশ্ন দিবসে উঠে আসে।
১৯৬৬ সালের সুপারিশ শিক্ষকতাকে স্পষ্টভাবে পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। দলিলে বলা হয়েছে, শিক্ষকতা জনসেবার ধরন। এর জন্য কঠোর ও ধারাবাহিক অধ্যয়নের মাধ্যমে অর্জিত বিশেষজ্ঞ জ্ঞান ও বিশেষ দক্ষতা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীর শিক্ষা ও কল্যাণের ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত দায়িত্বও শিক্ষকের ওপর বর্তায়। এ স্বীকৃতির গুরুত্ব অনেক। শিক্ষকতা তখন শুধু দয়া বা সেবার কাজ থাকে না, বিশেষ যোগ্যতাসম্পন্ন পেশায় পরিণত হয়। পেশা হিসেবে স্বীকৃত হলে ন্যায্য পারিশ্রমিক, প্রশিক্ষণ, পদোন্নতি ও পেশাগত স্বাধীনতার দাবিও যুক্তিসংগত হয়। দলিলের মূল দর্শন হলো, শিক্ষকের মর্যাদা ও শিক্ষার মান পরস্পর যুক্ত। শিক্ষকের অবস্থান দুর্বল থাকলে শিক্ষার মান উন্নত করা সম্ভব নয়।
দলিলের বিষয়বস্তু বিস্তৃত। এতে শিক্ষার লক্ষ্য ও নীতি, শিক্ষক প্রস্তুতি, পেশায় প্রবেশ ও পদোন্নতি, চাকরির নিরাপত্তা, শিক্ষকের অধিকার ও দায়িত্ব, কার্যকর পাঠদানের উপযোগী পরিবেশ, বেতন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং শিক্ষক সংকট মোকাবিলার বিষয়ে আলাদা অধ্যায় আছে। বেতন শিক্ষকতার সামাজিক গুরুত্ব প্রতিফলিত করবে এবং সমান যোগ্যতার অন্য পেশার সঙ্গে তুলনীয় হবে, এ নীতি দলিলে স্পষ্ট। কর্মঘণ্টা ও শ্রেণির আকার এমন হওয়া উচিত, যাতে শিক্ষক যত্নের সঙ্গে পাঠদান করতে পারেন। পেশাগত স্বাধীনতার বিষয়েও দলিল স্পষ্ট। শিক্ষক পাঠ্যপুস্তক নির্বাচন, শিক্ষণ পদ্ধতি ও শিক্ষাক্রম উন্নয়নে মতামত দেওয়ার সুযোগ পাবেন। বেতন ও কর্মশর্ত নিয়ে শিক্ষক সংগঠনের সঙ্গে আলোচনার ব্যবস্থাও সুপারিশের অংশ। শিক্ষকের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা সুবিধা ও অবসরকালীন সুবিধার কথাও দলিলে এসেছে।
দলিল শুধু অধিকারের কথা বলেনি, দায়িত্বের কথাও বলেছে। শিক্ষকের নৈতিক আচরণ, পেশাগত মান রক্ষা, শিক্ষার্থীর প্রতি ন্যায্য আচরণ এবং নিরন্তর পেশাগত উন্নয়নের প্রত্যাশা সুপারিশে আছে। অধিকার ও দায়িত্বের এ ভারসাম্য দলিলকে বাস্তবসম্মত করেছে। সুপারিশটি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক চুক্তি নয়, অর্থাৎ কোনো রাষ্ট্র অনুসরণ না করলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই। তবু এটি নৈতিক ও নীতিগত মানদণ্ড হিসেবে কাজ করে। বহু দেশের শিক্ষানীতি, শ্রম আইন, শিক্ষক নিয়োগ বিধি ও শিক্ষক সংগঠনের দাবিতে দলিলের প্রভাব দেখা যায়। ষাট বছর ধরে দলিলটি শিক্ষকের মর্যাদা নিয়ে যে কোনো আলোচনার মূল রেফারেন্স হয়ে আছে।
আমাদের পেশার জন্য সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক দলিল ১৯৯৭ সালের ১১ নভেম্বর ইউনেসকোর সাধারণ সম্মেলনে গৃহীত ‘উচ্চশিক্ষার শিক্ষকদের মর্যাদা সংক্রান্ত সুপারিশ’। ১৯৬৬ সালের সুপারিশ প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকের জন্য প্রণীত হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকের বিশেষ চরিত্র বিবেচনায় ১৯৯৭ সালের দলিল তাকে পরিপূরণ করেছে। দলিলে বলা হয়েছে, উচ্চশিক্ষার শিক্ষক জ্ঞান সৃষ্টি, সংরক্ষণ ও বিতরণের দায়িত্ব পালন করেন। এ দায়িত্ব পালনের জন্য তাঁর প্রয়োজন শিক্ষাগত স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গবেষণার অধিকার এবং প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন। কর্মকালের নিরাপত্তা, যৌথ ব্যবস্থাপনায় অংশগ্রহণ এবং শিক্ষক সংগঠনে যুক্ত হওয়ার অধিকারের কথাও দলিলে আছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সমাজের প্রশ্ন করার জায়গা। শিক্ষক যদি ভয় বা চাপের মধ্যে গবেষণা করেন, পাঠদান করেন বা মত প্রকাশ করেন, সমাজ স্বাধীন জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হয়। তাই ১৯৯৭ সালের দলিল শিক্ষাগত স্বাধীনতাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। তবে স্বাধীনতার সঙ্গে দায়বদ্ধতাও যুক্ত। গবেষণায় সততা, তথ্যসূত্র উল্লেখে স্বচ্ছতা, পেশাগত নৈতিকতা এবং শিক্ষার্থীর প্রতি নিরপেক্ষ আচরণ ছাড়া শিক্ষাগত স্বাধীনতার মর্যাদা টেকে না। স্বাধীনতা ও দায়িত্ব পরস্পরের পরিপূরক, বিরোধী নয়।
