গাজীপুরে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ। ছবি: সংগৃহীত
ওটিএন বাংলা রিপোর্ট :
পোশাকশ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন চতুর্থ দিনেও থামেনি। রাজধানীর মিরপুর, সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, ভাঙচুর ও সংঘর্ষে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। আন্দোলনের সহিংসতার নেপথ্যে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ইন্ধনের অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে শ্রমিকদের দাবি পূরণ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একসঙ্গে কাজ করছে সরকার।
আজ সোমবার (২ নভেম্বর) সকাল থেকেই গাজীপুরের কোনাবাড়ী, সফিপুর, মৌচাক ও পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় শ্রমিকেরা সড়কে অবস্থান নেন। এতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। দায়িত্ব পালন করছেন ২১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।
সাভারের আশুলিয়াতেও শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। নরসিংহপুর ও নিশ্চিন্তপুর এলাকায় বিক্ষোভ, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে।
গাজীপুরে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষের মধ্যে পুলিশের কাভার্ডভ্যানে আগুন ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। শিল্পাঞ্চল পুলিশ জানিয়েছে, বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ অব্যাহত থাকায় দেড় শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সোমবারের হিসাব অনুযায়ী, মিরপুর, গাজীপুর-ময়মনসিংহ ও সাভার-আশুলিয়া-জিরানী শিল্পাঞ্চলের ৬৭০টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে কাজে যোগ দিতে পারেননি ১৬ লাখ ৮০ হাজার ৫৭২ জন শ্রমিক। তবে নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের কারখানাগুলোতে এ আন্দোলনের প্রভাব পড়েনি।
এর আগে রোববার মিরপুরে আন্দোলন ঘিরে পুলিশের গাড়িতে আগুন, ভাঙচুর ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও পল্লবী মেট্রোরেল স্টেশন প্রায় দুই ঘণ্টা বন্ধ রাখতে হয়। এতে সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ে।
এসব সহিংসতার ঘটনায় আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

গাজীপুরে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ। ছবি: সংগৃহীত
ডিবির মিরপুর বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান জানান, পুলিশের ওপর হামলা ও সরকারি গাড়িতে অগ্নিসংযোগের অভিযোগে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ১১ নেতাকর্মীকে ঘটনাস্থল থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ডিবির দাবি, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা স্থানীয় পোশাক কারখানার শ্রমিক নন। বিভিন্ন জেলা থেকে এসে তাঁরা শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে নাশকতার চেষ্টা করেছিলেন বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তদন্তাধীন।
এদিকে আজ সচিবালয়ে পোশাক কারখানার মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বৈঠক শেষে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট কিছু শিল্পমালিক শ্রমিক অসন্তোষ উসকে দিচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীও রয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, কারখানার মালিকদের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা করে নতুন মজুরি নির্ধারণের বিষয়েও সরকার কাজ করছে।
এর আগে শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী অভিযোগ করেন, শ্রমিকদের আন্দোলনকে ব্যবহার করে সরকারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী। ডিসেম্বরকে সামনে রেখে এ ধরনের ষড়যন্ত্র চলছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর দাবি, শ্রমিকদের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নয় এমন ব্যক্তিরা আন্দোলনে উসকানি দিচ্ছেন।
রোববার শ্রম মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলনে ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেন শ্রমমন্ত্রী। তিনি শ্রমিকদের রাজপথ ছেড়ে কাজে ফেরার আহ্বান জানান। তাঁর ভাষ্য, নতুন বোর্ডের মাধ্যমে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা হবে।
বর্তমানে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। শ্রমিকদের দাবি, তা বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করতে হবে। পাশাপাশি ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের পুনর্নিয়োগ এবং আন্দোলনকারী শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্তি বন্ধের দাবিও রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রোববার মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেন। সেখানে শ্রমিক আন্দোলন, সহিংসতা এবং শিল্পকারখানার নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়। শ্রমমন্ত্রীর বিদেশ সফরও বাতিল করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা এবং কারখানার স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু রাখার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন।