চট্টগ্রাম বন্দর; ছবি সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২৬ জুলাই- বালাদেশের অন্যতম প্রধান বন্দর চট্টগ্রাম বন্দরে বিভিন্ন সেবার মাশুল বাড়ানোর প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছে। এখন শুধু গেজেট প্রকাশের অপেক্ষা। সরকার বলছে, মাশুল বাড়লেও তা এখনো আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় কম। তবে ব্যবহারকারীরা বলছেন, তাদের প্রস্তাবের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি হারে মাশুল বাড়ানো হচ্ছে, যা ব্যবসার খরচ বাড়াবে এবং শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়বে ভোক্তার ওপর।
শুক্রবার সকালে বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল পরিদর্শনে এসে নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “মন্ত্রণালয় এককভাবে এই সিদ্ধান্ত নেয়নি। আন্তমন্ত্রণালয় আলোচনার পাশাপাশি ব্যবহারকারীদের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। সব পক্ষের মতামতের ভিত্তিতেই মাশুল বাড়ানো হয়েছে। তবু মাশুল বাড়ানোর পরেও চট্টগ্রাম বন্দরের হার আন্তর্জাতিক অনেক বন্দরের তুলনায় কম।”
তবে মাশুল ঠিক কত শতাংশ বাড়ানো হচ্ছে, সে বিষয়ে স্পষ্টভাবে কিছু জানাননি উপদেষ্টা। বন্দরের কর্মকর্তারা বলছেন, গড়ে ৪০ শতাংশ হারে মাশুল বাড়তে পারে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর জাহাজ ও পণ্য খাতে বিভিন্ন সেবার জন্য মাশুল আদায় করে। এসব মাশুল প্রদান করেন দেশি–বিদেশি জাহাজ মালিক, কনটেইনার পরিচালনাকারী এবং আমদানিকারকরা। এই মাশুল কাঠামোর বড় অংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৯৮৬ সালে। এরপর ২০০৭ ও ২০০৮ সালে পাঁচটি খাতে এবং ২০১২ সালে আরও এক দফা মাশুল বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
নতুন করে মাশুল হালনাগাদের কাজ শুরু হয় ২০২০ সালে। স্পেনের একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এই হালনাগাদ করে প্রস্তাব দেয়। ২০২৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি এটি গেজেট আকারে প্রকাশের জন্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এ নিয়ে ২ জুন ব্যবহারকারীদের সঙ্গে একটি সভাও অনুষ্ঠিত হয়।

চট্টগ্রাম বন্দর পরিদর্শনের সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন নৌ-পরিবহন উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন। আজ বেলা ১১টায় চট্টগ্রাম বন্দরে। ছবিঃ সংগৃহীত
ব্যবহারকারীরা জানান, তারা ৩০ জুনের মধ্যে ১০ থেকে ২০ শতাংশ হারে মাশুল বৃদ্ধির প্রস্তাব জমা দিয়েছিলেন। তাদের দাবি ছিল দ্বিতীয় দফা আলোচনা শেষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক। কিন্তু আলোচনার আগেই মাশুল বাড়ানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কোন কোন খাতে কত বাড়ছে?
বর্তমানে বন্দরে ৫২টি ট্যারিফ খাত থাকলেও তা কমিয়ে ২৩টিতে আনা হয়েছে। নতুন করে পাঁচটি খাত যুক্ত এবং চারটি বাদ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর মাশুল আগে প্রতি ২০ ফুট কনটেইনারে ছিল ৪৩ ডলার ৪০ সেন্ট, যা বাড়িয়ে ৭০ ডলার ১১ সেন্ট করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তাছাড়া, কনটেইনার নামানোর চার দিন পর থেকে বন্দর এলাকায় রাখার জন্য প্রথম সপ্তাহে প্রতিদিনের মাশুল ৬ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৬.৯০ ডলার করার কথা বলা হয়েছে।
যা বলছেন ব্যবহারকারীরা
বাংলাদেশ কনটেইনার শিপিং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফাইয়্যাজ খন্দকার বলেন, “আমরা ১৫–২০ শতাংশ মাশুল বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছিলাম। কিন্তু এখন যা হচ্ছে তা আমাদের প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি। এর ফলে হঠাৎ করেই ব্যবসার খরচ বেড়ে যাবে।”
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফ বলেন, “আমাদের প্রস্তাব ছিল ১০ শতাংশের মধ্যে। এখনো একটি আলোচনা বাকি ছিল, কিন্তু তা না করেই মাশুল বাড়ানো হয়েছে। মাশুল বাড়ার বোঝা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই গিয়ে পড়ে।”
বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সহসভাপতি খায়রুল আলম বলেন, “ডলারের দর ১৯৮৬ সালে ছিল ৩০ টাকা ৪১ পয়সা, আর এখন ১২২ টাকা। ফলে ডলারের বিনিময় হারে মাশুল এমনিতেই চার গুণ বেড়েছে। এরপরও যদি মাশুল বাড়ানো হয়, তাহলে সেটি অযৌক্তিক। কারণ, বন্দর এখন লাভজনক একটি প্রতিষ্ঠান।”
ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, হঠাৎ করে এই মাশুল বৃদ্ধির ফলে আমদানি-রপ্তানি খরচ বেড়ে যাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে জাতীয় অর্থনীতিতে এবং সাধারণ ভোক্তার জীবনযাত্রার ব্যয়েও।