দুই তরুণীকে ধর্ষণের দায়ে কারাদণ্ড ভোগ করা এক ব্যক্তি আবারও একই ধরনের অপরাধের চেষ্টা করছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় প্রতিবন্ধী সহায়তা কর্মসূচি এনডিআইএসের (NDIS) মাধ্যমে তরুণী নারী পরিচর্যাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন তিনি। এ অবস্থায় অন্য নারীদের সতর্ক করতে মুখ খুলেছেন তাঁর এক ভুক্তভোগী।
অস্ট্রেলিয়ার সাবেক আবাসন ব্যবসায়ী থমাস হোফার (৫৬) দুই তরুণীকে ধর্ষণের দায়ে ছয় বছরের বেশি সময় কারাগারে ছিলেন। তাঁদের একজন গ্রেস টিবলস। ঘটনার সময় তাঁর বয়স ছিল ১৭ বছর।
বর্তমানে ২৯ বছর বয়সী গ্রেস নিজের পরিচয় গোপন রাখার আইনি অধিকার স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিয়ে হোফারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলছেন। তাঁর আশঙ্কা, হোফার আবারও সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের লক্ষ্যবস্তু করছেন।
বাসা ভাড়ার বিজ্ঞাপন দেখে পরিচয়
গ্রেস জানান, টানা দুই বছর গৃহহীন থাকার পর তিনি একটি আশ্রয়কেন্দ্রে থাকছিলেন। সেখান থেকেও তাঁকে বের করে দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। এমন সময় ফ্ল্যাটমেটস ডটকমে (Flatmates.com) হোফারের দেওয়া একটি শেয়ারহাউসের বিজ্ঞাপন তাঁর নজরে আসে।
অস্ট্রেলিয়ার টেলিভিশন অনুষ্ঠান এ কারেন্ট অ্যাফেয়ার-কে গ্রেস বলেন, “আমি শুধু আশা করছিলাম, গৃহহীন অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারব এবং থাকার মতো একটা জায়গা খুঁজে পাব। সত্যি বলতে, নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি খুব আশাবাদী ছিলাম।”
হোফার সম্পর্কে তাঁর প্রাথমিক ধারণা ছিল ইতিবাচক। গ্রেস বলেন, “আমার মনে হয়েছিল, লোকটি ভালো মানুষ।”
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর তাঁরা কয়েকটি বারে যান। সেখানে হোফার তাঁকে একের পর এক পানীয় কিনে দেন। পরে অ্যাপার্টমেন্টটি দেখতে যাওয়ার আগে ওই কিশোরীকে মদ্যপান করান তিনি।
গ্রেস বলেন, বিজ্ঞাপনে এমনভাবে একাধিক কক্ষের কথা বলা হয়েছিল, যাতে মনে হয়েছিল সেখানে আলাদা ঘরে থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেটি ছিল এক শয়নকক্ষের অ্যাপার্টমেন্ট। সেখানে একটি মাত্র বিছানা ছিল, যেটিতে তাঁর সঙ্গে গ্রেসকে থাকতে বলেছিলেন হোফার।
এরপর হোফার তাঁকে জোর করে চেপে ধরে ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগ করেন গ্রেস।
তিনি বলেন, “সে জানে, আমি সম্মতি দিইনি। সে জানে… এ কারণেই সে সবকিছু ওইভাবে পরিকল্পনা করেছিল।”
হাসপাতালেই মিলেছিল আরেক ভুক্তভোগীর তথ্য
ঘটনার রাতে হাসপাতালে গেলে ধর্ষণের আলামত সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা এক নারী কর্মীর প্রতিক্রিয়া গ্রেসের মনে গভীর ছাপ ফেলে।
গ্রেসের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই কর্মী তাঁকে দেখে বিস্মিত হয়ে বলেছিলেন, আগের রাতেই আরেক তরুণী এসে প্রায় একই ধরনের ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন।
গ্রেস বলেন, “তখনই আমার মনে হলো, নিশ্চয়ই এই লোকটাই। সে আগেও এমন করেছে।”
