আসকের চার সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ২১ থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত ঘটনাস্থলে সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহ করে। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৫ জুলাই-
গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) রাজনৈতিক সমাবেশকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও গুলিতে পাঁচজন নিহত এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) পরিচালিত এক প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদনে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলা হয়েছে।
আসকের চার সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ২১ থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত ঘটনাস্থলে সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহ করে। তারা নিহত, আহত, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের পরিবার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, স্থানীয় নাগরিক এবং হাসপাতাল ও কারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেন।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, সমাবেশের দিন সকালে আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনের সমর্থকরা সমাবেশস্থলে হামলা চালায়। পরবর্তীতে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর উপস্থিতিতে সমাবেশ হলেও নেতাদের বক্তব্য শেষ হওয়ার পরই নতুন করে হামলা ও সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষে পুলিশের গুলি, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোঁড়ার ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই চারজন এবং পরে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজন মারা যান।
নিহতদের নাম—দীপ্ত সাহা (২৫), রমজান কাজী (১৮), ইমন তালুকদার (১৭), সোহেল মোল্লা (৩২) ও রমজান মুন্সী।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নিহতদের পরিবারগুলোকে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ দাফনের জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল। গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর পুলিশ ২০ জুলাই তিনটি মরদেহ উত্তোলন করে ময়নাতদন্ত করে, যা পরিবারগুলোর কাছে নতুন হয়রানি বলে প্রতীয়মান হয়েছে।
একটি ভিডিওর বরাতে ইমনের পরিবার দাবি করেছে, সেনাবাহিনীর আঘাতপ্রাপ্ত যে কিশোর ভিডিওতে দেখা গেছে, সে-ই ইমন।
এছাড়া সংঘর্ষের পর ১৬ জুলাই রাত থেকে গোপালগঞ্জে কারফিউ ও ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। এই সময়কালে নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। আসক জানিয়েছে, ২১ জুলাই পর্যন্ত ১৮ জন শিশুকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
এখন পর্যন্ত সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে ৮টি মামলা দায়ের হয়েছে, যার ৬টির কপি আসকের হাতে রয়েছে। এতে মোট ৫ হাজার ৪০০ জনকে আসামি করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ৩৫৮ জনের নাম রয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে ৩ জন নারী ও ৩২ জন হিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য।
পুলিশ নিহতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ না করেই নিজে বাদী হয়ে মামলা করেছে বলে পরিবারগুলোর অভিযোগ। তবে পুলিশ দাবি করেছে, তারা যোগাযোগ করেছিল, কিন্তু সম্মতি না পাওয়ায় নিজেরাই মামলা দায়ের করেছে।
গোপালগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সংঘর্ষে ২৪ জন চিকিৎসা নিয়েছেন, যাদের মধ্যে ২১ জন সাধারণ নাগরিক ও ২ জন পুলিশ সদস্য। হাসপাতাল তত্ত্বাবধায়ক গুলিবিদ্ধদের সংখ্যা নিশ্চিত করতে পারেননি।
কারা কর্তৃপক্ষ আসককে জানায়, যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে ১৮ জন কিশোরকে পাঠানো হয়েছে এবং স্থান সংকটের কারণে ১৫০ জন বন্দীকে অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়েছে। ১৬ জুলাই কারাগারে জনতা হামলা চালিয়ে প্রাচীর ভাঙার চেষ্টা করেছিল, তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ৮০ রাউন্ড ‘মিসফায়ার’ করা হয় এবং পরে সেনাবাহিনী এসে পরিস্থিতি সামাল দেয়।
আসকের প্রতিবেদনে ওসি’র অসৌজন্যমূলক আচরণের কথাও বলা হয়েছে। অন্যদিকে পুলিশ সুপার দাবি করেছেন, তারা কোনো মারণাস্ত্র ব্যবহার করেননি এবং ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি সামলেছেন। ২০ জুলাই পর্যন্ত ১৭৭ জনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
সবশেষে আসক বলেছে, গোপালগঞ্জের এই সহিংসতার ঘটনায় গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটেছে। ১৬ জুলাইয়ের রাজনৈতিক সমাবেশে হামলা সভা-সমাবেশের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন করেছে। সংস্থাটি ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।