হংকংয়ে সমুদ্রের তলা দিয়ে ট্রেনযাত্রার অনন্য অভিজ্ঞতা
সমুদ্রের গভীরে সাবমেরিনে চড়ে ভ্রমণের অনুভূতি পেতে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন হংকংয়ের ওশান পার্কে। সেখানে রয়েছে ‘ওশান এক্সপ্রেস’ নামে বিশেষ এক ট্রেন, যা যাত্রীদের নিয়ে…
রাশিয়ার অন্যতম পরিচিত স্বাধীন সংবাদপত্র ‘নোভায়া গেজেতা’র কার্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। তিন দশক ধরে ব্যবহৃত কার্যালয়টি ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে পত্রিকাটির কর্মীরা। এরই মধ্যে অফিসের আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বাক্স ও ব্যাগে গুছিয়ে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পত্রিকাটির অভিযোগ, সরকারের ধারাবাহিক চাপ ও নানা বিধিনিষেধের কারণে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৩০ বছর ধরে রাশিয়ার অন্যতম প্রধান স্বাধীন সংবাদমাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে ‘নোভায়া গেজেতা’। সরকারের সমালোচনা, দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং সরকারি কর্মকর্তা ও আমলাদের ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য পরিচিত ছিল সংবাদপত্রটি। তবে এখন শুধু কার্যালয় ছাড়তে হচ্ছে না, পাঠকদের কাছ থেকে অনুদান পাওয়ার পথও বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে পত্রিকাটি।
সংবাদপত্রটির সাংবাদিক ও সহপ্রতিষ্ঠাতা দিমিত্রি মুরাতভ বলেন, ‘কাউকে হত্যা করার অনেক উপায় আছে। তারা আমাদের শ্বাসরোধ করে মারার পথ বেছে নিয়েছে।’ তিনি জানান, প্রথমে তাদের ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর ছাপা পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করতে বাধ্য করা হয় এবং পরে সংবাদমাধ্যমটির লাইসেন্স বাতিল করা হয়। একে একে সাংবাদিকদের বিদেশি এজেন্ট হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এমনকি তাদের ওপর হামলাও চালানো হয়েছে।
মুরাতভ আরও বলেন, এখন তারা কোনো অর্থ উপার্জন করতে পারছেন না। পাঠকেরা অনুদান দিতে চাইলেও ব্যাংকগুলো সেই অর্থ গ্রহণ করতে চাইছে না। তার ভাষায়, রাশিয়ায় রাজনৈতিক দমন-পীড়ন চলছে এবং এবার সেই দমন-পীড়নের শিকার হয়েছে তাদের সংবাদমাধ্যমও।
২০২১ সালে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় অবদানের জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার পান দিমিত্রি মুরাতভ। পুরস্কার ঘোষণার সময় নোবেল কমিটি বলেছিল, গণতন্ত্র ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পরও মুরাতভের ওপর চাপ কমেনি। ২০২৩ সালে রুশ কর্তৃপক্ষ তাকে ‘বিদেশি এজেন্ট’ হিসেবে ঘোষণা করে। রাশিয়ায় সরকারের সমালোচকদের বিরুদ্ধে প্রায়ই এই পরিচয় ব্যবহার করা হয়।
দীর্ঘদিন ধরে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য সুনাম ছিল ‘নোভায়া গেজেতা’র। পত্রিকাটি দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ক্ষমতাসীনদের অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করত। তবে রাশিয়ায় এসব বিষয়ে সাংবাদিকতা করা বরাবরই ঝুঁকিপূর্ণ। পত্রিকাটির দাবি, পেশাগত ও নাগরিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাদের ছয়জন সহকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে।
নিহত সাংবাদিকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আনা পলিতকভস্কায়া। ঠিক ২০ বছর আগে, চলতি অক্টোবর মাসেই নিজের অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের সিঁড়িতে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। চেচনিয়ার যুদ্ধ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য পরিচিত ছিলেন তিনি।
‘নোভায়া গেজেতা’র কার্যালয়ের একটি কক্ষে কাজ করতেন আনা। তার মৃত্যুর পর কক্ষটি ও এর ভেতরের জিনিসপত্র স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়। পরে কক্ষটিকে তার স্মরণে ছোট একটি জাদুঘরে রূপ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কার্যালয় ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশের পর সেখানকার বেশির ভাগ জিনিস সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এখন কক্ষে পড়ে আছে শুধু আনার কাজের টেবিল। টেবিলের ওপর রাখা রয়েছে তার একটি ছবি।