পরে হোফার দোষী সাব্যস্ত হন এবং তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। তবে তিনি কখনো নিজের অপরাধ স্বীকার করেননি। এখনো নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আসছেন।
আবারও কারাগারে, এবার নতুন অভিযোগ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই বছর আগে সম্মতি ছাড়া যৌন স্পর্শের অপরাধে হোফারকে আবারও কারাগারে পাঠানো হয়। চলতি বছরের মার্চে তিনি মুক্তি পান।
তবে এবার ভার্চ্যুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক বা ভিপিএন (VPN) সংগ্রহের চেষ্টা-সংক্রান্ত অভিযোগে তাঁকে আবার আদালতের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ভিপিএন ব্যবহার করে কোনো ডিভাইসের অবস্থান আড়াল করা কিংবা অনলাইনে ব্যবহারকারীর কর্মকাণ্ড গোপন রাখা সম্ভব।
এদিকে করদাতাদের অর্থে পরিচালিত অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় প্রতিবন্ধী বীমা কর্মসূচি এনডিআইএসের মাধ্যমে ‘ফিট’ ও ‘নারী’ সহায়তাকর্মী খুঁজছেন হোফার।
ফেসবুকে ব্যাকপ্যাকারদের একটি গ্রুপে দেওয়া পোস্টে তিনি উদ্যমী, নির্ভরযোগ্য ও বন্ধুত্বপূর্ণ নারী কর্মী খোঁজার কথা উল্লেখ করেন। আগ্রহীদের পূর্ণাঙ্গ প্রোফাইল ছবি পাঠাতে এবং তাঁর সঙ্গে সরাসরি শুধু হোয়াটসঅ্যাপ, সিগন্যাল কিংবা টেলিগ্রামের মতো এনক্রিপ্ট করা অ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে বলেন তিনি।
এ কারেন্ট অ্যাফেয়ার অনুষ্ঠানের প্রতিবেদকেরা একটি ক্যাফেতে হোফারের সঙ্গে দেখা করেন। হোফার ভেবেছিলেন, তাঁর বিজ্ঞাপন দেখে এক তরুণী সেখানে আসছেন।
তবে কোনো অন্যায় করছেন না বলে দাবি করেন তিনি। হোফার বলেন, “আমি এনডিআইএসের আওতাভুক্ত। আমি কোনো ভুল করছি না।”
আইনের ফাঁকফোকর নিয়ে প্রশ্ন
২০২৪ সালে এ কারেন্ট অ্যাফেয়ার এমন একটি আইনি ফাঁক উন্মোচন করেছিল, যার সুযোগে হোফারের মতো গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিরাও এনডিআইএসের আওতায় নিজেদের সহায়তাকর্মী নিয়োগ করতে পারতেন।
এরপর নিয়ম পরিবর্তন করে গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের নিজেদের এনডিআইএস তহবিল নিজেরা পরিচালনার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। কিন্তু হোফারের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড দেখে মনে হচ্ছে, এসব বিধিনিষেধের পরও ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয়নি।
গ্রেস বলেন, “আমি শুধু চাই, তাকে থামানো হোক।”
তিনি আরও বলেন, “আমার মনে হয়, যেসব নারী সম্ভাব্যভাবে তার সঙ্গে দেখা করছেন, তাঁরা জানেনই না যে সে একজন ধর্ষক।”
গ্রেসের আশঙ্কা, হোফারকে এভাবে বিজ্ঞাপন দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার অর্থ হলো, তাঁর মতো সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে দুর্বল ও ঝুঁকিতে থাকা নারীদের একান্তে সময় কাটানোর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, “আমি চাই না, তার এমন স্বাধীনতা থাকুক যে সে বিজ্ঞাপন দেবে আর সম্ভাব্য ঝুঁকিতে থাকা নারীদের একটি কক্ষে তার সঙ্গে নিয়ে যেতে পারবে।”

দণ্ডিত ধর্ষক থমাস হোফার। ছবি: এ কারেন্ট অ্যাফেয়ার