সুপারিশ দুটি কার্যকর হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণের জন্য ১৯৬৭ সালে আইএলও ও ইউনেসকো যৌথ বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে। কমিটির নাম ‘শিক্ষকদের বিষয়ে সুপারিশমালার বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত আইএলও-ইউনেসকো যৌথ বিশেষজ্ঞ কমিটি’, সংক্ষেপে সিয়ার্ট । কমিটি সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এবং শিক্ষক সংগঠনের অভিযোগ বিবেচনা করে। শিক্ষকের অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এলে কমিটি তা খতিয়ে দেখে এবং সংশ্লিষ্ট সরকারকে সুপারিশ জানায়। এর ফলে শিক্ষকের মর্যাদার প্রশ্ন ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় এসেছে। দুটি সুপারিশ মিলিয়ে প্রাক-প্রাথমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সব স্তরের শিক্ষকের জন্য আন্তর্জাতিক কাঠামো গড়ে উঠেছে।
পেশা সুরক্ষার অর্থ শিক্ষকের নিয়োগ, চাকরির স্থায়িত্ব, বেতন, পদোন্নতি, প্রশিক্ষণ ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা। শিক্ষক অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকলে শিক্ষার্থীর বিকাশে পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারেন না। বেতন যথাসময়ে না পেলে, চাকরির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত থাকলে বা কর্মস্থলে নিরাপত্তা না থাকলে শিক্ষকের মনোবল ক্ষয় হয়। শিক্ষকের মনোবল সরাসরি শিক্ষার্থীর শেখার মানে প্রভাব ফেলে। পেশা সুরক্ষা তাই শিক্ষকের ব্যক্তিগত সুবিধার প্রশ্ন নয়, শিক্ষার্থীর শিক্ষার অধিকার রক্ষারও প্রশ্ন।
পেশা সুরক্ষার প্রথম শর্ত ন্যায্য পারিশ্রমিক। ইউনেসকোর ২০২৪ সালের বৈশ্বিক শিক্ষক প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বহু দেশে শিক্ষকেরা সমান যোগ্যতার অন্য পেশাজীবীর তুলনায় কম আয় করেন। এতে প্রতিভাবান তরুণেরা শিক্ষকতা বেছে নিতে নিরুৎসাহিত হন। যাঁরা পেশায় আসেন, তাঁদের অনেকেও পরে ছেড়ে যান। প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রাথমিক স্তরের শিক্ষকদের পেশা ছাড়ার হার ২০১৫ সালে ছিল ৪ দশমিক ৬ শতাংশের কাছাকাছি। ২০২২ সালে তা বেড়ে প্রায় ৯ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ সাত বছরে হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এ প্রবণতা শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য সতর্কসংকেত। প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ শিক্ষক চলে গেলে তাঁর জায়গা পূরণে সময় ও অর্থ দুটিই লাগে, আর এ ক্ষতির মূল্য দেয় শিক্ষার্থী।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের পেশা সুরক্ষার সঙ্গে আরও কিছু বিষয় যুক্ত। গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার ও আধুনিক পরীক্ষাগার, আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রবেশাধিকার এবং সম্মেলনে অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত না হলে গবেষণার মান ধরে রাখা কঠিন। নিয়মিত পদোন্নতি, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং সময়মতো বেতন-ভাতা পেশার নিরাপত্তার ভিত্তি। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হলে প্রত্যেকের শিখন মূল্যায়ন, গবেষণা তত্ত্বাবধান ও ব্যক্তিগত পরামর্শদান কঠিন হয়। পাঠদান ও গবেষণার পাশাপাশি প্রশাসনিক দায়িত্বের চাপ শিক্ষকের সময় কমিয়ে দেয়। শিক্ষকের মানসিক স্বাস্থ্যও এখন বৈশ্বিক আলোচনার অংশ। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, ফলাফলের চাপ এবং সামাজিক প্রত্যাশা ক্লান্তি তৈরি করে, যা শিক্ষকের কর্মক্ষমতা ও শিক্ষার্থীর সঙ্গে সম্পর্ক দুটিকেই প্রভাবিত করে।
