১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের নতুন দাম ২ হাজার ৬০ টাকা
ভোক্তা পর্যায়ে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম ২২৩ টাকা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার…
সরকারি গেজেটে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি থাকলেও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পরিচালিত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অবস্থা ও দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিরূপণ জরিপে বাদ পড়েছেন বর্মণ ও কোচ সম্প্রদায়ের বহু মানুষ। শুধু তাই নয়, জেলা প্রশাসকের দেওয়া ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রত্যয়নপত্র থাকার পরও উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় বর্মণ সম্প্রদায়ের সদস্যদের ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত না করে ‘বাঙালি বর্মণ সনাতন’ পরিচয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় বর্মণ সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, সরকারি স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও জরিপে অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক শর্ত আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যানে তাদের প্রকৃত জাতিগত পরিচয় ও জনসংখ্যার চিত্র বিকৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিবিএসের এই জরিপের মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ শুরু হয় গত ১ অক্টোবর। প্রাথমিকভাবে ২৫ অক্টোবর গণনা শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পরে সময় বাড়িয়ে ৩০ অক্টোবর করা হয়। তবে বর্ধিত সময়েও উত্তরাঞ্চলের বর্মণ ও কোচ জনগোষ্ঠীর অনেক পরিবার জরিপের বাইরে থেকে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে জরিপের মেয়াদ আরও অন্তত এক সপ্তাহ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ কোচ-রাজবংশী-বর্মণ সংগঠন।
সংগঠনটির সভাপতি দিনবন্ধু বর্মণ বলেন, সরকারি গেজেটে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও প্রত্যয়নপত্র নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি এবং প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার কারণে অনেক বর্মণ ও কোচ পরিবার গণনার বাইরে রয়ে গেছে। তাই প্রয়োজন হলে জরিপের সময় আরও এক সপ্তাহ বাড়ানোর দাবি জানানো হয়েছে।
তিনি জানান, ৩০ অক্টোবর জরিপের শেষ দিনে প্রকল্প পরিচালক ফারহানা সুলতানার কাছে এ বিষয়ে লিখিত আবেদন করা হয়েছে। আবেদনের অনুলিপি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের কাছেও পাঠানো হয়েছে।
বর্মণদের জাতিগত পরিচয় নিয়ে বিতর্ক
বর্মণদের পরিচয় নিয়ে বিতর্কের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট। হিন্দু বর্ণপ্রথায় ‘বর্মণ’ বা ‘রায়বর্মণ’ একটি পরিচিত পদবি। বাংলাদেশে বিভিন্ন অঞ্চলের বাঙালি হিন্দুদের মধ্যেও এই পদবির প্রচলন রয়েছে। ফলে কোচ ও রাজবংশী বংশোদ্ভূত বর্মণদের অনেক সময় সাধারণ বাঙালি হিন্দু জনগোষ্ঠীর সঙ্গে এক করে দেখা হয়।
তবে রাজশাহী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন অঞ্চলের বর্মণ সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের স্বতন্ত্র ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসছে।
বাংলাদেশ সরকারের ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন, ২০১০’ এবং ২০১৯ সালের সংশোধিত প্রজ্ঞাপনে স্বীকৃত ৫০টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর তালিকায় বর্মণ ও কোচ উভয় সম্প্রদায়ের নাম আলাদাভাবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এই স্বীকৃতি কার্যকর করার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের একাংশের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিতর্কের আরেকটি দিক হলো, আদিবাসী সংগঠনগুলোর মধ্যেই বর্মণদের জাতিগত পরিচয় ও জরিপে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ফেডারেশনের ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি জিতেন তির্কি বর্মণদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ের বর্মণদের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর পরিচয় কতটা প্রযোজ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শুধু সরকারি গেজেট বা প্রত্যয়নপত্রের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত না নিয়ে তাদের আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য যাচাই করা প্রয়োজন।
