বাংলাদেশ

সংস্কার ছাড়া নিম্ন প্রবৃদ্ধির ফাঁদ থেকে বের হতে পারবে না বাংলাদেশ

  • 1:24 pm - October 31, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৪৫ বার
বিশ্বব্যাংক ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ৪ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। ছবি : সংগৃহীত

প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত সংস্কার না হলে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন নিম্ন প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের সংকটে আটকে থাকতে পারে বলে সতর্ক করেছেন অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন। তাঁর মতে, দেশের অর্থনীতির বর্তমান দুর্বলতা কাটাতে শুধু স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। ব্যাংকিং খাত, বিনিয়োগ, জ্বালানি, রাজস্ব আদায় ও সরকারি ব্যয়ের ব্যবস্থাপনায় মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে।

 ২৭ অক্টোবর প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাস তুলে ধরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) অক্টোবর ২০২৬-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ২ শতাংশ। গত এপ্রিলে সংস্থাটি এই হার ৪ দশমিক ৩ শতাংশ হবে বলে ধারণা দিয়েছিল। আইএমএফের পূর্বাভাসে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি আরও কমে ২ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। পরে ধীরে ধীরে বেড়ে ২০৩০-৩১ অর্থবছরে প্রায় ৩ শতাংশে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংক ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ৪ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। তবে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সরকারের পূর্বাভাসে বড় পার্থক্য রয়েছে। আইএমএফের হিসাবে, এ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ৫ শতাংশ।

ফাহমিদা খাতুনের মতে, এসব পূর্বাভাস নিশ্চিত ফলাফল নয়। তবে এগুলো দেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থার সঙ্গে কাঙ্ক্ষিত পুনরুদ্ধারের ব্যবধান স্পষ্ট করে। আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের পূর্বাভাসে কিছু পার্থক্য থাকলেও তিনটি সংস্থাই দুর্বল প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির ঝুঁকির বিষয়ে একমত। তাই অর্থনীতির সংকট মোকাবিলায় সরকারকে সমন্বিত উদ্যোগ ও গভীর কাঠামোগত সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

নিবন্ধে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে বিঘ্ন বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। আমদানিনির্ভর জ্বালানির কারণে এসব পরিস্থিতিতে দেশের উৎপাদন, পরিবহন ও আমদানি ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য নিয়ে অনিশ্চয়তা রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

তবে দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো আরও দীর্ঘস্থায়ী বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ। তাঁর মতে, বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যাওয়া, ঋণের উচ্চ সুদ, পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা ব্যবসায়ীদের আস্থা দুর্বল করেছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানিসংকট, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, কম রাজস্ব আদায় এবং সরকারি বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতার কারণে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো বেসরকারি বিনিয়োগ সংকুচিত হয়েছে।

ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাকে অর্থনীতির অন্যতম বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন ফাহমিদা খাতুন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংক খাতের মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ ছিল খেলাপি ঋণ। তাঁর মতে, বিপুল খেলাপি ঋণ ও দুর্বল সুশাসনের কারণে ব্যাংকগুলো উৎপাদনশীল খাতে কার্যকরভাবে অর্থায়ন করতে পারছে না। অন্যদিকে ঋণগ্রস্ত ও আয় কমে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোও নতুন বিনিয়োগের জন্য ঋণ নিতে পারছে না। ফলে ব্যাংক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান উভয়ের আর্থিক দুর্বলতা একে অপরের সংকট আরও বাড়িয়ে তুলছে।

অর্থনৈতিক দুর্বলতার প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনেও পড়ছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মুখে পড়েছেন। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় ও মজুরির ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের অক্টোবরের বাংলাদেশ উন্নয়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ২০২২ সালের ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে কমে ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশে নেমেছে। প্রবাসী আয় পরিবারগুলোকে সহায়তা করছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়াচ্ছে। তবে বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীল ব্যবসার মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির বিকল্প হতে পারে না প্রবাসী আয়।

রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতাও অর্থনীতির জন্য বড় সমস্যা বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় রাজস্ব আদায়ের হার ছিল প্রায় ৮ শতাংশ। এতে অবকাঠামো, জনসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয়ের সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে ঋণের সুদ পরিশোধে সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। সরকারি ঋণ বাড়ার পাশাপাশি চলতি হিসাবের ঘাটতি ও জ্বালানি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধির কারণে টাকার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।

অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েকটি ক্ষেত্রে জরুরি সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছেন ফাহমিদা খাতুন। প্রথমত, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংককে ব্যাংকগুলোর সম্পদের গুণগত মান যাচাইয়ের প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে খেলাপি ঋণ আদায়, লোকসান স্বীকার এবং মূলধন ঘাটতি পূরণে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কার্যকর পরিকল্পনা নিতে হবে। কোনো ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানকে সরকারি অর্থ সহায়তা দেওয়া হলে তার সঙ্গে কঠোর শর্ত, জবাবদিহি এবং ঋণ পুনরুদ্ধারের বাস্তব পরিকল্পনা যুক্ত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে রাজস্ব ও মুদ্রানীতিতে সমন্বয় প্রয়োজন। অগ্রাধিকারহীন সরকারি ব্যয় কমানো, অতিরিক্ত অভ্যন্তরীণ ঋণ গ্রহণ এড়িয়ে চলা, করের আওতা বাড়ানো এবং কর অব্যাহতির বিষয়গুলো পর্যালোচনার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংস্কার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সময়সূচিও প্রকাশ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।