শিক্ষাগত স্বাধীনতার সুরক্ষাও পেশা সুরক্ষার অংশ। শিক্ষক নির্ভয়ে প্রশ্ন করবেন, গবেষণা করবেন এবং যুক্তি দিয়ে মতভেদ প্রকাশ করবেন, এ পরিবেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ। প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, স্বচ্ছ নিয়োগ ও পদোন্নতির কাঠামো এ স্বাধীনতাকে নিরাপদ রাখে। বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের কাঠামো সংশ্লিষ্ট আইন ও অধ্যাদেশে নির্ধারিত। এ কাঠামোর মধ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বজায় থাকলে শিক্ষকের স্বাধীনতা ও প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা দুটিই সুরক্ষিত হয়। সংঘাত ও দুর্যোগ-কবলিত অঞ্চলে শিক্ষকেরা আরও কঠিন বাস্তবতায় কাজ করেন। যুদ্ধ, জলবায়ুজনিত বিপর্যয় বা বাস্তুচ্যুতির মধ্যে অনেক শিক্ষক বেতন ও নিরাপত্তা ছাড়াই শিক্ষার্থীদের পাশে থাকেন। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়ের সম্মিলিত দায়িত্ব।
মর্যাদা শুধু বেতনের প্রশ্ন নয়। সমাজ শিক্ষককে কীভাবে দেখে, সে দৃষ্টিভঙ্গিও মর্যাদার অংশ। যে সমাজ শিক্ষককে সম্মান করে, সে সমাজ জ্ঞানকে মূল্য দেয়। মর্যাদা বাড়লে পেশাটি আকর্ষণীয় হয়, মেধাবী তরুণেরা শিক্ষকতায় আসেন এবং শিক্ষার মান বাড়ে। মর্যাদা কমে গেলে ঘটে উল্টো ঘটনা। মেধাবীরা অন্য পেশায় চলে যান, শিক্ষকের আত্মবিশ্বাস কমে এবং শ্রেণিকক্ষের গুণমান নেমে যায়। সুতরাং মর্যাদা বৃদ্ধি শিক্ষকের প্রতি সৌজন্যের বিষয় নয়, শিক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতার শর্ত।
মর্যাদা বৃদ্ধির প্রথম ধাপ শিক্ষকের প্রস্তুতি। বিদ্যালয়ের শিক্ষকের জন্য মানসম্মত প্রাক-সেবা প্রশিক্ষণ ও চাকরিকালীন প্রশিক্ষণ জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের ক্ষেত্রেও পাঠদান-কৌশল, মূল্যায়ন-পদ্ধতি ও গবেষণা-পদ্ধতির নিয়মিত প্রশিক্ষণ দরকার। আমরা অনেক সময় ধরে নিই, বিষয়জ্ঞান থাকলেই ভালো পাঠদান সম্ভব। বাস্তবে শেখানোর কৌশল আলাদা দক্ষতা, যা চর্চার মাধ্যমে অর্জন করতে হয়। স্পষ্ট ক্যারিয়ার কাঠামো থাকলে শিক্ষক নিজের পেশাগত উন্নতির পথ দেখতে পান। ভালো কাজের স্বীকৃতি এবং পদোন্নতির সুযোগ তাঁকে উৎসাহ দেয়। সহকর্মীর কাছ থেকে শেখা, পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে মতামত পাওয়া এবং অভিজ্ঞ শিক্ষকের কাছে পরামর্শ নেওয়ার সংস্কৃতিও পেশাগত মান বাড়ায়।
দ্বিতীয় ধাপ শিক্ষকের কণ্ঠস্বর। শিক্ষাক্রম, পাঠ্যবই, মূল্যায়ন পদ্ধতি, গবেষণা-নীতি ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সিদ্ধান্তে শিক্ষকের মতামত নেওয়া হলে সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত হয়। যাঁরা প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে কাজ করেন, তাঁরা জানেন কোন পদ্ধতি শিক্ষার্থীর জন্য কার্যকর। তাঁদের অভিজ্ঞতা উপেক্ষা করে তৈরি নীতি অনেক সময় কাগজে থেকে যায়। শিক্ষক তখন নিজেকে সংস্কারের অংশীদার মনে করেন, সংস্কারের নির্দেশ বাস্তবায়নের কর্মী মনে করেন না। জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে গঠিত শিক্ষকতা পেশা বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের প্যানেল ২০২৪ সালে তাদের সুপারিশ প্রকাশ করেছে। সেখানে শিক্ষকের অংশগ্রহণ, পেশাগত উন্নয়ন, কর্মপরিবেশের উন্নতি ও পেশার আকর্ষণ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