একই ধরনের আপত্তি জানিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় আদিবাসী পরিষদের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক বিভূতী ভূষণ মাহাতো। তিনি বলেন, রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলের বর্মণদের একটি অংশ অতীতে নিজেদের আদিবাসী হিসেবে পরিচয় দিতে চাইতেন না। এমনকি ১৯৫০ সালের প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৭ ধারায় সংরক্ষিত আদিবাসী তালিকা থেকে নিজেদের নাম বাদ দেওয়ার দাবিও উঠেছিল বলে প্রবীণদের কাছে শুনেছেন তিনি।
তবে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও আদিবাসীবিষয়ক গবেষক ফারহা তানজীম তিতিল মনে করেন, বর্মণদের পরিচয় নিয়ে বিতর্ক বুঝতে হলে ইতিহাস ও সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হবে।
তার মতে, ভারতের আসাম, ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কোচ ও রাজবংশী জনগোষ্ঠীর একটি অংশ ঐতিহাসিকভাবে সনাতন হিন্দু ধর্মীয় রীতিনীতি গ্রহণের মধ্য দিয়ে ‘বর্মণ’ পদবি ধারণ করে। ফলে কোচ, রাজবংশী ও বর্মণদের মধ্যে ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক সম্পর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যেও বর্মণ পদবির ব্যবহার থাকায় পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ১৯৫০ সালের প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৭ ধারায় তালিকাভুক্ত আদিবাসীদের জমি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে বিশেষ বিধিনিষেধ ছিল। জেলা প্রশাসকের লিখিত অনুমতি ছাড়া অ-আদিবাসীদের কাছে জমি বিক্রি বা হস্তান্তরের সুযোগ সীমিত থাকায় তৎকালীন সময়ে বর্মণদের একটি অংশ নিজেদের আদিবাসী পরিচয় থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। পাশাপাশি বাঙালি হিন্দু পরিচয়ে সামাজিক স্বস্তি পাওয়ার প্রবণতাও ছিল।
তবে নতুন প্রজন্মের মধ্যে নিজেদের ঐতিহাসিক শিকড় ও জাতিগত পরিচয় পুনরুদ্ধারের আগ্রহ তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন এই গবেষক। তার মতে, সরকারি গেজেটে যেখানে বর্মণদের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি রয়েছে, সেখানে আদিবাসী সংগঠনগুলোর উচিত নতুন করে বিরোধ তৈরি না করে সমাধানের পথ খোঁজা।
বসতির তথ্যেও অসংগতি
বর্মণদের জরিপ থেকে বাদ পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে বিবিএসের তথ্যসংগ্রহ নির্দেশিকায় তাদের বসতির ভৌগোলিক বিস্তৃতি সীমিতভাবে উল্লেখ করার বিষয়টি সামনে এসেছে।
জরিপের ‘ফুল কাউন্ট জরিপ তথ্যসংগ্রহ নির্দেশিকা’ অনুযায়ী, স্বীকৃত ৫০টি জনগোষ্ঠীর তালিকায় দুই নম্বরে রয়েছে কোচ এবং ১৫ নম্বরে বর্মণ সম্প্রদায়। নির্দেশিকায় বর্মণদের প্রধান বসতি হিসেবে বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও গাজীপুরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে কোচদের ক্ষেত্রে বৃহত্তর ময়মনসিংহ, গাজীপুর ও উত্তরাঞ্চলের কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু ২০২২ সালের জনশুমারির তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বর্মণদের বসতি রয়েছে। বাংলাদেশ কোচ-রাজবংশী-বর্মণ সংগঠনের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সুকান্ত বর্মণের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ৪৪ হাজার ৬৭১ জন বর্মণ রয়েছেন। এর মধ্যে রাজশাহী বিভাগে ২১ হাজার ২০৫ জন, রংপুর বিভাগে ৭ হাজার ৬৪৬ জন এবং ঢাকা বিভাগে ৯ হাজার ৮২২ জনের বসবাস। ময়মনসিংহ বিভাগে রয়েছেন ২ হাজার ৭৩৩ জন।
এ ছাড়া খুলনা বিভাগে ২ হাজার ৬১৫ জন, সিলেটে ৪৭২ জন, চট্টগ্রামে ১৭৪ জন এবং বরিশালে চারজন বর্মণ রয়েছেন।
সুকান্ত বর্মণের অভিযোগ, জনশুমারির এই তথ্য থাকা সত্ত্বেও জরিপ নির্দেশিকায় বর্মণদের বসতি সম্পর্কে অসম্পূর্ণ তথ্য দেওয়া হয়েছে। ফলে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের বিপুলসংখ্যক বর্মণ পরিবারের কাছে জরিপকর্মীরা পৌঁছাতে পারেননি।