পত্রিকাটি বন্ধ হওয়ার ঘোষণা দিয়ে নিজেদের ওয়েবসাইটে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে। এতে রুশ কর্তৃপক্ষ ও দেশটির বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে সংবাদমাধ্যমটির কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য করার অভিযোগ তোলা হয়েছে। বিবৃতির শুরুতে বলা হয়েছে, ‘তারা আমাদের হত্যা করেছে। সংবাদপত্রটির আর অস্তিত্ব নেই।’ পত্রিকাটির দাবি, তাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে একের পর এক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর জন্য রাশিয়ার দমনমূলক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে দায়ী করেছে তারা।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, রাশিয়ায় মানবাধিকার ও স্বাধীনতা ধ্বংস করা হয়েছে। এসব অধিকার রক্ষার চেষ্টা করাকেও অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। আইন ও বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হয়েছে। এখন নিজের বিশ্বাস ও মতামত প্রকাশ করাকেও রাষ্ট্রের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে সংবাদপত্রটি।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার হামলা শুরুর পর দেশটিতে স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর চাপ আরও বেড়েছে। ক্রেমলিন এই যুদ্ধকে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ বলে উল্লেখ করে। হামলা শুরুর কিছুদিন পরই রাশিয়ায় নতুন আইন করা হয়। এসব আইনের মাধ্যমে যুদ্ধ ও সরকারের সমালোচনাকারীদের শাস্তি দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে ‘নোভায়া গেজেতা’র কার্যালয়ে তল্লাশি চালায় পুলিশ। এ সময় পত্রিকাটির অভিজ্ঞ অনুসন্ধানী সাংবাদিক ওলেগ রলদুগিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে কম্পিউটারে সংরক্ষিত তথ্যে বেআইনিভাবে প্রবেশের অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ঘটনার পর সম্প্রতি পত্রিকাটির বর্তমান প্রধান সম্পাদক সের্গেই সোকোলভকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যায় পুলিশ। তার বাড়িতেও তল্লাশি চালানো হয়।
এত চাপের মধ্যেও সীমিত পরিসরে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিল ‘নোভায়া গেজেতা’। নিয়মিত পাঠকেরা ভিপিএন ব্যবহার করে সরকারি বাধা এড়িয়ে পত্রিকাটির ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতেন। কিন্তু লাইসেন্স বাতিলসহ একের পর এক বিধিনিষেধের কারণে সংবাদমাধ্যমটির পক্ষে কাজ চালিয়ে যাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ে।
পত্রিকাটির ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে দিমিত্রি মুরাতভ বলেন, তারা এখন ভয়াবহ সংকটের মধ্যে রয়েছেন। তার মতে, বিশ্বের বিভিন্ন স্বৈরাচারী শাসক বিশৃঙ্খলা তৈরি করে নিজেদের দেশ ও জনগণের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে এবং ব্যক্তিগত ক্ষমতা শক্তিশালী করতে চান।
এরপর কী ঘটবে, তা তিনি জানেন না উল্লেখ করে মুরাতভ বলেন, নিজেদের মূল্যবোধ ধরে রাখতে তারা সবকিছু করবেন। সেই মূল্যবোধের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার। রাষ্ট্রের অধিকারের চেয়ে মানবাধিকার বড় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
‘নোভায়া গেজেতা’র কার্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়া রাশিয়ার স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিন দশক ধরে সরকারের সমালোচনা, দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা সংবাদমাধ্যমটির এই পরিণতি দেশটিতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংকটকে আরও স্পষ্ট করেছে। রাশিয়ায় স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিসর যে ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে, পত্রিকাটির কার্যক্রম বন্ধের ঘটনা তারই আরেকটি উদাহরণ।
সুত্রঃ বিবিসি
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au