বিশ্ব

হিমালয়ে বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা, ঝুঁকিতে তিন লাখের বেশি মানুষ

বন্যা, ভূমিধস, হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের পানি উপচে পড়া এবং পাহাড়ধসের মতো ভয়াবহ দুর্যোগের আশঙ্কা

  • 2:32 am - November 03, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৩৭ বার
ভারতের উত্তরাখণ্ডের মতো রাজ্য ও নেপালে বিপুল সংখ্যায় নির্মাণকাজ বেড়েছে। ছবিঃ সংগৃহীত

জলবায়ু পরিবর্তন, হিমবাহ গলে হ্রদের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে হিমালয় অঞ্চলে বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়ছে। নতুন এক গবেষণায় বলা হয়েছে, হিমালয়ের কয়েকটি বিপর্যয়প্রবণ এলাকায় তিন লাখেরও বেশি মানুষ এমন স্থানে বসবাস করছেন, যেখানে বন্যা, ভূমিধস, হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের পানি উপচে পড়া এবং পাহাড়ধসের মতো ভয়াবহ দুর্যোগের আশঙ্কা রয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, নেপালের উত্তরাঞ্চল, দক্ষিণ-পূর্ব তিব্বত এবং ভারতের উত্তরাখণ্ডের বিভিন্ন এলাকায় ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও দ্রুত বাড়ছে আবাসন ও অবকাঠামো নির্মাণ। ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এসব এলাকায় ভবন ও অন্যান্য স্থাপনায় আচ্ছাদিত জমির পরিমাণ প্রায় ৪৫ শতাংশ বেড়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, হিমবাহ গলে সৃষ্ট হ্রদের পানি থেকে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলোতে নির্মাণকাজ বেড়েছে প্রায় ৭৮ শতাংশ।

বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’-এ প্রকাশিত গবেষণাটি যুক্তরাজ্য, নেপাল ও ভারতের নয়জন গবেষক পরিচালনা করেছেন। গবেষণায় হিমালয়ের নদীগুলোর দুই তীর থেকে ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা এবং প্রায় ১ হাজার ৩৬০টি হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের আশপাশের জনবসতি ও অবকাঠামো বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

গবেষকদের মতে, ঝুঁকিতে থাকা মানুষের প্রকৃত সংখ্যা তিন লাখের চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে। কারণ, গবেষণায় হিমালয়ের নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। একই ধরনের ঝুঁকিতে থাকা আশপাশের অনেক এলাকা এই বিশ্লেষণের বাইরে রয়েছে।

নেপালে সাম্প্রতিক কয়েকটি ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা গবেষণার উদ্বেগকে আরও বাস্তব করে তুলেছে। গত ২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যায় দেশটিতে ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের নিখোঁজ হওয়ার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এরপরও বিভিন্ন এলাকায় বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। গত ১১ অক্টোবর বুধি গণ্ডকি নদীতে আকস্মিক বন্যায় প্রায় ২০০টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ভেসে যায় পাঁচটি সেতু এবং নিখোঁজ হন পাঁচজন।

গবেষণায় নদীর পানি ও হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের পানির স্তর থেকে ৫০ মিটার বা প্রায় ১৬৪ ফুট উচ্চতার মধ্যে থাকা ভবনগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তবে বাস্তবে বন্যার পানি এর চেয়েও অনেক বেশি উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। ২৬ আগস্টের বন্যার পর নেপালের রাসুয়া জেলার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, কোনো কোনো এলাকায় নদীর পানি প্রায় ৭০ মিটার বা ২৩০ ফুট পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল। ফলে নদীর তীর থেকে তুলনামূলক দূরে থাকা ভবনও পানির তোড়, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়ে।

হিমালয় অঞ্চলে দ্রুত নগরায়ণ ও পর্যটন অবকাঠামোর সম্প্রসারণকে ঝুঁকি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন গবেষকেরা। বিশেষ করে নেপালের পোখরা শহর ও অন্নপূর্ণা পর্বতাঞ্চলে পর্যটন ব্যবসার প্রসারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নদীর তীরবর্তী এলাকায় গড়ে উঠছে হোটেল, রিসোর্ট, আবাসিক ভবন ও অন্যান্য স্থাপনা।

হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত পোখরা নেপালের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র। গত তিন দশকে শহরটিতে পর্যটকের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। সেই সঙ্গে বিস্তৃত হয়েছে নগরাঞ্চল। তবে শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত সেতি গণ্ডকি নদীকে ঘিরে বড় ধরনের দুর্যোগের আশঙ্কা রয়েছে।