তৃতীয় ধাপ নারী শিক্ষকের অবদানের স্বীকৃতি। ইউনেসকোর তথ্য অনুযায়ী বিশ্বে প্রাক-প্রাথমিক স্তরের শিক্ষকদের প্রায় সবাই নারী, প্রাথমিক স্তরে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ নারী। অথচ উচ্চশিক্ষা স্তরে নারী শিক্ষকের হার অর্ধেকের কম, আর প্রতিষ্ঠান-নেতৃত্বে তাঁদের উপস্থিতি আরও সীমিত। নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সমান সুযোগ, মাতৃত্বকালীন সহায়তা ও নেতৃত্বের পথ খুলে দেওয়া মর্যাদা বৃদ্ধির জরুরি পদক্ষেপ। নারী শিক্ষক ছাত্রীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। তাঁদের উপস্থিতি মেয়েদের শিক্ষায় থাকার সম্ভাবনাও বাড়ায়।
চতুর্থ ধাপ সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি। শিক্ষককে শুধু পরীক্ষার ফলের দায়ী ব্যক্তি হিসেবে দেখলে তাঁর ভ‚মিকা ছোট হয়ে যায়। শিক্ষার্থীর সাফল্যে শিক্ষকের অবদান যেমন স্বীকার করতে হবে, তেমনি চরিত্র গঠনে পরিবার, সমাজ ও গণমাধ্যমের দায়ও মনে রাখতে হবে। অভিভাবক ও নীতিনির্ধারকেরা শিক্ষককে সহযোগী হিসেবে দেখলে মর্যাদা বাড়ে। গণমাধ্যম শিক্ষকের সাফল্যের গল্প তুলে ধরে এবং শিক্ষকের সমস্যা দায়িত্বশীলভাবে প্রকাশ করে সমাজে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে। শিক্ষার্থীর মুখে শিক্ষকের প্রতি সম্মান, অভিভাবকের আচরণে শিক্ষকের প্রতি আস্থা এবং রাষ্ট্রীয় সম্মাননা মিলেই মর্যাদার সামাজিক পরিবেশ তৈরি হয়।
বর্তমান বিশ্বে শিক্ষার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে শিক্ষকের ঘাটতি অন্যতম। ইউনেসকোর ২০২৪ সালের বৈশ্বিক শিক্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে বিশ্বে প্রায় ৪ কোটি ৪০ লক্ষ অতিরিক্ত শিক্ষক প্রয়োজন। সাব-সাহারান আফ্রিকায় চাহিদা সবচেয়ে বেশি, প্রায় ১ কোটি ৫০ লক্ষ। সেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, কিন্তু শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের সক্ষমতা সমান গতিতে বাড়ছে না। বিশ্বে প্রায় ২৫ কোটি শিশু ও কিশোর এখনো বিদ্যালয়ের বাইরে আছে। তাদের শিক্ষার আওতায় আনতে হলে শিক্ষকের সংখ্যা ও মান দুটিই বাড়াতে হবে।
সংকটের অন্য দিক শিক্ষকের যোগ্যতা। বহু দেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের সংখ্যা চাহিদার তুলনায় কম। দুর্গম এলাকা, গ্রামীণ অঞ্চল ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর বিদ্যালয়ে এ ঘাটতি তীব্র। শিক্ষার সুযোগে বৈষম্য কমাতে চাইলে এসব এলাকার শিক্ষকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা, আবাসন সুবিধা ও পেশাগত সহায়তা দরকার। শিক্ষার্থী যে অঞ্চলেই জন্মাক, যোগ্য শিক্ষক পাওয়ার অধিকার তার আছে। ঘাটতির কারণও বহুমুখী। কম বেতন, পেশার সামাজিক স্বীকৃতি, কঠিন কর্মপরিবেশ, প্রশিক্ষণের অভাব এবং বার্ধক্যজনিত অবসরে শিক্ষকের সংখ্যা কমে যাওয়া, সব মিলে সংকট তৈরি করেছে।
শিক্ষক সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয়ও চলছে। ২০০৮ সালে গঠিত শিক্ষক বিষয়ক আন্তর্জাতিক টাস্ক ফোর্স এখন ‘শিক্ষা ২০৩০-এর জন্য শিক্ষক টাস্ক ফোর্স’ নামে কাজ করছে। সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা, শিক্ষক সংগঠন ও উন্নয়ন সহযোগীরা এতে যুক্ত। ২০১৫ সালে জাতিসংঘ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য গ্রহণ করেছে। এর লক্ষ্য ৪-এ সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার আছে। উপলক্ষ্য ৪.