তৃতীয়ত, সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে অবকাঠামো প্রকল্প গ্রহণের আগে জমি, নকশা, অর্থায়ন ও দরপত্রসংক্রান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে। প্রকল্পের ব্যয়, অগ্রগতি ও প্রত্যাশিত সুফল জনগণের সামনে প্রকাশ করার পাশাপাশি নির্মাণ-পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও অর্থ বরাদ্দ রাখতে হবে। শুধু ব্যয় বাড়ালেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে না, প্রকল্পের মাধ্যমে পরিবহন, জ্বালানি, যোগাযোগ ও জনসেবার উন্নতি নিশ্চিত করতে হবে।

এ ছাড়া জ্বালানি সরবরাহ নির্ভরযোগ্য করা এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের দরপত্র, ব্যয় ও কাজ শেষ করার সময়সূচি প্রকাশ, বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির তথ্য উন্মুক্ত করা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা বাবদ অর্থ পরিশোধের বিষয়টি পর্যালোচনার পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা উন্নত করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণের কথা বলেছেন। ব্যবসার অনুমোদন ও শুল্কসংক্রান্ত প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিকে নিয়োগদাতাদের চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করার ওপরও জোর দিয়েছেন তিনি।

ফাহমিদা খাতুনের মতে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকটের সমাধানে অন্য দেশের নীতিমালা হুবহু অনুসরণ করার প্রয়োজন নেই। বরং ব্যাংক, ঋণগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, জ্বালানি ব্যয়, দুর্বল রাজস্ব আদায় ও বিনিয়োগের সমস্যাগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক বিবেচনায় নিয়ে দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সংস্কার করতে হবে।

তিনি বলেন, এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্য অর্জন করতে হলে উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগ, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের সংকট কাটাতে দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর সমাধান জরুরি। আইন, কমিশন ও নীতিগত ঘোষণাকে বাস্তব ফলাফলে রূপ দিতে হবে। তা না হলে বাংলাদেশ দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতিতে পড়তে পারে।

সুত্রঃ দ্য ডেইলি স্টার

এই শাখার আরও খবর

৩০ নভেম্বর থেকে যুক্তরাজ্যের শিক্ষার্থী ভিসায় নতুন নিয়ম

যুক্তরাজ্যে শিক্ষার্থী ভিসার আবেদনে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা প্রমাণে ব্যাংক হিসাবে আগের চেয়ে বেশি অর্থ দেখাতে হবে। আগামী ৩০ নভেম্বর ২০২৬ থেকে নতুন এ নিয়ম…

কারওয়ান বাজারের বিএসইসি ভবনে বারবার আগুন, এখন কতটা নিরাপদ?

ওটিএন বাংলা রিপোর্ট : রাজধানীর কারওয়ান বাজারের বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশন (বিএসইসি) ভবনে একাধিকবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ২০০৭ সালে ভয়াবহ আগুনে প্রাণহানি, ২০১০ সালে…

ইনানীতে গ্যাসের সঙ্গে বেরিয়ে আসছে তেলও, আগুন আরও কতদিন জ্বলবে

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানী ইউনিয়নের ছোটখাল এলাকায় গভীর নলকূপ খননের সময় ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া গ্যাসের সঙ্গে এবার তরল হাইড্রোকার্বন বা তেলের উপস্থিতিও পেয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম…

মার্কিন নির্বাচনে এবার আগাম ভোটের রেকর্ড?

আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আগামী দুই বছরের জন্য কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কোন রাজনৈতিক দলের হাতে থাকবে,…

খুলনায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড, সন্ধ্যার পর বের হচ্ছে না মানুষ

ওটিএন বাংলা রিপোর্ট: খুলনায় খুন, ছিনতাই, অপহরণ ও মাদক কারবারের ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান, বিপুলসংখ্যক মামলা ও গ্রেপ্তারের পরও থামছে না…

গুলির মুখে সহকর্মী ও আহত ব্যক্তিকে সহায়তা: জাতীয় সাহসিকতার পুরস্কার পেলেন নেপালি বংশোদ্ভূত পুলিশ কর্মকর্তা

ওটিএন বাংলা, অস্ট্রেলিয়া: সিডনির ক্রয়ডন পার্কে গোলাগুলির সময় নিজের নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে সহকর্মী ও আহত এক ব্যক্তিকে সহায়তা করায় অস্ট্রেলিয়ার ২০২৬ সালের জাতীয় সাহসিকতার পুরস্কার…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au