তিনি বলেন, নির্দেশিকায় বর্মণদের প্রধান বসতি হিসেবে বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও গাজীপুরকে গুরুত্ব দেওয়ায় উত্তরাঞ্চলের বড় জনগোষ্ঠী কার্যত জরিপের বাইরে থেকে গেছে।
প্রত্যয়নপত্র থাকার পরও ‘বাঙালি’ পরিচয়ে তথ্য সংগ্রহ
উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় জেলা প্রশাসকের প্রত্যয়নপত্র থাকা সত্ত্বেও বর্মণ সম্প্রদায়ের সদস্যদের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত না করার অভিযোগ উঠেছে। যাদের প্রত্যয়নপত্র নেই, তাদের অনেককে সরাসরি জরিপের বাইরে রাখা হয়েছে। আর যাদের প্রত্যয়নপত্র রয়েছে, তাদের কারও কারও তথ্য ‘বাঙালি বর্মণ সনাতন’ পরিচয়ে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।
পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার মেহেরপুর গ্রামের বাসিন্দা জবা রানী বর্মণ জানান, তার কাছে জেলা প্রশাসকের দেওয়া ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রত্যয়নপত্র রয়েছে। এরপরও জরিপকর্মীরা তাকে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত না করে ‘বাঙালি বর্মণ সনাতন’ হিসেবে নথিভুক্ত করেছেন।
এ বিষয়ে ওই এলাকার তথ্যসংগ্রহকারী বিসু কিস্কু জানান, পরিসংখ্যান ব্যুরোর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি তথ্য সংগ্রহ করেছেন।
তিনি বলেন, যাদের প্রত্যয়নপত্র নেই, তাদের গণনায় অন্তর্ভুক্ত না করতে বলা হয়েছিল। আর যাদের প্রত্যয়নপত্র রয়েছে, তাদের তথ্য নিতে বলা হয়। তবে বর্মণদের ক্ষেত্রে প্রত্যেকের তথ্যের মন্তব্যের ঘরে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’র পরিবর্তে ‘বাঙালি বর্মণ সনাতন’ লেখা হয়েছে। এটি ছিল তাদের প্রতি দেওয়া নির্দেশনা।
ঠাকুরগাঁও সদর ও রাণীশংকৈল উপজেলার বর্মণ সম্প্রদায়ের সদস্যরাও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। তাদের দাবি, অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে প্রত্যয়নপত্র বাধ্যতামূলক না হলেও বর্মণদের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই জেলা প্রশাসকের সনদ চাওয়া হয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে সনদ দেখাতে না পারলে সংশ্লিষ্ট পরিবারকে জরিপের বাইরে রাখা হয়েছে।
কোচ পরিবারগুলোর তথ্য সংগ্রহ নিয়েও অভিযোগ
শুধু বর্মণ নয়, কোচ সম্প্রদায়ের পরিবারগুলোও জরিপে বাদ পড়ার অভিযোগ তুলেছে।
ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার চৌটাকী গ্রামে কোচ সম্প্রদায়ের ১০ থেকে ১২টি পরিবারের বসবাস। স্থানীয় প্রতিনিধি অবকাশ রায় অভিযোগ করেন, ওই এলাকায় জরিপকর্মীরা তথ্য সংগ্রহ করতে না আসায় তিনি নিজে থেকেই সংশ্লিষ্ট তথ্যসংগ্রহকারী শাহানাজ পারভীনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। এ বিষয়ে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠালেও কোনো উত্তর পাননি।
অবকাশ রায় বলেন, নিজেদের জনগোষ্ঠীর নাম জরিপে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ফোন ও বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
তবে তথ্যসংগ্রহকারী শাহানাজ পারভীন বলেন, তারা এলাকায় গিয়ে স্থানীয়দের কাছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বসতি সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন। স্থানীয়রা যাদের বাড়ি দেখিয়েছেন, কেবল তাদের তথ্যই সংগ্রহ করা হয়েছে। কেউ কোচ সম্প্রদায়ের বসতির কথা জানাননি।
প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বক্তব্যে ভিন্নতা
জরিপের মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ নিয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও অসংগতি পাওয়া গেছে।
রংপুর বিভাগীয় পরিসংখ্যান কার্যালয়ের যুগ্ম পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুসরণ করেই বর্মণদের প্রত্যয়নপত্র যাচাই করে ‘বাঙালি বর্মণ সনাতন’ হিসেবে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে এই পরিচয়ে তথ্য নেওয়ার কারণে তারা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মূল তালিকা থেকে বাদ পড়বেন কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন।