গ সরাসরি শিক্ষক বিষয়ক। এতে ২০৩০ সালের মধ্যে যোগ্য শিক্ষকের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে, বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশ ও ক্ষুদ্র দ্বীপ উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এ সংকটের বাইরে নন। যাঁরা আগামী দিনের শিক্ষক তৈরি করেন, তাঁরা আমাদের শ্রেণিকক্ষ থেকেই বের হন। শিক্ষক-প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা বিভাগ মানসম্মত শিক্ষক তৈরিতে বড় ভ‚মিকা রাখে। আমরা যদি তাঁদের শেখানোর মান বাড়াতে পারি, শিক্ষক সংকট কাটানোর পথে আমরাও অবদান রাখব। আমাদের গবেষণাও নীতিনির্ধারকদের জন্য তথ্য জোগাতে পারে। শিক্ষকের কর্মপরিবেশ, শিখন-ফলাফল ও শিক্ষক-ঘাটতির স্থানীয় উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের সামাজিক দায়িত্বও বটে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের ভ‚মিকা তিন স্তরে বিভক্ত: পাঠদান, গবেষণা এবং সমাজসেবা। পাঠদানের মাধ্যমে আমরা শিক্ষার্থীকে বিষয়জ্ঞানের পাশাপাশি সমালোচনামূলক চিন্তা, সৃজনশীলতা ও নৈতিকতা শেখাই। গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করি, যা সমাজের সমস্যা সমাধানে কাজে লাগে। সমাজসেবার মাধ্যমে নীতিনির্ধারণে পরামর্শ দিই, জনসচেতনতা তৈরি করি এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ মতামত তুলে ধরি। এ তিন ভ‚মিকার ভারসাম্য বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষকের পরিচয় নির্ধারণ করে। পাঠদান ছাড়া গবেষণা শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছায় না। গবেষণা ছাড়া পাঠদান নতুন জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হয়। সমাজসেবা ছাড়া দুটিই সমাজবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্ব গঠনে শিক্ষকের আচরণ অনেক সময় পাঠ্যবইয়ের চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে। আমরা সময় মেনে চলি কি না, শিক্ষার্থীর প্রশ্নের জবাব ধৈর্য নিয়ে দিই কি না, গবেষণায় সৎ থাকি কি না এবং মতভিন্নতাকে সম্মান করি কি না, শিক্ষার্থীরা তা লক্ষ করে। আমাদের আচরণ তাদের কাছে পেশাদারিত্বের প্রথম পাঠ। গণতান্ত্রিক চেতনা, মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা, ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-নির্বিশেষে সবার প্রতি সম্মান এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের শিক্ষা শ্রেণিকক্ষ থেকেই শুরু হয়। সমাজে কুসংস্কার, বৈষম্য ও সহিংসতার বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তোলায় শিক্ষকের অবদান বড়।
অর্থনীতির ক্ষেত্রেও শিক্ষকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষ জনশক্তি তৈরি না হলে অর্থনীতি এগোয় না। প্রতিটি শিক্ষা স্তরে শিক্ষক ভবিষ্যতের কর্মী, উদ্যোক্তা ও গবেষক তৈরি করেন। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী কোভিড-১৯ মহামারির পর নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে দশ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় ৭০ শতাংশ সহজ গদ্য পড়ে বুঝতে পারছিল না। বিশ্বব্যাংক এ অবস্থাকে ‘শিখন দারিদ্র্য’ নামে অভিহিত করে। এ ঘাটতি কমানোর কাজ শিক্ষকের মাধ্যমেই করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এখানেও ভ‚মিকা রাখতে পারেন, কারণ শিখন-মূল্যায়ন, শিক্ষা-নীতি বিশ্লেষণ ও শিক্ষক-প্রশিক্ষণের গবেষণা আমাদের হাতেই হয়।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যগুলো অর্জনেও শিক্ষক কেন্দ্রীয় চরিত্র। দারিদ্র্য হ্রাস, স্বাস্থ্য সচেতনতা, লিঙ্গসমতা, পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু সচেতনতার ভিত্তি শিক্ষা। শিক্ষক এসব বিষয় শিক্ষার্থীর কাছে সহজ ভাষায় পৌঁছে দেন। শিক্ষার্থীরা পরিবারে ও সমাজে সে মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেয়। এভাবে শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা সমাজের আচরণে রূপ নেয়। তাই শিক্ষা বিনিয়োগের সুফল শুধু ব্যক্তির আয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না, জনস্বাস্থ্য, সামাজিক সংহতি ও গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্য দিয়ে পুরো সমাজে ছড়িয়ে পড়ে।