হোফারের বক্তব্য
এ কারেন্ট অ্যাফেয়ার-কে ইমেইলে পাঠানো এক বিবৃতিতে হোফার বলেন, “আমি এনডিআইএসের অর্থায়ন পাই। আমার দাবি, ১৮ বছরের বেশি বয়সী সহায়তাকর্মী খুঁজতে বিজ্ঞাপন দেওয়ার এবং প্রযোজ্য এনডিআইএসের নিয়ম ও আইনি বাধ্যবাধকতা মেনে তাঁদের সংশ্লিষ্ট সেবাগ্রহীতা বা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠানোর অধিকার আমার রয়েছে।”
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার সকালে সিডনিতে পুলিশ হোফারকে গ্রেপ্তার করে। আইনি কারণে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিস্তারিত প্রকাশ করতে পারেনি এ কারেন্ট অ্যাফেয়ার।
হোফার স্থানীয় আদালতে হাজির হয়ে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। আদালত তাঁর জামিন আবেদন নাকচ করেন।
এনডিআইএস কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল ডিজঅ্যাবিলিটি ইন্স্যুরেন্স এজেন্সির (NDIA) এক মুখপাত্র জানান, প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আদালত জননিরাপত্তাকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হিসেবে দেখে।
মুখপাত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এনডিআইএ তার আইনগত দায়িত্বের আওতায় ঝুঁকি মোকাবিলা এবং এনডিআইএসের অর্থায়নের ওপর নজরদারি জোরদার করতে পদক্ষেপ নেয়।
২০২৪ সালে পাস হওয়া এনডিআইএস আইনের সংশোধনী অনুযায়ী, এমন কোনো অপরাধে দণ্ডিত কর্মসূচির উপকারভোগী, যার সর্বোচ্চ শাস্তি দুই বছর বা তার বেশি কারাদণ্ড, তাঁর এনডিআইএস তহবিল এজেন্সির মাধ্যমে পরিচালিত হতে হবে।
কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে ঝুঁকি চিহ্নিত হলে এনডিআইএ তাঁর নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় তহবিল পরিচালনার আবেদন প্রত্যাখ্যান করতে পারে অথবা সহায়তা ও তহবিল ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব এজেন্সির হাতে নেওয়ার নির্দেশ দিতে পারে।
তবে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরাধীদের ব্যবস্থাপনা এবং বিচারব্যবস্থার আরোপ করা শর্ত কার্যকর করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট অঙ্গরাজ্য ও অঞ্চলগুলোর সরকারের।
এনডিআইএ আরও জানায়, অপরাধবিচারসংক্রান্ত পরিষেবা প্রদান, অপরাধ প্রতিরোধ ও অপরাধ থেকে সরে আসার বৃহত্তর কর্মসূচিতে অর্থায়ন কিংবা অপরাধীদের কমিউনিটি পর্যায়ে তত্ত্বাবধান করা এনডিআইএসের দায়িত্ব নয়। এ বিষয়ে অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয়, অঙ্গরাজ্য ও অঞ্চলভিত্তিক সরকারগুলোর মধ্যে সমঝোতা রয়েছে।
এ ছাড়া এনডিআইএর বিশেষায়িত জাস্টিস লিয়াজোঁ কর্মকর্তারা এনডিআইএসের উপকারভোগী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করেন। তাঁদের উদ্দেশ্য হলো, সহায়তাসেবা যথাযথ রাখা এবং এনডিআইএস ও বিচারব্যবস্থার দায়িত্বের সীমারেখা স্পষ্ট করা।
যৌন নিপীড়ন, পারিবারিক সহিংসতা বা ঘরোয়া নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা অস্ট্রেলিয়ার 1800RESPECT সেবায় যোগাযোগ করতে পারেন। ফোন: 1800 737 732।
সূত্র: নাইন.কম.এইউ