পোখরার মেয়র ধনরাজ আচার্য বলেন, শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত সেতি গণ্ডকি নদীর কারণে সৃষ্ট ঝুঁকি মোকাবিলা করা এখন স্থানীয় প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অন্নপূর্ণা পর্বতমালা থেকে নেমে আসা এই নদীর তীরে অনেক পুরোনো ভবন রয়েছে, যেগুলো নদী থেকে মাত্র পাঁচ মিটার বা ১৬ ফুট দূরে নির্মিত হয়েছে। অথচ নতুন নিয়ম অনুযায়ী, নদীর তীর থেকে আরও নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে ভবন নির্মাণের কথা।

তিনি বলেন, পুরোনো ভবনগুলো কোথায় সরিয়ে নেওয়া হবে এবং কীভাবে সেখান থেকে মানুষকে স্থানান্তর করা হবে, সেটিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

পোখরার উত্তরে অবস্থিত বিশ্বখ্যাত অন্নপূর্ণা ট্রেকিং এলাকাতেও নদীর তীরবর্তী জনবসতি বাড়ছে। সাম্প্রতিক বন্যা ও ভূমিধসে এসব এলাকার কয়েকটি বসতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে পর্যটননির্ভর স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।

অন্নপূর্ণা অঞ্চলে হোমস্টে পরিচালনাকারী ফুরপা শিরিং লামা বলেন, বছরের এই সময়ে সাধারণত পর্যটকদের ভিড় থাকে। তার ২০ কক্ষের হোমস্টে পুরোপুরি অতিথিতে পরিপূর্ণ থাকে। কিন্তু এবার মাত্র পাঁচটি কক্ষে অতিথি রয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে আমরা এই ব্যবসা করছি। কিন্তু এমন দুর্যোগ আগে কখনো দেখিনি।’

একই অঞ্চলের মোদি নদীর কাছে হোটেল পরিচালনা করেন কৃষ্ণ গৌচন। হিমবাহ থেকে নেমে আসা বরফগলা পানির অন্যতম প্রবাহ এই নদীতে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

কৃষ্ণ গৌচনের ভাষায়, হিমবাহে বিস্ফোরণ ঘটলে কিংবা হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদের পানি হঠাৎ বেরিয়ে এলে নদীতে ভয়াবহ বন্যা হতে পারে। এ আশঙ্কা নিয়েই তাদের বসবাস করতে হচ্ছে।

ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি স্থানীয় ক্যাম্পাসের ভূগোল বিভাগের শিক্ষক খগেন্দ্র পৌডেল মনে করেন, পর্যটন খাতে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ প্রাকৃতিক ঝুঁকি বিবেচনা না করেই বিপর্যয়প্রবণ এলাকাগুলোকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলছেন। উত্তর ভারতের হিমালয় অঞ্চলের উপত্যকাগুলোতেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এসব এলাকায় ধর্মীয় তীর্থযাত্রী ও পর্যটকদের ব্যাপক সমাগম ঘটে।

পোখরা হোটেল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি লক্ষ্মণ সুবেদিও মনে করেন, যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়াই ওই অঞ্চলে পর্যটন ব্যবসার সম্প্রসারণ হয়েছে। তার মতে, অপরিকল্পিতভাবে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি আরও বেড়েছে।

তিনি বলেন, ‘দুর্যোগ যখন আসে, তখন অনেক দেরি হয়ে যায়।’ এ ঝুঁকি সম্পর্কে পর্যটন ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের সচেতন করতে সংগঠনটি কাজ করছে বলেও জানান তিনি।

তবে হিমালয়ের বিপর্যয়ের ঝুঁকি শুধু পর্যটন অবকাঠামোর কারণে বাড়ছে না। ভোটেকোশি ও ত্রিশূলি নদীর আশপাশে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। নদীর তীরবর্তী এসব অবকাঠামো আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের সময় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

গবেষণাটির প্রধান লেখক ও যুক্তরাজ্যের লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবাহ বিশেষজ্ঞ সি স্কট ওয়াটসন সতর্ক করে বলেছেন, হিমালয়ের নদী উপত্যকাগুলোতে জনসংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। বর্তমানে উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়ে যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, সেগুলো আগামী কয়েক দশক ধরে এসব এলাকার দুর্যোগঝুঁকির ওপর প্রভাব ফেলবে।

তার মতে, অপরিকল্পিত নির্মাণ শুধু বর্তমান সময়ের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে না, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তন হিমালয়ের এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। বিজ্ঞানীদের মতে, বিশ্বের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির তুলনায় হিমালয় অঞ্চলে তাপমাত্রা প্রায় দ্বিগুণ গতিতে বাড়ছে। এর ফলে হিমবাহ, তুষারাবৃত পাহাড়, বরফের স্তর এবং সারা বছর জমে থাকা বরফ দ্রুত গলে যাচ্ছে।