গত ষাট বছরে বিশ্ব বদলে গেছে। ১৯৬৬ সালে শিক্ষকের প্রধান সরঞ্জাম ছিল বই, ব্ল্যাকবোর্ড ও নিজের জ্ঞান। আজ শ্রেণিকক্ষে ডিজিটাল যন্ত্র, ইন্টারনেট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত হয়েছে। তথ্য এখন হাতের মুঠোয়, ফলে শিক্ষকের ভ‚মিকা তথ্য সরবরাহকারী থেকে পথপ্রদর্শক ও মূল্যায়নকারীর দিকে সরছে। শিক্ষার্থীকে তথ্য খুঁজে পেতে শেখানোর চেয়ে তথ্য যাচাই, বিশ্লেষণ ও প্রয়োগ করতে শেখানো এখন বেশি জরুরি। এ পরিবর্তন সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ দুটিই এনেছে।
কোভিড-১৯ মহামারি শিক্ষকের ভূমিকার গুরুত্ব নতুন করে দেখিয়েছে। মহামারির শুরুর পর্যায়ে বিদ্যালয় বন্ধের কারণে বিশ্বে প্রায় ১৬০ কোটি শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ব্যাহত হয়। শিক্ষকেরা অনলাইন ক্লাস, রেডিও ও টেলিভিশনের পাঠ এবং শিক্ষা উপকরণ বিতরণের মাধ্যমে শিখন ধারা বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাও অনলাইনে পাঠদান শুরু করেছেন, অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম ছাড়াই। অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে, প্রযুক্তি পাঠদানে সহায়তা করে, কিন্তু শিক্ষার্থীর পাশে মানুষ শিক্ষকের বিকল্প নেই। শিক্ষার্থীর মনোযোগ, অনুপ্রেরণা ও মানসিক সহায়তা প্রযুক্তি একা দিতে পারে না।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ ও গবেষণা দুটিকেই বদলে দিচ্ছে। শিক্ষার্থী এখন মুহূর্তে তথ্য পায়, লেখার খসড়া তৈরি করে এবং কোড লেখায় সহায়তা নেয়। শিক্ষক এর সাহায্যে শিখন উপকরণ তৈরি করতে ও মূল্যায়নের কাজ সহজ করতে পারেন। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ইউনেসকো শিক্ষা ও গবেষণায় জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের নির্দেশিকা প্রকাশ করে, যেখানে মানবকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলা হয়েছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে সংস্থাটি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দক্ষতা কাঠামো প্রকাশ করেছে। মূল নীতি স্পষ্ট: প্রযুক্তি শিক্ষকের সহায়ক হবে, শিক্ষকের স্থান নেবে না। আমাদের দায়িত্ব এখন শিক্ষার্থীকে প্রযুক্তি ব্যবহারের নৈতিকতা শেখানো, তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস গড়া এবং মৌলিক চিন্তার সক্ষমতা বাঁচিয়ে রাখা। গবেষণায় প্রযুক্তির ব্যবহার কোথায় গ্রহণযোগ্য এবং কোথায় নয়, সে বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তৈরি করতে হবে।
প্রযুক্তির ব্যবহারে বৈষম্যের ঝুঁকিও আছে। ইন্টারনেট সংযোগ ও ডিজিটাল যন্ত্র সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি। শিক্ষকের ডিজিটাল দক্ষতা বাড়ানোর প্রশিক্ষণও অনেক জায়গায় অপর্যাপ্ত। ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা এবং অ্যালগরিদমের পক্ষপাত সম্পর্কে সচেতনতাও এখন শিক্ষকের নতুন দায়িত্ব। জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন ও সামাজিক বিভাজনও শিক্ষাঙ্গনে প্রভাব ফেলছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীর প্রতি যত্ন, শিক্ষার্থীর মানসিক সুস্থতা এবং পরিবেশ সচেতনতা শিক্ষকের কাজের অংশ হয়ে উঠেছে। এসব দায়িত্ব পালনের জন্য শিক্ষকের প্রস্তুতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা বাড়াতে হবে। প্রযুক্তি-সংক্রান্ত নীতি তৈরির সময় শিক্ষকের অংশগ্রহণ তাই অপরিহার্য।
