গত বুধবার সন্ধ্যায় মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর গেটের সামনে রাস্তার ওপর ব্যবসায়ী লাল চাঁদকে নৃশংসভাবে হত্যার একটি ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়েছে। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
ঢাকা, ১২ জুলাই-
রাজধানীর পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে ভাঙারি ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে (৩৯) জনসমক্ষে পিটিয়ে ও পাথর ছুড়ে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় সারাদেশে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় ক্ষোভের ঝড় ওঠে। এই ঘটনায় বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের চার নেতাকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করেছে দলটি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ একে “রোমহর্ষক ও নৃশংসতম” হত্যাকাণ্ড বলে আখ্যা দিয়ে বলেন, কোনো দুষ্কৃতকারীর অপরাধের দায় দল নেবে না। তিনি দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আহ্বান জানান। সালাহউদ্দিন বলেন, ঘটনার ভিডিও ফুটেজে যাদের দেখা গেছে, তাদের মামলায় আসামি করা হয়েছে এবং সংগঠন থেকেও আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে।
এ ঘটনায় যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাবেক জলবায়ুবিষয়ক সহসম্পাদক রজ্জব আলী (পিন্টু), ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সাবাহ করিম (লাকি), চকবাজার থানা ছাত্রদলের সদস্যসচিব অপু দাস এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের কালু ওরফে স্বেচ্ছাসেবক কালুকে বহিষ্কার করা হয়েছে। যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি আবদুল মোনায়েম ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম বলেন, বহিষ্কৃতদের কোনো অপকর্মের দায় সংগঠন নেবে না এবং নেতা-কর্মীদের তাদের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের নৃশংস বিবরণ
গত বুধবার (৯ জুলাই) সন্ধ্যায় মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর ফটকের সামনে লাল চাঁদকে হত্যার আগে প্রকাশ্যে পিটিয়ে, ইট-পাথরের টুকরা দিয়ে মাথা ও শরীর থেঁতলে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে তাকে বিবস্ত্র করে ফেলে হামলাকারীরা। তার নিথর দেহের ওপর কেউ কেউ উঠে লাফায়—সিসিটিভি ফুটেজে এমনই ভয়াবহ দৃশ্য দেখা গেছে। এই ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিন্দার ঝড় ওঠে। অনেকে একে ২০১২ সালের বিশ্বজিৎ হত্যার পুনরাবৃত্তি বলে উল্লেখ করেছেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোহাগ একসময় যুবদলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে তার সঙ্গে বিরোধ চলছিল। এই বিরোধের জেরে চাঁদা না দেওয়ায় প্রকাশ্যে তাকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
নিহতের বড় বোন মঞ্জুয়ারা বেগম কোতোয়ালি থানায় দায়ের করা মামলায় ১৯ জনের নাম উল্লেখ এবং ১৫–২০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। পুলিশ ও র্যাব এ পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে। এদের মধ্যে মাহমুদুল হাসান ওরফে মহিন এলাকায় যুবদল নেতা পরিচয় দিতেন। আরেকজন তারেক রহমান ওরফে রবিনকে গ্রেপ্তারের সময় একটি বিদেশি পিস্তল উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি দুই জনকে কেরানীগঞ্জ এলাকা থেকে র্যাব গ্রেপ্তার করলেও তাদের নাম জানায়নি।
ডিএমপি ও র্যাবের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের পেছনে মূলত চাঁদাবাজি ও ব্যবসায়িক শত্রুতা কাজ করেছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
বিএনপির শীর্ষ নেতারা দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে ঘটনায় জড়িতদের সংগঠন থেকে বহিষ্কার করেছেন। ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও যুবদল এক যৌথ বিবৃতিতে জানায়, এ ধরনের অপরাধকে দল কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেবে না। বিএনপি বলছে, মিটফোর্ডের ঘটনার পরও বিএনপির ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা নোংরা রাজনীতির অংশ।
অন্যদিকে এ হত্যাকাণ্ডের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, সিপিবি, গণসংহতি আন্দোলন, এবি পার্টি, গণ অধিকার পরিষদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করেছে শিক্ষার্থী ও সামাজিক সংগঠনগুলো।
পুরান ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে এমন প্রকাশ্য ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডে ঢাকাবাসীসহ পুরো দেশ স্তব্ধ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, শিগগিরই বাকি আসামিদেরও আইনের আওতায় আনা হবে এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হবে।
এখন সবারই প্রত্যাশা—এই নির্মম হত্যার দায়ীদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।