হিমবাহ গলে যাওয়ার ফলে পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদগুলোতে পানির পরিমাণ ও আয়তন বাড়ছে। একপর্যায়ে এসব হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ পানির চাপ সামলাতে না পারলে বাঁধ ভেঙে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি হতে পারে। এ ধরনের ঘটনাকে গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড বা জিএলওএফ বলা হয়।

নেপালে ১৯৪০ সাল থেকে এ পর্যন্ত এ ধরনের প্রায় ৩০টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

এ ছাড়া তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে উঁচু পার্বত্য এলাকাতেও বৃষ্টিপাতের ধরন পরিবর্তিত হচ্ছে। আগে যেসব এলাকায় তুষারপাত হতো, সেখানে এখন বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়ছে। এর ফলে পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে ভূমিধস, পাথর ধস এবং বরফের বড় খণ্ড নিচে নেমে আসার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

হিমালয় অঞ্চলের এই বিপর্যয়ঝুঁকি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও উদ্বেগ তৈরি করেছে। নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ সম্প্রতি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশটির ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য নেপালের দায় খুবই সামান্য হলেও এর ভয়াবহ পরিণতি দেশটিকে বহন করতে হচ্ছে। প্রতিটি বড় দুর্যোগ বছরের পর বছর ধরে করা উন্নয়নকাজ ধ্বংস করে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে। এমনকি দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ ও ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতেও ঋণ নিতে হচ্ছে দেশটিকে।

গবেষণাটির সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্বত্য ভূগোল বিশেষজ্ঞ এল্টন বায়ার্স মনে করেন, এই গবেষণার ফলাফল হিমালয় অঞ্চলে দুর্যোগের আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা উন্নত করতে সহায়তা করতে পারে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ জনবসতি চিহ্নিত করা এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরির ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে ঝুঁকি কমানোর কাজটি সহজ হবে না। গবেষক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয় অঞ্চলে নির্মাণসংক্রান্ত আইন ও বিধিনিষেধ থাকলেও সেগুলোর যথাযথ প্রয়োগ হয় না। বছরের পর বছর ধরে অনেক এলাকায় কোনো ধরনের পরিকল্পনা ছাড়াই হোটেল, বাজার, সড়ক ও আবাসিক ভবন নির্মিত হয়েছে।

নেপাল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ও নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক সূর্য রাজ আচার্যের মতে, নদীর তীরবর্তী নিচু ও সমতল জমিতে সহজে যোগাযোগ ও নির্মাণকাজ করা যায়। এ কারণে এসব এলাকায় সড়ক, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, হোটেল ও বাজারকেন্দ্রিক জনপদ দ্রুত গড়ে উঠেছে। কিন্তু নির্মাণের ক্ষেত্রে নিরাপত্তাবিধি এবং নদীর তীর থেকে প্রয়োজনীয় দূরত্ব বজায় রাখার নিয়ম অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, হিমালয়ের মতো স্পর্শকাতর বাস্তুতন্ত্রে অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় আরও কঠোর পরিকল্পনা ও নির্মাণবিধি প্রয়োজন। অথচ সেখানে বিদ্যমান নিয়মকানুনও যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হয়নি।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় নেপাল সরকার নতুন কিছু বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগ নিয়েছে। দেশটির জাতীয় দুর্যোগ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বন্যায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত রাসুয়া ও ভোটেকোশি এলাকায় নদীর তীর থেকে ১৫ মিটার বা প্রায় ৪৯ ফুটের মধ্যে নতুন বসতি স্থাপনের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে অন্য নদী উপত্যকাগুলোতেও একই ধরনের নিয়ম চালুর উদ্যোগ রয়েছে।

জাতীয় দুর্যোগ সংস্থার প্রধান নির্বাহী ধর্ম রাজ উপ্রেতি বলেন, নদীর তীরবর্তী এলাকা থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়া অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। কারণ, অনেক মানুষের কাছে তাদের জমি ও সম্পত্তির সঙ্গে দীর্ঘদিনের আবেগ ও পারিবারিক সম্পর্ক জড়িয়ে রয়েছে। তবে ক্রমবর্ধমান প্রাকৃতিক ঝুঁকির বিষয়টিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

নেপালের পশ্চিম সীমান্তসংলগ্ন ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যেও একই ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সেখানে পর্যটন ব্যবসার সম্প্রসারণের পাশাপাশি নদীর তীরবর্তী ও পাহাড়ি এলাকায় ব্যাপক নির্মাণকাজ চলছে।