আমাদের অঞ্চলের ইতিহাসে শিক্ষাগুরুদের অবদান উজ্জ্বল। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নারীশিক্ষা বিস্তার ও কুসংস্কার দূর করার জন্য সংগ্রাম করেছেন। ১৮৫৫ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘বর্ণপরিচয়’ প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাঙালি শিশুর অক্ষরজ্ঞানের ভিত্তি হয়েছে। তাঁর উদ্যোগে ১৮৫৬ সালে বিধবা বিবাহ আইন পাস হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০১ সালে শান্তিনিকেতনে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯২১ সালে বিশ্বভারতী গড়ে তোলেন। প্রকৃতির সান্নিধ্যে মুক্ত পরিবেশে শিক্ষার ধারণা তিনি বাস্তবে প্রয়োগ করেছেন। বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ১৯১১ সালে কলকাতায় সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। নারীর শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভ‚মিকা ইতিহাসে স্মরণীয়। এ মনীষীরা দেখিয়েছেন, শিক্ষকতা শুধু পেশা নয়, সামাজিক রূপান্তরের দায়িত্বও।
বাংলাদেশের ইতিহাসেও শিক্ষকের ভ‚মিকা গভীর। ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বাঙালির প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনে ভ‚মিকা রেখেছেন। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে বিজয়ের প্রাক্কালে বহু শিক্ষক বুদ্ধিজীবী হিসেবে শহীদ হন। সে আত্মত্যাগের স্মৃতি আমাদের পেশার দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। এ ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার আমাদের কাঁধে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে সব বালক-বালিকার জন্য অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা নিশ্চিত করার রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার আছে। এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নের প্রধান কারিগর শিক্ষক। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শহরের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষকেরা সীমিত সম্পদ নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখতে তাঁদের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষকের সংখ্যা, প্রশিক্ষণ, বেতন-কাঠামো ও নিয়োগ-প্রক্রিয়ার মান নিয়ে আলোচনা চলমান। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে আমরা গবেষণার মাধ্যমে দেশের শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তির সমস্যা সমাধানে ভ‚মিকা রাখতে পারি। এ সামর্থ্য পুরোপুরি কাজে লাগাতে প্রয়োজন গবেষণা-বরাদ্দ বৃদ্ধি, স্বচ্ছ নীতিমালা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ। বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য এসব আলোচনাকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের আলোকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেয়।
শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানো মানে শিক্ষক দিবসে শুভেচ্ছা জানানোর বেশি কিছু। এর জন্য সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ দরকার। আমি পাঁচটি প্রস্তাব রাখছি।
প্রথমত, শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ২০১৫ সালের নভেম্বরে গৃহীত ‘শিক্ষা ২০৩০ কর্মকাঠামো’ এবং ওই বছরের ইনচিয়ন ঘোষণায় জাতীয় আয়ের কমপক্ষে ৪ থেকে ৬ শতাংশ অথবা সরকারি ব্যয়ের কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ শিক্ষায় বরাদ্দের সুপারিশ আছে। বরাদ্দের বড় অংশ শিক্ষকের বেতন, প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও কর্মপরিবেশ উন্নয়নে ব্যয় হওয়া উচিত। শিক্ষা খাতের ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি তার সুষ্ঠু ব্যবহারও নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বরাদ্দ প্রকৃতপক্ষে শ্রেণিকক্ষে পৌঁছায়।