তার ভাষ্য, জরিপ থেকে তাদের তথ্য বাদ পড়বে না। তবে জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে তারা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর তালিকায় থাকবেন কি না, তা কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান বিভাগ বলতে পারবে।
পঞ্চগড় জেলা পরিসংখ্যান কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. এনামুল হকও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, আটোয়ারী এলাকায় বর্মণদের অনেকে নিজেদের বাঙালি বর্মণ হিসেবে পরিচয় দেন। তাই যাদের জেলা প্রশাসকের প্রত্যয়নপত্র রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রেও খানার পরিচয়ে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ না লিখে ‘বাঙালি বর্মণ সনাতন’ লেখার নির্দেশনা ছিল।
তবে ঠাকুরগাঁও জেলা পরিসংখ্যান কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. ফয়সাল হাসান জানিয়েছেন, তার জেলায় জেলা প্রশাসকের প্রত্যয়নপত্রধারী বর্মণদের সরাসরি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। সে অনুযায়ী তথ্যও সংগ্রহ করা হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালকের বক্তব্য
সার্বিক অভিযোগের বিষয়ে জরিপ প্রকল্পের পরিচালক ফারহানা সুলতানা বলেন, জেলা প্রশাসকের প্রত্যয়নপত্র থাকা ব্যক্তিদের কোনো ধরনের অতিরিক্ত যাচাই ছাড়াই জরিপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আর যাদের প্রত্যয়নপত্র নেই, তাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় রীতিনীতি মাঠপর্যায়ে যাচাই করে তথ্য নেওয়া হয়েছে।
বর্মণদের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রত্যয়নপত্রের শর্ত আরোপের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, বর্মণদের মধ্যে কেউ বাঙালি, আবার কেউ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সদস্য। চাকমা, মারমা বা গারোদের ক্ষেত্রে এ ধরনের পরিচয়গত দ্বিধা নেই।
বিবিএসের নিজস্ব নির্দেশিকায় বর্মণদের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী হিসেবে তালিকাভুক্ত থাকার বিষয়টি তুলে ধরা হলে ফারহানা সুলতানা বলেন, ওই তালিকা সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তৈরি। বিবিএসের নয়। মাঠপর্যায়ে বর্মণদের পরিচয় নিয়ে বিতর্ক থাকায় তাদের ক্ষেত্রে প্রত্যয়নপত্রের শর্ত প্রযোজ্য করা হয়েছে।
তবে কোচ সম্প্রদায়ের তথ্য সংগ্রহে কোনো ধরনের প্রত্যয়নপত্রের বাধ্যবাধকতা নেই বলে দাবি করেন তিনি।
আদিবাসী সংগঠনগুলোর বিরোধিতার অভিযোগ
বর্মণদের জরিপে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে আদিবাসী সংগঠনগুলোর একাংশের বিরোধিতার বিষয়টিও সামনে এসেছে। বাংলাদেশ কোচ-রাজবংশী-বর্মণ সংগঠনের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সুকান্ত বর্মণ জানান, ১৫ অক্টোবর বর্মণদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আবেদন জানিয়ে তিনি পরিসংখ্যান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফিরোজ সরকারের কাছে চিঠি দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৫ অক্টোবর পরিসংখ্যান ব্যুরোতে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
সুকান্ত বর্মণের অভিযোগ, ওই বৈঠকে বর্মণ সম্প্রদায়ের আরও কয়েকজন প্রতিনিধিকে সঙ্গে নেওয়ার আবেদন জানানো হলেও প্রকল্প পরিচালক তা নাকচ করেন। বৈঠকে উপস্থিত পাঁচজন আদিবাসী নেতাই বর্মণদের অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতা করেন। তাদের কেউ কেউ সরকারি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর তালিকায় বর্মণদের নাম ভুলবশত এসেছে বলেও দাবি করেন।
তবে বাংলাদেশ নৃ-গোষ্ঠী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের সভাপতি শিপন চন্দ্র সিং সর্দার বর্মণদের অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতা করার কথা স্বীকার করেছেন। তার দাবি, বর্মণদের একটি বড় অংশ অতীতে নিজেদের আদিবাসী পরিচয় অস্বীকার করেছে এবং সরকারি গেজেট থেকে নাম বাদ দেওয়ার দাবিতে উচ্চ আদালতে রিটও করেছে। অথচ বর্তমানে তাদের নতুন প্রজন্ম শিক্ষা ও চাকরিতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ কোটা সুবিধা নিতে আগ্রহী। এ কারণেই তাদের দাবির পেছনের উদ্দেশ্য যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
