ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের হুমকিতে অস্বস্তিতে অস্ট্রেলিয়ার লেবার পার্টি, চাপে প্রধানমন্ত্রী আলবানিজ। ছবিঃ টুইটার
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর হুমকি অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজের জন্য রাজনৈতিক অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে আলবানিজের নিজ দল লেবার পার্টির সংসদ সদস্যদের একাংশও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে আরও স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার পক্ষে কথা বলছেন। ফলে ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা এবং নিজ দলের ভেতরে যুদ্ধবিরোধী মনোভাব সামাল দেওয়া, দুই দিক থেকেই চাপে পড়তে পারেন আলবানিজ।
অস্ট্রেলীয় সংবাদমাধ্যম এবিসির এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সপ্তাহে ফ্লোরিডায় এক সমাবেশে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনার কথা বলেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ‘আরেকটি ছোট্ট এপিক ফিউরি’ অভিযান চালাতে পারে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি। ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামটি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে।
যুদ্ধ যখন অষ্টম মাসের কাছাকাছি পৌঁছাচ্ছে, তখন ট্রাম্পের এমন বক্তব্য নতুন করে সংঘাত বাড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে। অস্ট্রেলিয়ায়ও এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
আলবানিজের বর্তমান অবস্থান বুঝতে হলে ইরাক যুদ্ধের সময় তাঁর ভূমিকার দিকে ফিরে তাকাতে হয়। ২০০৩ সালে তিনি ছিলেন বিরোধী দল লেবার পার্টির একজন অপেক্ষাকৃত নতুন জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য। সে সময় কর্মসংস্থান পরিষেবা ও প্রশিক্ষণবিষয়ক ছায়ামন্ত্রীর দায়িত্বে থাকলেও ইরাক যুদ্ধের বিরোধিতা করে তিনি বিশেষভাবে আলোচনায় আসেন।
তৎকালীন লেবার নেতা ও সংসদ সদস্য তানিয়া প্লিবেরসেকও ইরাক যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁদের সঙ্গে লেবার পার্টির ৪০ জনের বেশি সিনেটর ও সংসদ সদস্য তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে পাঠানো একটি খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেন। চিঠিতে বলা হয়েছিল, আগাম সামরিক হামলা বিশ্বকে আরও নিরাপদ করার পরিবর্তে বিপজ্জনক করে তুলতে পারে।
সে সময় প্লিবেরসেক বলেছিলেন, ইরাক যুদ্ধের প্রতি অস্ট্রেলিয়ার বহু মানুষের, বিশেষ করে লেবার পার্টির, বিরোধিতা রয়েছে এবং কেন তাঁরা এই যুদ্ধের বিরোধিতা করছেন, তা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে জানানো প্রয়োজন ছিল।
২০০৩ সালের মার্চে যুদ্ধ শুরুর প্রথম মাসেই অস্ট্রেলিয়ার পার্লামেন্টে দেওয়া এক বক্তব্যে আলবানিজ তৎকালীন সরকারের সমালোচনা করেন। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন করে অস্ট্রেলিয়া বিশ্ববাসীর কাছে নিজেদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে বলে মন্তব্য করেছিলেন তিনি। তাঁর বক্তব্য ছিল, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ফোন পাওয়ার পরই সমর্থন জানিয়ে দিয়েছিলেন, যদিও সেনা মোতায়েনের আগেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অস্ট্রেলিয়ার যথাযথ অংশগ্রহণ ছিল না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
আলবানিজ আরও বলেছিলেন, আগাম হামলাকে সমর্থন করার মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়া আন্তর্জাতিক রাজনীতির নিয়ম বদলে দেওয়ার মতো একটি সিদ্ধান্তে অংশ নিচ্ছে। ইরাকে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তাঁর আপত্তি ছিল না, বরং সেই লক্ষ্য অর্জনে সামরিক হামলার পদ্ধতির বিরোধিতা করেছিলেন তিনি।
তখনকার সেই স্পষ্টভাষী ও আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে আলবানিজ ‘মারিকভিল বাউলার’ নামে পরিচিতি পেয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণ করে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাস্তবতা বদলেছে।
২০১৩ সালে লেবার পার্টির নেতৃত্ব নির্বাচনে বিল শর্টেনের কাছে হেরে যাওয়ার পর আলবানিজের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা একসময় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। পরে তিনি সেই পদে পৌঁছান এবং সর্বশেষ নির্বাচনে পার্লামেন্টে ৯৪টি আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেন। এবিসির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সরকার পরিচালনার বাস্তবতা তাঁকে আগের তুলনায় অনেক বেশি বাস্তববাদী হতে বাধ্য করেছে।
প্রতিবেদনটির মূল প্রশ্ন হলো, ইরান যুদ্ধের বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থান আরও কঠোর হলে আলবানিজের নেতৃত্বাধীন লেবার সরকার কতটা দৃঢ়ভাবে তার বিরোধিতা করবে। গত আট মাসে যুদ্ধ নিয়ে লেবার পার্টির সাধারণ সংসদ সদস্যদের বড় অংশ তুলনামূলকভাবে নীরব থাকলেও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তাঁদের কয়েকজনের বক্তব্যে কিছুটা বেশি উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যৌথ সামরিক অভিযান শুরু করলে আলবানিজ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী রিচার্ড মার্লেসের সমর্থন নিয়ে, ওই পদক্ষেপের পক্ষে একটি বিবৃতি দেন। বিবৃতিতে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা এবং মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত অস্ট্রেলীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছিল।
