গরুর মাংসের বিতর্কের পর এবার ক্যাম্পাসে যেকোনো পশু জবাই নিষিদ্ধ করল জবি প্রশাসন। ছবিঃ সংগৃহীত
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) কেন্দ্রীয় মন্দিরের সামনে গরুর মাংস রান্না করে পিকনিক আয়োজনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিতর্কের মধ্যে এবার বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যেকোনো ধরনের পশু জবাই থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দিয়েছে প্রশাসন। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করার কথা উল্লেখ করে বুধবার (১৪ অক্টোবর) বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিস থেকে এ নির্দেশনা জারি করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আজম খানের সই করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ক্যাম্পাসে যেকোনো ধরনের পশু জবাই থেকে বিরত থাকার জন্য সব শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে অনুরোধ করা হচ্ছে। নির্দেশনা অমান্য করলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রকাশিত গণবিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের গণবিজ্ঞপ্তির সূত্র হিসেবে ‘জিএসসিসি/পিআরডি/৭৯/২০২৬-২০২৭’ উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নির্দেশনা অমান্য করলে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

বিজ্ঞপ্তি
এর আগে সোমবার (১২ অক্টোবর) সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মন্দিরের সামনে গরুর মাংস দিয়ে খিচুড়ি রান্না করে পিকনিক আয়োজনের অভিযোগ ওঠে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ১৭তম ব্যাচের কয়েকজন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে। ঘটনাটি নিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। তাঁদের প্রতিবাদের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের হস্তক্ষেপে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীরা রান্না শেষ করে অন্যত্র গিয়ে খাবার গ্রহণ করেন বলে জানা গেছে।
ঘটনাটি ঘিরে ক্যাম্পাসে ধর্মীয় সহাবস্থান, উপাসনাস্থলের মর্যাদা এবং বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীর অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর বিষয়গুলো আলোচনায় আসে। এর মধ্যেই পশু জবাইসংক্রান্ত নতুন নির্দেশনা দিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
মন্দিরের সামনে গরুর মাংস রান্না নিয়ে বিতর্ক
অভিযোগ অনুযায়ী, সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মন্দিরের সামনে গরুর মাংস দিয়ে খিচুড়ি রান্নার আয়োজন করেন ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ১৭তম ব্যাচের শিবির-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন শিক্ষার্থী। আয়োজনের শুরুতে গরুর মাংস রান্নার বিষয়টি অস্বীকার করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য। পরে বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরা আপত্তি জানান।
একপর্যায়ে তাঁদের প্রতিবাদের মুখে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের হস্তক্ষেপে রান্না শেষ করে আয়োজকেরা অন্যত্র গিয়ে খাবার গ্রহণ করেন বলে জানা গেছে।
ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অভিযোগ ওঠে, রান্নার জন্য চুলা তৈরি করতে কেন্দ্রীয় মন্দিরের ইট ব্যবহার করা হয়েছিল। ঘটনাস্থলের ছবি ও ভিডিওতে এ-সংক্রান্ত প্রমাণ রয়েছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করা হলেও অভিযোগটির সত্যতা নিরপেক্ষভাবে নিশ্চিত করার জন্য আনুষ্ঠানিক তদন্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের একাংশের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কেন্দ্রীয় মন্দিরের জন্য জায়গা পাওয়ার পরও উপাসনাস্থলের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিয়ে এমন ঘটনা উদ্বেগ তৈরি করেছে। তাঁদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সব ধর্মের শিক্ষার্থীর অনুভূতি, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এ ঘটনায় সনাতনী শিক্ষার্থীদের একাংশ প্রতিবাদ মিছিল করেন এবং মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রতিবাদ জানান।
পশু জবাই নিষিদ্ধের নির্দেশনায় কী বলা হয়েছে?
প্রক্টর অফিসের বিজ্ঞপ্তিতে ক্যাম্পাসে যেকোনো ধরনের পশু জবাই থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে। নির্দেশনার কারণ হিসেবে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, পরিচ্ছন্নতা এবং স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়, অনুষ্ঠান বা পশুর নাম উল্লেখ করা হয়নি। অর্থাৎ নির্দেশনাটি ক্যাম্পাসে সব ধরনের পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্দেশনা অমান্য করলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের গণবিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে নতুন নির্দেশনা জারির সঙ্গে কেন্দ্রীয় মন্দিরের সামনে গরুর মাংস রান্নার ঘটনাটির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট করা হয়নি।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে আলাদা কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় মন্দির প্রতিষ্ঠার দাবি দীর্ঘদিনের। ক্যাম্পাসে সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় উপাসনা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য স্থায়ী জায়গার দাবিতে তাঁরা বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নিয়েছেন।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মন্দিরের জন্য প্রস্তাবিত জায়গায় শৌচাগার নির্মাণের উদ্যোগের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। পরে তাঁরা নিজেরাই ভিত্তিপূজার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় মন্দির প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন।
গত শনিবার (১০ অক্টোবর) মহালয়া উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মন্দিরের সদস্যসচিব জয় সাহা স্থায়ী মন্দির প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় উপাসনা ও বিভিন্ন অনুষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে আয়োজনের জন্য স্থায়ী অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
জয় সাহা আশা প্রকাশ করেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে মন্দিরটি স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
মহালয়ার অনুষ্ঠানে স্থায়ী মন্দির প্রতিষ্ঠার দাবি এবং এর দুই দিন পর মন্দিরের সামনে গরুর মাংস রান্না নিয়ে বিতর্কের ঘটনা ক্যাম্পাসে ধর্মীয় উপাসনাস্থলের ব্যবস্থাপনা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের প্রশ্নকে আবারও সামনে এনেছে।
তদন্তের দাবি ছাত্রদল নেতার
ঘটনাটি নিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল নেতা সামছুল আরিফিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উপাসনাস্থলের আশপাশে কোনো আয়োজন করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের অনুভূতি ও পরিবেশ বিবেচনায় রাখা উচিত ছিল।
তিনি দাবি করেন, মন্দিরের সামনে রান্নার পরিবর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চের অন্য পাশে আয়োজনটি করা যেত। ক্যাম্পাসে আগে মুক্তমঞ্চের আশপাশে বারবিকিউয়ের আয়োজন হলেও স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সামছুল আরিফিন মন্দিরের জন্য জায়গা নির্ধারণের সময় শৌচাগার নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে তৈরি হওয়া আগের বিতর্কের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। বর্তমান ঘটনার পেছনে কেউ উসকানি দিয়েছেন কি না, তা তদন্ত করার আহ্বান জানান তিনি।
তবে তাঁর উত্থাপিত অভিযোগগুলোর পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে তদন্তের আগে ঘটনার পেছনে কোনো পরিকল্পিত উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।