প্রকল্প পরিচালক ফারহানা সুলতানাও বৈঠকে বর্মণদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে অন্য নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের আপত্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তার ভাষ্য, বর্মণদের জরিপে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে শুরু থেকেই বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা আপত্তি জানিয়ে আসছেন। বৈঠকেও তারা সেই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এমনকি বর্মণদের তালিকায় যুক্ত করা হলে মানববন্ধনসহ প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন।
এদিকে জরিপের সময় আরও এক সপ্তাহ বাড়ানোর বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক জানান, এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
স্ব-স্বীকৃতির ভিত্তিতে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব
বর্মণদের পরিচয় নিয়ে বিরোধ নিরসনে স্ব-স্বীকৃতির ভিত্তিতে জরিপে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন কয়েকজন আদিবাসী নেতা ও গবেষক।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের কেন্দ্রীয় সদস্য দীপায়ন খীসা মনে করেন, সরকারি গেজেটে বর্মণদের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি থাকায় যারা নিজেদের সেই পরিচয়ে পরিচিত করতে চান, তাদের জরিপে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, গাজীপুরের বর্মণরা নিজেদের আদিবাসী পরিচয় ধরে রাখলেও পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওয়ের বর্মণদের মধ্যে পরিচয়গত দ্বৈততা রয়েছে। কোচ ও বর্মণ উভয় সম্প্রদায়ই আদিবাসী ফোরামের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। তাই আত্মপরিচয় নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ এবং সরকারি জরিপে অংশগ্রহণের অধিকার আদায়ে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
দিনাজপুর জেলা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মানিক সরেনও বর্মণদের ক্ষেত্রে বিশেষ শর্ত আরোপের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
তিনি বলেন, সরকারের স্বীকৃত ৫০টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর তালিকায় কোচ ও বর্মণ উভয় সম্প্রদায়ের নাম রয়েছে। সাঁওতাল, চাকমা কিংবা গারোদের ক্ষেত্রে প্রত্যয়নপত্রের জটিলতা না থাকলে বর্মণদের ক্ষেত্রে কেন তা বাধ্যতামূলক করা হবে, সেই প্রশ্ন রয়েছে।
মানিক সরেনের মতে, বর্মণদের মধ্যে অতীতে আত্মপরিচয় নিয়ে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে বিবিএস স্ব-স্বীকৃতির পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারে। যারা নিজেদের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে পরিচয় দিতে চান এবং জরিপে অংশ নিতে আগ্রহী, তাদের অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। অন্যদিকে যারা এই পরিচয় গ্রহণ করতে চান না, তাদের ক্ষেত্রে সেই সিদ্ধান্তকে সম্মান জানানো যেতে পারে।
সব মিলিয়ে সরকারি স্বীকৃতি, ঐতিহাসিক পরিচয়, আঞ্চলিক বৈচিত্র্য এবং সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যকে কেন্দ্র করে বর্মণ ও কোচ জনগোষ্ঠীর জরিপে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। একদিকে সরকারি গেজেটে নাম থাকা, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে প্রত্যয়নপত্রের বাধ্যবাধকতা ও পরিচয় নির্ধারণে ভিন্ন ভিন্ন নির্দেশনা জরিপের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে ২০২২ সালের জনশুমারিতে বর্মণদের যে ভৌগোলিক বিস্তৃতি উঠে এসেছে, তার সঙ্গে বর্তমান জরিপের নির্দেশিকার অসংগতিও সামনে এসেছে।
এ অবস্থায় জরিপে বাদ পড়া পরিবারগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা, তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতিতে সমন্বয় আনা এবং জাতিগত পরিচয় নির্ধারণে স্বচ্ছ নীতিমালা অনুসরণ না করা হলে সরকারি পরিসংখ্যানে বর্মণ ও কোচ জনগোষ্ঠীর প্রকৃত অবস্থান প্রতিফলিত না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au