পরিবেশকর্মী অনুপ নওটিয়ালের অভিযোগ, অর্থনৈতিক উন্নয়নের নামে উত্তরাখণ্ডে পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিবেশ সুরক্ষার নিয়মকানুন উপেক্ষা করা হচ্ছে। কাগজে-কলমে নদীর তীরে বাড়িঘর ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণে বিধিনিষেধ থাকলেও বাস্তবে তার কার্যকর প্রয়োগ দেখা যায় না।

তিনি বলেন, রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় অবাধে নির্মাণকাজ চলছে, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

তবে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে কিছু পদক্ষেপও নিয়েছে উত্তরাখণ্ড সরকার। গত ১২ অক্টোবর রাজ্য মন্ত্রিসভা বন্যাপ্রবণ এলাকায় জমির ব্যবহার ও নির্মাণকাজ নিয়ন্ত্রণে নতুন নিয়ম অনুমোদন করেছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, বন্যার কারণে মানুষের জীবন, সম্পদ ও জরুরি অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি কমানো এবং নদীর পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখাই এসব নিয়মের উদ্দেশ্য।

ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ অধ্যয়ন কেন্দ্রের পরিচালক বসন্ত রাজ অধিকারী মনে করেন, হিমালয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। তবে পরিকল্পিত নগরায়ণ, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং ঝুঁকিভিত্তিক বিমা চালুর মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

তার মতে, ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনায় এলাকাগুলোকে উচ্চ, মাঝারি ও নিম্ন ঝুঁকির শ্রেণিতে ভাগ করা যেতে পারে। এরপর সেই অনুযায়ী বিমার প্রিমিয়াম নির্ধারণ করা হলে মানুষ তুলনামূলক নিরাপদ এলাকায় বাড়িঘর নির্মাণে উৎসাহিত হবেন। নিরাপদ এলাকায় বসবাসকারীরা বিমার ক্ষেত্রেও বাড়তি সুবিধা পেতে পারেন।

সব মিলিয়ে গবেষণায় উঠে এসেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও জনবসতি সম্প্রসারণ হিমালয় অঞ্চলের বিপর্যয়ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। একদিকে দ্রুত গলে যাচ্ছে হিমবাহ, অন্যদিকে ঝুঁকিপূর্ণ নদী উপত্যকায় বাড়ছে মানুষের বসতি ও অবকাঠামো। কঠোর নির্মাণবিধি কার্যকর, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে জনবসতি স্থানান্তর এবং কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা আরও বাড়বে।

এই শাখার আরও খবর

মধ্যবর্তী নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ, কয়েক দশকের রীতি ভাঙল ট্রাম্পের বিচার বিভাগ

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটার তালিকা, ডাকযোগে পাঠানো ব্যালট এবং নির্বাচনের ফল অনুমোদন প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের বিরুদ্ধে। দেশটির বিচার…

মাদ্রাসায় চাকরির এক মাস; দুই শিশুকে ধর্ষণ মামলায় হুজুর গ্রেপ্তার

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে একটি আবাসিক হাফেজিয়া মাদ্রাসায় যোগ দেওয়ার এক মাসের মধ্যে ১০ ও ১১ বছর বয়সী দুই শিশুশিক্ষার্থীকে একাধিকবার ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে।…

১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের নতুন দাম ২ হাজার ৬০ টাকা

ভোক্তা পর্যায়ে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম ২২৩ টাকা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার…

গেজেট তালিকায় বর্মণ ও কোচ, সরকারি জরিপে বাদ পড়লেন বহু মানুষ

সরকারি গেজেটে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি থাকলেও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পরিচালিত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অবস্থা ও দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিরূপণ জরিপে বাদ পড়েছেন বর্মণ ও…

ইউক্রেনের সরকারি অ্যাপে সাইবার হামলা, পারমাণবিক হামলার ভুয়া সতর্কবার্তায় আতঙ্ক

ইউক্রেনের জরুরি সতর্কবার্তা দেওয়ার সরকারি মোবাইল অ্যাপে সাইবার হামলা চালিয়েছে অজ্ঞাত হ্যাকাররা। অ্যাপটি হ্যাক করে দেশটির নাগরিকদের মোবাইল ফোনে পারমাণবিক হামলার আশঙ্কাসহ বিভিন্ন ভুয়া সতর্কবার্তা…

শ্রমিক আন্দোলনের নেপথ্যে আওয়ামী লীগ, চাপে সরকার?

ওটিএন বাংলা রিপোর্ট :  পোশাকশ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন চতুর্থ দিনেও থামেনি। রাজধানীর মিরপুর, সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ, সড়ক…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au