দ্বিতীয়ত, নিয়োগ ও পদোন্নতি হবে স্বচ্ছ, মেধাভিত্তিক ও নিয়মনির্ভর। বেতন ও সুবিধা যথাসময়ে পৌঁছাবে। দুর্গম এলাকার শিক্ষকের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ও আবাসনের ব্যবস্থা থাকবে। স্বচ্ছ নিয়োগ শুধু প্রার্থীর প্রতি ন্যায়বিচার নয়, প্রতিষ্ঠানের গুণমান রক্ষারও শর্ত।
তৃতীয়ত, শিক্ষকের প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়ন হবে ধারাবাহিক। বিদ্যালয়ের শিক্ষকের জন্য শিক্ষণ-কৌশল, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ও ডিজিটাল দক্ষতার প্রশিক্ষণ দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান-কৌশল, গবেষণা-পদ্ধতি, গবেষণা-নৈতিকতা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দায়িত্বশীল ব্যবহারের নিয়মিত কর্মসূচি থাকা প্রয়োজন। শিক্ষকেরা যেন পরস্পরের অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে পারেন, সে জন্য পেশাগত নেটওয়ার্ক ও সহযোগিতামূলক চর্চা উৎসাহিত করতে হবে।
চতুর্থত, নীতিনির্ধারণে শিক্ষকের কণ্ঠস্বর যুক্ত হবে। শিক্ষাক্রম, মূল্যায়ন ও প্রযুক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্তে শিক্ষক সংগঠনের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা হবে। শিক্ষাগত স্বাধীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন রক্ষা করা হবে। শিক্ষকের মতামত নীতির অংশ হলে নীতি বাস্তবায়ন সহজ হয় এবং শিক্ষকের আস্থাও বাড়ে।
পঞ্চমত, শিক্ষকদেরও নিজেদের দায়িত্ব পালনে সচেতন থাকতে হবে। ১৯৬৬ ও ১৯৯৭ সালের দুটি সুপারিশেই অধিকারের পাশাপাশি দায়িত্বের কথা আছে। সময়ানুবর্তিতা, গবেষণায় সততা, শিক্ষার্থীর প্রতি নিরপেক্ষ আচরণ, তরুণ সহকর্মীদের পরামর্শ দেওয়া এবং নিজের জ্ঞান নিয়মিত হালনাগাদ করা আমাদেরই কাজ। আমরা যখন নিজেরা আদর্শ হয়ে উঠি, সমাজের শ্রদ্ধা স্বাভাবিকভাবেই আমাদের দিকে ফেরে। অধিকারের দাবি ও দায়িত্বের পালন একসঙ্গে চললেই পেশার মর্যাদা টেকসই হয়।
ষাট বছর আগে বিশ্ব শিক্ষকের মর্যাদাকে আন্তর্জাতিক নীতির অংশ করেছিল। এ সময়ে শিক্ষার সুযোগ বেড়েছে, শিক্ষক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে এবং শিক্ষক সংগঠনগুলো শক্তিশালী হয়েছে। ১৯৯৭ সালে উচ্চশিক্ষার শিক্ষকের জন্য আলাদা দলিল গৃহীত হয়েছে, আর সিয়ার্টের মাধ্যমে বাস্তবায়নের পর্যবেক্ষণও চলছে। তবু শিক্ষক ঘাটতি, বেতন-বৈষম্য, কর্মচাপ, পেশা ছাড়ার ক্রমবর্ধমান হার, গবেষণা-সুবিধার অভাব এবং শিক্ষাগত স্বাধীনতার প্রশ্ন রয়ে গেছে। প্রযুক্তি ও জলবায়ুর নতুন বাস্তবতা শিক্ষকের সামনে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
প্রতিপাদ্যের বার্তা স্পষ্ট। শিক্ষকের পেশা সুরক্ষিত না হলে শিক্ষার মান টেকে না। মর্যাদা না বাড়ালে প্রতিভাবান মানুষ এ পেশায় আসেন না। শিক্ষকের পাশে না দাঁড়ালে ভবিষ্যৎ নির্মাণ সম্ভব নয়। ষাট বছরের অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে, ঘোষণা ও সুপারিশ যথেষ্ট নয়। বাজেট, আইন, প্রশাসনিক চর্চা ও সামাজিক আচরণে সুপারিশের প্রতিফলন ঘটাতে হবে।
আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবসে আমরা শিক্ষকেরা নিজেদের কাছেও অঙ্গীকার করি। শিক্ষার্থীর প্রতি যতশীল থাকব, গবেষণায় সৎ থাকব, সহকর্মী ও বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পাশে দাঁড়াব এবং পেশার মর্যাদা রক্ষায় নিজেদের দায়িত্ব পালন করব। রাষ্ট্র, সমাজ ও অভিভাবকদের কাছেও আমাদের আহ্বান, শিক্ষকের পাশে দাঁড়ান, কারণ শিক্ষকের মর্যাদা শেষ পর্যন্ত আপনাদের সন্তানের ভবিষ্যতের মর্যাদা। যে সমাজ শিক্ষককে মর্যাদা দেয়, সে সমাজ নিজের ভবিষ্যৎকেই মর্যাদা দেয়।
লেখক : ড. সানজিদা হক মিশু, চেয়ারম্যান, বাংলা বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au