রাউজানে অস্ত্রের মুখে নারীকে জিম্মি করে ২৫ লাখ টাকা ছিনতাই। ছবিঃ সংগৃহীত
চট্টগ্রামের রাউজানে দিনদুপুরে অস্ত্রের মুখে এক নারীকে জিম্মি করে জমি কেনার জন্য নিয়ে যাওয়া ২৫ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলার কদলপুর নতুনহাট সংযোগ সড়কের বড়ুয়াপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। দুটি মোটরসাইকেল ও একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় আসা ৮ থেকে ১০ জনের একটি সশস্ত্র দল এ ছিনতাইয়ে জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী শামসুন নাহার।
ভুক্তভোগী শামসুন নাহার রাউজান উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। জমি নিবন্ধনের জন্য সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যাওয়ার সময় তাঁর ব্যাগে নগদ ২৫ লাখ টাকা ছিল। পথে অটোরিকশার গতিরোধ করে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে টাকাগুলো ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলে তিনি জানিয়েছেন।
শামসুন নাহারের বর্ণনা অনুযায়ী, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের উদ্দেশে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে যাওয়ার সময় একটি মোটরসাইকেল তাঁদের গাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়। এতে অটোরিকশাটির গতি থেমে যায়। এ সময় পাশের আরেকটি মোটরসাইকেল থেকে দুজন নেমে অটোরিকশার চাবি ও চালকের মোবাইল ফোন কেড়ে নেন।
অটোরিকশার চালক বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তাঁদের একজন কোমর থেকে পিস্তল বের করেন। পরে অন্য একটি মোটরসাইকেলে আসা আরও দুজন অস্ত্রের মুখে ভয় দেখিয়ে শামসুন নাহারের টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। পুরো ঘটনাটি ঘটে প্রকাশ্য দিবালোকে, সড়কে চলাচলকারী মানুষের উপস্থিতির মধ্যেই।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে শামসুন নাহার বলেন, ‘আমি তাদের বলছিলাম, আমাকে মেরে ফেলো, তবুও আমার টাকা নিস না। কিন্তু আমার টাকাগুলো নিয়ে গেছে তারা। আমার ছোট ছেলের অনেক কষ্টের জমানো টাকা। তার টাকা দিয়ে জমি কিনতে যাচ্ছিলাম। এখন আমি কী করবো, জানি না।’
ছেলের দীর্ঘদিনের কষ্টে জমানো অর্থ হারিয়ে তিনি দিশেহারা হয়ে পড়েছেন বলে জানান। জমি কেনার উদ্দেশ্যে নেওয়া এই অর্থ ছিনতাইয়ের ঘটনায় তাঁর পরিবার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রকাশ্য দিবালোকে অস্ত্রের মুখে এভাবে টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগে রাউজানজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটির নিন্দা জানিয়ে খালেদা জিয়া স্মৃতি সংসদের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির আহ্বায়ক ব্যারিস্টার তারেক আকবর খোন্দকার বলেন, এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয়। রাউজানের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানান।
এ বিষয়ে রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, ভুক্তভোগী নারী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। ছিনতাইয়ে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
তবে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয়, ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত অস্ত্রের ধরন এবং লুট হওয়া টাকা উদ্ধারের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
রাউজানে সাম্প্রতিক সময়ে সহিংসতা, গোলাগুলি ও হত্যাকাণ্ডের একাধিক ঘটনার কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা এলাকায় অন্তত ১২টি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এসব গোষ্ঠীর তৎপরতা স্থানীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
পাহাড়তলী চৌমুহনী বাজারের ব্যবসায়ী নুরুল আমিনের ভাষ্য, এলাকায় পানদোকানিদেরও চাঁদা দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করতে হচ্ছে। তাঁর এই বক্তব্য স্থানীয় ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা ও চাঁদাবাজির পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি সামনে এনেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাউজানে ২৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের তথ্য বলছে, এর মধ্যে ২০টি রাজনৈতিক বিরোধের জেরে সংঘটিত হয়েছে। একই সময়ে শতাধিক গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনায় সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন।
এমন পরিস্থিতিতে জমি কেনার জন্য নেওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ ছিনতাইয়ের অভিযোগ স্থানীয় নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। দিনের বেলায় সড়কে অস্ত্রের মুখে একজন নারীকে জিম্মি করে টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত এবং লুট হওয়া অর্থ উদ্ধারের দাবি উঠেছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।