তবে শুরুতে স্বল্পমেয়াদি ও সীমিত সামরিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়েছে। যুদ্ধ কবে শেষ হবে, তা নিয়ে সরকারের জ্যেষ্ঠ পর্যায়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
লেবার পার্টির কিছু সংসদ সদস্য এখন চান, আলবানিজ ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের সমালোচনা আরও স্পষ্ট করুন এবং তাঁর প্রশাসনের অবস্থান থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখুন। এবিসির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত নির্বাচনে লেবার পার্টি নিজেদের ট্রাম্পের রাজনৈতিক ধারার বিপরীতে থাকা দল হিসেবে উপস্থাপন করেছিল। একই সঙ্গে বিরোধী নেতা পিটার ডাটনকে ট্রাম্পের সঙ্গে তুলনা করে ভোটারদের কাছে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে এখন আরও জোরালো অবস্থান না নিলে সেই রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হতে পারে বলে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া, বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তা ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ অস্ট্রেলীয় সরকারের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ কমে যাচ্ছে, এমন একটি ধারণা অস্ট্রেলিয়ার জনগণের মধ্যে তৈরি হচ্ছে। বৈশ্বিক সংঘাত, সাইবার হামলা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে সাধারণ মানুষ মনে করছেন, তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের ওপর প্রভাব ফেলা অনেক সিদ্ধান্তই দেশের বাইরে নেওয়া হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ইরান যুদ্ধ ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে আরও দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার দাবি লেবার পার্টির ভেতরে বাড়ছে।
এ প্রসঙ্গে যুক্তরাজ্যের উদাহরণ তুলে ধরেছে এবিসি। ইউক্রেন ও ইরান যুদ্ধের প্রভাব এবং সাইবার হামলার আশঙ্কার মধ্যে যুক্তরাজ্য সরকার নাগরিকদের সম্ভাব্য জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। সরকারের নতুন ‘বি রেডি’ বা প্রস্তুত থাকুন প্রচারের আওতায় মানুষকে দৈনন্দিন পরিষেবা ব্যাহত হলে কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে, সে বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
যুক্তরাজ্য সরকারের নির্দেশনায় অন্তত তিন দিনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী মজুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বোতলজাত পানি, দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য খাবার, বিদ্যুৎ না থাকলে খবর শোনার জন্য ব্যাটারিচালিত বা হাত দিয়ে ঘোরানো যায় এমন এফএম রেডিও এবং ইলেকট্রনিক লেনদেন বা এটিএম সেবা ব্যাহত হলে ব্যবহারের জন্য নগদ অর্থ।
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং বিবিসি ওয়ানের ‘কোয়েশ্চেন টাইম’ অনুষ্ঠানে বলেন, সম্ভাব্য জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতির পরামর্শ কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘটনার কথা মাথায় রেখে দেওয়া হয়নি। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়া কিংবা কোনো স্থানীয় দোকানে সাইবার হামলার কারণে পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার মতো পরিস্থিতিতেও এসব প্রস্তুতি কাজে লাগতে পারে। তাঁর ভাষায়, এটি জাতীয় পর্যায়ে দৈনন্দিন স্থিতিস্থাপকতা গড়ে তোলার অংশ।
অনুষ্ঠানে এক দর্শক প্রশ্ন তোলেন, এ ধরনের সতর্কতা মানুষের মধ্যে অযথা আতঙ্ক ছড়িয়ে দিতে পারে কি না এবং কোভিড-১৯ মহামারির সময়ের মতো অতিরিক্ত কেনাকাটার প্রবণতা তৈরি করতে পারে কি না। জবাবে স্ট্রিটিং বলেন, সরকার মানুষকে সতর্ক রাখতে চায়, আতঙ্কিত করতে নয়। ইউরোপের অন্যান্য দেশ কীভাবে এ ধরনের পরিস্থিতির প্রস্তুতি নিচ্ছে, তা পর্যালোচনা করেই যুক্তরাজ্য এই উদ্যোগ নিয়েছে বলেও তিনি জানান।
এবিসির বিশ্লেষণে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, ইউরোপের দেশগুলো যদি সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় নাগরিকদের প্রস্তুত করতে এগিয়ে থাকে, তাহলে অস্ট্রেলিয়ার অবস্থান কী? ভৌগোলিকভাবে দেশটি অন্য অঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অস্থিরতার প্রভাব থেকে নিরাপদ নয়। জ্বালানির মূল্য, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, নিরাপত্তা এবং সরবরাহব্যবস্থার ওপর যুদ্ধের প্রভাব অস্ট্রেলিয়াকেও মোকাবিলা করতে হতে পারে।
অস্ট্রেলীয় সরকার এখনো নাগরিকদের জরুরি পরিস্থিতির জন্য তিন দিনের সামগ্রী মজুত করার নির্দেশ দেয়নি। তবে বিশ্ব পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন এবং সংঘাতের দীর্ঘস্থায়িত্ব এমন এক অনিশ্চিত বাস্তবতা তৈরি করেছে, যার জন্য আগাম প্রস্তুতি ও সুস্পষ্ট নীতিগত অবস্থান প্রয়োজন বলে বিশ্লেষণে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
যুদ্ধ আরও বাড়লে আলবানিজ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নীতির প্রতি আগের সমর্থন বজায় রাখবে, নাকি আরও সমালোচনামূলক অবস্থান নেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে লেবার পার্টির ভেতরে বাড়তে থাকা অস্বস্তি এবং বিশ্বব্যাপী অনিশ্চয়তা ইরান যুদ্ধকে অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত করেছে।
সূত্রঃ এবিসি নিউজ